বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও জাতীয় আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সংকটকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন পর্যন্ত বারবার প্রমাণিত হয়েছে, জনগণই এ দেশের ইতিহাসের প্রধান নির্মাতা। একই সঙ্গে দেখা গেছে, জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকাও দেশের রাজনৈতিক গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ঘটনাই জনগণের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রের সংকট এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা, আত্মত্যাগ এবং জাতীয় ঐক্যের সর্বোচ্চ প্রতীক। দীর্ঘ রাজনৈতিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রাম ২৫ মার্চের গণহত্যার মধ্য দিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। সেই সংকটময় মুহূর্তে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাঙালি সামরিক সদস্যরা জাতির পাশে দাঁড়ান। চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ এবং কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা বিপর্যস্ত ও বিভ্রান্ত জাতিকে নতুন সাহস ও দিকনির্দেশনা দেয়। এরপর সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং সাধারণ মানুষ এক অভিন্ন লক্ষ্যে সংগঠিত হয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামকে সর্বজনীন রূপ দেন। এই ঐক্যই মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং সশস্ত্র বাহিনী ও জনগণের সম্মিলিত জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে পরিণত করে। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের ভিত্তি ছিল জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর সংগঠিত কাঠামো। বিদ্রোহী বাঙালি সেনাসদস্যদের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠে এবং সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধ পরিচালনার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব সুসংগঠিত হয়। পরবর্তীকালে সামরিক ব্রিগেড—জেড ফোর্স, কে ফোর্স ও এস ফোর্স—গঠনের মাধ্যমে সম্মুখসমরের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। জিয়াউর রহমান প্রথমে ১ নম্বর সেক্টর এবং পরে ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নৌ-কমান্ডোদের অপারেশন জ্যাকপটসহ বিভিন্ন সমন্বিত অভিযানে সশস্ত্র বাহিনী ও সাধারণ মানুষের অংশীদারত্ব মুক্তিযুদ্ধকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এই বিজয় প্রমাণ করে, জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনী একই লক্ষ্য ও আদর্শে একত্রিত হলে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া সম্ভব।
১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার বিপ্লব
স্বাধীনতার মাত্র চার বছর পর, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ গভীর অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রবেশ করে। এর মধ্যেই ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় একটি পাল্টা অভ্যুত্থান, যার নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। এই অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়। ফলে রাষ্ট্রক্ষমতা, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সেনানিবাসে সিপাহিদের উদ্যোগে যে অভ্যুত্থান শুরু হয়, তা অল্প সময়ের মধ্যেই রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান, আর সেনাসদস্যদের পাশাপাশি বহু সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে তাঁকে সমর্থন জানান। ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান পুনরায় সেনাপ্রধান এবং ডেপুটি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকলেও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জিয়াউর রহমানের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এ সময় দেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন পরিবর্তনের সূচনা হয়। বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্র পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ছিল এমন একটি সন্ধিক্ষণ, যখন সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা দেশের রাজনৈতিক গতিধারায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।
১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এর মাত্র তিন বছর পর, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে তিনি নিহত হন। এই ঘটনা দেশকে গভীর নেতৃত্বসংকটের মুখে ফেলে দেয়। সেই সংকটময় সময়েই বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচিত সরকারকে অপসারণ করে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করলে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রতিরোধ শুরু হয়। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট এবং অন্য জোটগুলোর যুগপৎ আন্দোলনের মুখে এরশাদ ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আলোচনার পর বিএনপি জোট, আওয়ামী লীগ জোট এবং বামপন্থী জোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীসহ আরও সাতটি দল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়। অপরদিকে, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।
ক্রমেই বিএনপি জোটের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের গণআন্দোলনে পরিণত হয় এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জাতীয় ঐক্যের রূপ লাভ করে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে রাষ্ট্র এক গভীর সংকটে পড়ে। এ সময় সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম নুরুদ্দিন খানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের পথে অগ্রসর হয়নি। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানের পথ উন্মুক্ত হয়। ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্রের প্রশ্নে লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান তাই শুধু জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষারই নয়, সংকটময় মুহূর্তে সশস্ত্র বাহিনীর সংযত ভূমিকারও একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের তিন দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ আবারও এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে যে অসন্তোষ সমাজে জমে উঠছিল, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে তা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। গণঅভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংঘাত এড়িয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ অনুসন্ধানে উদ্যোগী হন। ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার সিদ্ধান্তের কথা জানান। একই সঙ্গে তিনি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সহিংসতা পরিহার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ গ্রহণ পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। সেই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। একই সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবাসীর প্রতি শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বিজয়ের মুহূর্তে প্রতিহিংসা পরিহার, আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর এই আহ্বান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরবর্তী সময়েও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। অভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম ব্যাহত থাকায় সেনাবাহিনী জননিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা, ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা এবং সার্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাই এমন একটি অধ্যায়, যেখানে জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রের সংকটময় মুহূর্তে ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক দল ও সশস্ত্র বাহিনীর সংযত এবং স্থিতিশীলতামুখী ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন তাৎপর্য যোগ করেছে।
উপসংহার
বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দেখা যায়, জাতীয় সংকটের মুহূর্তে জনগণের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এবং সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল। পাশাপাশি, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমান ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির ভূমিকা নিয়েও বিস্তর আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকটে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, ১৯৯০ সালের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা—প্রতিটি ঘটনায় সশস্ত্র বাহিনী, জিয়াউর রহমান কিংবা তাঁর প্রতিষ্ঠিত দলের সম্পৃক্ততা নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে আলোচনা করা যায়। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে জনগণ, সশস্ত্র বাহিনী ও জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
নজরুল রাসেল : লেখক, গবেষক ও বিশ্লেষক; অ্যামাজন-তালিকাভুক্ত ‘হোয়াট ডু সিটিজেন্স থিঙ্ক’ বইয়ের লেখক।

