ঢাকাTuesday , 20 October 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

লঘু পাপে গুরু দণ্ড; তবে গুরু পাপে কী?

Link Copied!

রাজনীতিতে ভুলের দায় নির্ধারণ, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে সমান নীতি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। একই ধরনের অপরাধ বা অনিয়মের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন আচরণ করা হলে ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, ক্ষুণ্ণ হয় সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা। সাম্প্রতিক সময়ে দুই প্রতিমন্ত্রীকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কের প্রেক্ষাপটে তাই জনমনে একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে – লঘু পাপে গুরু দণ্ড; তবে গুরু পাপে কী?

ইশরাকের ভুল, শাস্তির প্রশ্ন ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন সম্প্রতি ঢাকার গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং জনসমক্ষে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের কারণে বিতর্কের মুখে পড়েন। কারও কাছে ঘটনাটি হয়তো অনিচ্ছাকৃত ভুল বা সরল বিশ্বাসে নেওয়া একটি পদক্ষেপ মনে হতে পারে। কিন্তু উদ্দেশ্য যতই ইতিবাচক হোক, আইনের সীমা লঙ্ঘনের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেই যেকোনো পরিস্থিতিতে তা প্রদর্শনের অবাধ অধিকার তৈরি হয় না। আত্মরক্ষার প্রয়োজন ও আইনসম্মত ব্যবহার এক বিষয়; আর জনসমক্ষে অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে ভীতি বা আতঙ্ক সৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ঘটনার প্রকৃতি, প্রেক্ষাপট ও প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করেই এর দায় নির্ধারণ করা উচিত।

সরকারের বিরোধিতাকারীদের কেউ কেউ ঘটনাটিকে জনগণের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, সরকারের মাদকবিরোধী অবস্থান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা নিয়ে জনমনে থাকা প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। মাদক নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। কিন্তু পুলিশের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি কিংবা সংশ্লিষ্ট মহলের সম্ভাব্য স্বার্থের কারণে এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি কতটা হচ্ছে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

সম্ভবত এই বাস্তবতায় ইশরাক হোসেন নিজেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব নিজের হাতে নিতে গিয়ে তিনি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলেন। মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর উদ্দেশ্য ইতিবাচক হয়ে থাকলেও, পদ্ধতিগত ভুলের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঘটনার পর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাঁর ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে ইশরাক নিজের ভুল স্বীকার করে জানান, ভবিষ্যতে অস্ত্র হাতে নিয়ে নয়; বরং পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটকে সঙ্গে নিয়ে আইনসম্মতভাবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট: জনপ্রতিনিধি বা মন্ত্রী—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু একই নীতি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মীর শাহে আলম: বিতর্কের পর বিতর্ক; সরকারের প্রতি নেতিবাচক প্রভাব

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমকে ঘিরেও দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর কর্মকাণ্ড, পারিবারিক ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে গণমাধ্যম ও জনপরিসরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এসব বিষয়ে শুধু বিরোধী পক্ষ নয়, বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শোনা যায়।

তবে এসব বিতর্কের পরও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর দলীয় বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া—এসবই হওয়া উচিত। কিন্তু অভিযোগের গুরুত্ব ও ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তাঁর নির্বাচনী এলাকায় নবগঠিত তিনটি ইউনিয়নের মধ্যে দুটি ইউনিয়নের নাম—‘মীর সীমান্ত’ ও ‘মীর দিগন্ত’—তাঁর দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বগুড়ার জেলা প্রশাসককে ইউনিয়ন দুটির নাম পুনর্বিবেচনা ও পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

প্রশ্ন হলো, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পরিচয়ের প্রভাব পড়ার সুযোগ কেন তৈরি হবে? জনগণের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের পরিচিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের খবর সত্য হয়ে থাকলে, সেটি যথাযথ প্রশাসনিক নীতির প্রতিফলন হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।

একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মীর শাহে আলমের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠান অন্তত ৭১ কোটি টাকা মূল্যের ১২টি সরকারি কাজ পেয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ছয়টি কাজের মূল্য প্রায় ৫৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা তিনি বিসিকের (BSCIC) পরিচালক থাকাকালে পাওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ছয়টি কাজের মূল্য প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা তিনি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এ ধরনের তথ্য সত্য হলে তা গুরুতর নৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির পরিবারের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সরকারি কাজ পেতে পারে কি না, তা নির্ভর করে প্রযোজ্য আইন, স্বার্থের সংঘাতসংক্রান্ত বিধান, দরপত্রের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত ভূমিকার ওপর। কেবল পারিবারিক সম্পর্কের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী বলা যায় না; একইভাবে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও যথাযথ তদন্ত ছাড়া উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রতিমন্ত্রী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, তিনি কোনো প্রভাব খাটাননি। তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।

প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে স্থানীয় ছয়জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা এবং তাঁদের একজনের কারাবন্দি হওয়ার ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততা বা অনুমোদন নেই বলে দাবি করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন বলে জানা যায়।

এ ক্ষেত্রে কারা মামলা করেছেন, কী অভিযোগে করেছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকা কী ছিল এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আইনগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

মীর শাহে আলমকে ঘিরে আরও কিছু রাজনৈতিক আলোচনা রয়েছে, যেগুলো যাচাই ছাড়া প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বলা হয়, তিনি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন; কেউ কেউ তাঁদের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত পরিচয়ের কথাও উল্লেখ করেন। এসব সম্পর্কের কারণেই তিনি রাজনৈতিকভাবে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন—এমন ধারণাও বিভিন্ন মহলে প্রচলিত।

কিন্তু ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বা রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা অনুমান দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। বরং তাঁর রাজনৈতিক উত্থান, দলীয় মনোনয়ন, মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত আলোচনার বিষয়।

একজন সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এটি অবশ্যই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় অর্জন। কিন্তু সেই দায়িত্বের সঙ্গে জবাবদিহি, সংযম, সততা ও উচ্চতর নৈতিক মান বজায় রাখার বাধ্যবাধকতাও যুক্ত। সরকারি দায়িত্ব ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার কিংবা অন্যদের ওপর কর্তৃত্ব প্রদর্শনের সুযোগ নয়। বরং ক্ষমতা যত বেশি, জবাবদিহির দায়ও তত বেশি।

মীর শাহে আলমকে নিয়ে সমালোচনার আরেকটি দিক হলো তাঁর কথিত আচরণ ও ক্ষমতার দাপট। বিভিন্ন সময়ে সিনিয়র রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংসদের চীফ হুইপের প্রতি শৃঙ্খলা বহির্ভূত পরামর্শ এবং চট্টগ্রামের মেয়র ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে গণমাধ্যমের সামনে তাঁর উন্নাসিক আচরণ নিয়েও সমালোচনা হয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে।

ফলে একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে – সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কি পারস্পরিক সম্মান, প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচার ও দায়িত্বের সীমারেখা যথাযথভাবে মেনে চলছেন?

একজন প্রতিমন্ত্রীর, সংসদের চীফ হুইপ এবং সরকারের মেয়র বা প্রশাসকের সঙ্গে আচরণ যথাযথ ও মার্জিত হওয়া উচিৎ। সবার বিবেচনায় রাখা জরুরী যে – সরকারি পদ কোনো ব্যক্তিকে অন্যের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের অধিকার দেয় না। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম বা Warrant of Precedence অনুযায়ী বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা। তবে পদমর্যাদার বিতর্কের বাইরেও পারস্পরিক সম্মান ও শালীনতা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ।

বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে আসছে। সেই দলের একজন প্রতিমন্ত্রীর আচরণ নিয়ে যদি ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, তবে বিষয়টি কেবল একজন ব্যক্তির ভাবমূর্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা দলের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকেও প্রভাবিত করে।

মীর শাহে আলমের সম্পদ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়েও জনপরিসরে আলোচনা রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাখিল করা তাঁর হলফনামায় ১,৮২৪ শতাংশ জমির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর মালিকানায় ১২টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে তথ্য এসেছে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর মালিকানাধীন ‘রোমা অটোরাইস মিল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৪২ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে বলেও গণমাধ্যম উল্লেখ করা হয়েছে।

বিপুল সম্পদ থাকা নিজে কোনো অপরাধ নয়। প্রশ্ন হলো, সম্পদ অর্জনের উৎস বৈধ কি না, ঘোষিত তথ্যের সঙ্গে বাস্তব অবস্থার মিল আছে কি না এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের কোনো সংঘাত তৈরি হয়েছে কি না। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি রাজনৈতিকভাবে কতটা সক্রিয় ছিলেন কিংবা কোনো বিশেষ বলয়ের সুবিধা পেয়েছিলেন কি না – এ নিয়েও রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা রয়েছে।

ন্যায়বিচারের প্রসঙ্গ তুলে অনেকেই এখন ইশরাক হোসেন ও তাঁর প্রয়াত পিতা, অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ, নির্যাতন ও প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মীর শাহে আলমের রাজনৈতিক পথচলার তুলনা টেনে আনছেন। এই তুলনার রাজনৈতিক বিবেচনায় তাৎপর্য থাকতে পারে, যদিও অতীতের ত্যাগের মূল্যায়ন এবং বর্তমানের দায়বদ্ধতা – দুটিই পৃথক বিষয়। নৈতিকতার বিচারে আবশ্য কোনো নেতার রাজনৈতিক ত্যাগ তাঁকে আইনগত জবাবদিহির ঊর্ধ্বে তুলে ধরে না; একইভাবে রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস না থাকলেও কারও প্রতি অন্যায় করা যায় না।

হাসিনার পতন থেকে কি শিক্ষা নেবে বিএনপি?

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতাসীন ব্যক্তির কাছে বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক চিত্র পৌঁছানো কতটা জরুরি। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, সমালোচনার প্রতি অসহিষ্ণুতা, বিরোধী মত দমনের অভিযোগ এবং ক্ষমতাসীনদের ঘিরে সুবিধাভোগী বলয়ের ভূমিকা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।

একজন শাসক যখন নিজের চারপাশে এমন একটি বলয় তৈরি হতে দেন, যেখানে তাঁকে কেবল প্রশংসা শোনানো হয় এবং অস্বস্তিকর সত্য আড়াল করা হয়, তখন তিনি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দলীয় আনুগত্যের নামে তোষামোদ, সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে বিবেচনা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা—এসব শেষ পর্যন্ত সরকার ও দলের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এই অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপির শিক্ষা নেওয়া জরুরি। দলীয় নেতৃত্বের কাছে শুধু আনুগত্যের প্রতিবেদন নয়, বরং মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতি, নেতা-কর্মীদের অসন্তোষ, প্রশাসনিক অনিয়ম, জনমতের পরিবর্তন এবং ক্ষমতাসীনদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছাতে হবে।

যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি রয়েছেন, তাঁদের দায়িত্ব তাঁকে শুধু সন্তুষ্ট রাখা নয়; বরং প্রয়োজন হলে অপ্রিয় সত্যও জানানো। কারণ একজন রাজনৈতিক নেতার প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী তিনি নন, যিনি প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন; বরং তিনি, যিনি ভুলের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং সংশোধনের পথ দেখান।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জনমনে ন্যায়সঙ্গত প্রশ্ন

‘ব্যক্তির আগে দল, দলের আগে দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানের রাজনৈতিক তাৎপর্য তখনই বাস্তব হয়ে উঠবে, যখন দলীয় পরিচয় বা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি তাঁর বলয়ের বাইরে থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করছেন? তাঁর সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কি একই মানদণ্ডে যাচাই করা হচ্ছে? দলীয় আনুগত্যের কারণে কেউ কি বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন? আর কেউ তুলনামূলক কম গুরুতর কোনো ঘটনায় দ্রুত শাস্তির মুখে পড়ছেন কি না—এসব প্রশ্নের জবাব জনগণ স্বচ্ছতা ও কার্যকর পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দেখতে চায়।

ইশরাক হোসেনের ঘটনায় যদি দায়িত্বে অবহেলা, আইন লঙ্ঘন বা অনুপযুক্ত আচরণের কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেটি যথাযথ তদন্ত ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। একইভাবে, মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত ব্যবস্থা।

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো একজন প্রতিমন্ত্রীকে রক্ষা করা বা অন্যজনকে শাস্তি দেওয়ার নয়। প্রশ্নটি হলো—সরকারের নীতি কি সবার জন্য সমান? ক্ষমতার অবস্থান, পারিবারিক পরিচয় কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কি জবাবদিহির ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য তৈরি করছে?

অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বলা যায় না। কিন্তু অভিযোগ গুরুতর হলে তদন্ত না করাও গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায়বিচার মানে কেবল শাস্তি দেওয়া নয়; বরং নিরপেক্ষভাবে সত্য উদ্‌ঘাটন করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বুঝেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহির অভাব কোনো দলকেই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ রাখতে পারে না। জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক ত্যাগ, দলীয় আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক – কোনোটিই অনিয়মের দায় থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা হতে পারে না।

বিএনপির সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। দলটি যদি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে নিজেদের ভেতর থেকেই জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজন হলে দলীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে—ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি সেই সাহসী ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারবেন? তিনি কি ব্যক্তিগত বলয়, দলীয় আনুগত্য ও তোষামোদের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত তথ্য গ্রহণ করবেন? দলের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন কি?

দেশের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিএনপির বহু পরীক্ষিত, ত্যাগী ও দেশপ্রেমিক নেতা-কর্মীরও প্রত্যাশা – সরকার ও দল পরিচালিত হবে ন্যায়, সততা, শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে।

কারণ, আইনের শাসনে ছোট-বড় সবার দায় নির্ধারিত হয় অপরাধের প্রকৃতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে, ক্ষমতার পাল্লা দিয়ে নয়। আর ন্যায়বিচারের মানদণ্ড যদি ব্যক্তিভেদে বদলে যায়, তবে ‘লঘু পাপে গুরু দণ্ড’ কথাটি একসময় আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দেবে—গুরু পাপে তবে কী?

মোহাম্মদ খালিদুজ্জামান
যোগাযোগ, উন্নয়ন, জনসম্পর্ক পেশাজীবী