ঢাকাSunday , 25 October 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দ্য ডন ও এনা’র সাবেক প্রতিনিধি শফি আহমদ : ছাত্র আন্দোলনের পথ ধরে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক, ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতি ও মুক্ত সাংবাদিকতায় এক বিস্মৃত নাম

Link Copied!

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি, মুক্ত সাংবাদিকতা ও পাবনার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিস্মৃত নাম শফি আহমদ। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন ও ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সি (এনা)-এর সাবেক পাবনা প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফি আহমদ ছিলেন ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের ধারায় গড়ে ওঠা এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আজ তাঁর ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নিঃসন্তান এই সাংবাদিক ও ছাত্রনেতা সময়ের পরিক্রমায় বিস্মৃতপ্রায় হলেও তাঁর কর্মময় জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় পাবনার রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্মরণযোগ্য।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষা আন্দোলন, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক প্রস্তুতিতে ডাকসুর নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ষাটের দশকে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী পাবনার কৃতী সন্তান শফি আহমদ ছিলেন উল্লেখযোগ্য এক ছাত্রনেতা।
শফি আহমদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা পাবনায়। তিনি পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় ছাত্র ইউনিয়ন শিক্ষার অধিকার, গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী অবস্থান এবং ছাত্রসমাজের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। ছাত্ররাজনীতির এই পরিবেশেই শফি আহমদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে।
পাবনার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ ছিল তাঁর ছাত্রজীবন ও রাজনৈতিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ১৯৬১-৬২ সালে কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন। কলেজ পর্যায়ে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতা তাঁকে বৃহত্তর ছাত্ররাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দেয়।
এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্রজীবন শেষে শফি আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জেলা শহরের গণ্ডি পেরিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বিস্তৃত হয়। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শিক্ষা, গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন ও বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।
ডাকসুর সাবেক ভিপি ও জিএসদের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ফেরদৌস আহমদ কোরেশী সহসভাপতি (ভিপি) এবং শফি আহমদ সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন। ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া ছিল তাঁর ছাত্ররাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এ দায়িত্বের মধ্য দিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের বৃহত্তর পরিসরে ভূমিকা রাখার সুযোগ পান।
পাবনার মতো একটি জেলা শহর থেকে উঠে এসে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র সংসদের শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছানো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের তাৎপর্যপূর্ণ দিক। তাঁর এই উত্থান সে সময়ের জেলা পর্যায়ের ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় ছাত্র আন্দোলনের মধ্যকার সংযোগেরও একটি উদাহরণ।
ছাত্ররাজনীতির অধ্যায় পেরিয়ে পরবর্তী সময়ে শফি আহমদ পাবনায় অবস্থান করেন এবং সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। তিনি পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন ও ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সি (এনা)-এর পাবনা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি পাবনা প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেন।
সাংবাদিকতা ছিল তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। ষাটের দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কাজ করা তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। সে সময় জেলা পর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা এবং জাতীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার সংযোগ রক্ষায় সংবাদ প্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
পাবনা শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি জনপদ। এ জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহু ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও সমাজসংগঠকের উত্থান ঘটেছে। তাঁদের কেউ কেউ জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সময়ের ব্যবধানে অনেকের নাম ও অবদান আড়ালে চলে গেছে।
শফি আহমদ তাঁদেরই একজন। পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক থেকে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক হওয়া-তাঁর জীবনপথের এসব অধ্যায় নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্য ডন ও এনার পাবনা প্রতিনিধি এবং পাবনা প্রেসক্লাবের সদস্য হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতাজীবনের তথ্যও সংরক্ষণ করা জরুরি।
১৯৯১ সালে মৃত্যুবরণ করা নিঃসন্তান শফি আহমদের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও কর্মজীবনের দলিল সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে পাবনার রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা, স্মৃতিচারণ, পুরোনো সংবাদপত্র অনুসন্ধান এবং সমকালীন ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে এই বিস্মৃত ছাত্রনেতা ও সাংবাদিককে নতুন করে পরিচিত করা যেতে পারে।
মৃত্যুবার্ষিকীতে শফি আহমদকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন সাবেক ছাত্রনেতা ও সাংবাদিককে স্মরণ করা নয়; বরং পাবনার রাজনৈতিক ইতিহাস, ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্য এবং মুক্ত সাংবাদিকতার অতীতকে সংরক্ষণের দায়িত্বও নতুন করে উপলব্ধি করা। লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, স্টাফ রির্পোটার, সমকাল, পাবনা অফিস ও সাবেক সভাপতি পাবনা প্রেসক্লাব।