রংপুর প্রতিনিধি
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাকে গত ১০ সেপ্টেম্বর জাপার প্রেসিডিয়াম পদ থেকে অব্যাহতি এবং তার নেতৃত্বের রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটি বিলুপ্ত করার পর এ নিয়ে নতুন আহ্বায়ক কমিটির এরশাদপন্থিদের মাঠে দেখা যায়নি। কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ নেতারা হাত-পা গুটিয়ে চলে গেছেন ‘প্যাভিলিয়নে’।
ঘোষিত নতুন কমিটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও নেই উত্তেজনা, নেই কোনো আনন্দ উচ্ছ্বাস। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারাও রয়েছেন দ্বিধাদ্বন্দ্বে। এরশাদের সিদ্ধান্তে মুখে জোর করে হাসি ধরে রাখলেও মনে নেই স্বস্তি। জাপা চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তকে পর্যবেক্ষণে রেখে দলকে গুছিয়ে মাঠে নামার চিন্তাভাবনা করছে তারা।
গেল বছরের ১৫ ডিসেম্বর রাতে একইভাবে এরশাদের প্রেস সেক্রেটারি সুনীল শুভ রায় রাঙ্গার নেতৃত্বের রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। এর পরপরই এরশাদের পৈত্রিক নিবাস দ্যা স্কাইভিউতে সংবাদ সম্মেলন করেন জেলা ও মহানগরের নতুন আহ্বায়ক কমিটির নেতারা। তারা সঙ্গে সঙ্গে মিছিল মিটিংও করে।
আর সে ঘটনার কিছুদিন যেতে না যেতেই পাল্টে যায় এরশাদের সিদ্ধান্ত। নতুন কমিটি বাতিল করে রাঙ্গার আগের কমিটি পুনর্বহাল করেন তিনি। এবারও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলেই মনে করছে এরশাদপন্থিরা। এসব কারণেই তাদের মধ্যে নেই কোনো আনন্দ উচ্ছ্বাস, উত্তেজনার লেশমাত্র।
সর্বশেষ ঘোষিত কমিটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নিজেদের জাতীয় পার্টির মূল ধারার এরশাদপন্থি হিসেবে দাবি করলেও তাদের প্রধান ও শীর্ষ নেতারা বলেছেন, ‘আমরা আর এরশাদের কৌশলী রাজনীতির ফাঁদে পড়ে পলিটিক্যাল ক্রসফায়ারের বলি হতে চাই না। নতুন করে মামলার মুখোমুখি হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে চাই না।’
তারা রাজনীতির ময়দান ছেড়ে অন্তরালে বসে এরশাদের সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষণকেই বেশি গুরুত্ব মনে করছেন। অন্যদিকে নতুন সিদ্ধান্তে সাবেক এই সামরিক শাসকের অটল থাকতে পারা না পারা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতো এসব এরশাদপন্থির মধ্যেও আছে ‘প্রমাণিত’ সন্দেহ।
এদিকে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে রয়েছে এরশাদপন্থি নতুন কমিটির নেতারা।
সর্বশেষ কমিটি ঘোষণা পর বুধবার রাত থেকেই নগরীর সেনপাড়ায় দ্যা স্কাইভিউতে নতুন জেলা কমিটির সদস্য সচিব এরশাদের ভাতিজা সাবেক এমপি হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফের বাসার আশপাশেও রয়েছে পুলিশি পাহারা।
নতুন মহানগর কমিটির আহ্বায়ক সাবেক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা জানান, ‘স্যারের সঙ্গে ক্লিয়ারকাট কথা বলে এবং কিছুটা সময় নিয়েই সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে আমরা মাঠে নামতে চাই’।
মহানগরের সদস্য সচিব এস এম ইয়াসির বলেন, ‘শিগগিরিই আমাদের মাঠে দেখতে পাবেন।’
জাপা চেয়ারম্যানের এই সিদ্ধান্তকে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত বলে দাবি করে সদ্য ঘোষিত জেলা কমিটির আহ্বায়ক সাবেক এমপি মোফাজ্জল হোসেন মাস্টার বলেন, ‘আমরা কাউকে মাঠ ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে নেই। তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিদিনই সবার সঙ্গে কথা হচ্ছে।’ তিন চারদিনের মধ্যেই কর্মসূচি দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক, সাবেক পৌরমেয়র আব্দুর রউফ মানিক বলেন, ‘আমি এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করছি না’।
কবে নাগাদ কি ধরণের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবেন এমন প্রশ্নে কেউই স্পষ্ট করেননি কর্মসূচির ধরণ বা দিনক্ষণ।
এদিকে, নতুন কমিটি ঘোষণার পর থেকে এখনো বিলুপ্ত কমিটির রাঙ্গা সমর্থকদের দখলে রয়েছে মহানগরীর সেন্ট্রাল রোডের জাপা কার্যালয়। গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এ দুদিন মাঠে থেকে শোডাউন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশও করেছে তারা। বর্তমানে পার্টিও কার্যালয়ের ভেতরে বাইরে রয়েছে পুলিশি পাহারা।
উল্লেখ্য, গত ১০ সেপ্টেম্বর জাপার প্রেসিডিয়াম পদ থেকে রংপুর মহানগর ও জেলা কমিটির সভাপতি স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা ও দপ্তর সম্পাদক তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে অব্যাহতি দেন পার্টির চেয়ারম্যান। বিকেলেই এরশাদের প্রেস সেক্রেটারি সুনীল শুভ রায় স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জাপার রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
মূলত আগের কমিটির মধ্য থেকে শুধু জেলা ও মহানগর সভাপতি প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাকে বাদ দিতেই এরশাদের এই আয়োজন।
নতুন ঘোষিত কমিটিতে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাকে আহ্বায়ক ও এসএম ইয়াসিরকে সদস্য সচিব করা হয়। এ কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় সাবেক পৌর মেয়র একেএম আব্দুর রউফ মানিক ও সদ্য বিলুপ্ত মহানগর কমিটির সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন কাদেরীকে। আর জেলা কমিটিতে সাবেক এমপি মোফাজ্জল হোসেন মাস্টারকে আহ্বায়ক ও ভাতিজা সাবেক এমপি হোসেন মকবুল শাহরিয়ার করা হয় সদস্য সচিব। এখানেও যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে সদ্য বিলুপ্ত জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাসুদ চৌধুরী নান্টুকে।

