ঢাকাSunday , 8 March 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আত্মনির্ভরশীলতা বনাম নারী স্বাধীনতা

Link Copied!

freedom‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ভাবতে ভালোই লাগে’। লেখার শুরুর এই লাইনটি বাংলাদেশে বহুল প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনের স্লোগান। বিজ্ঞাপন নির্মাতা কোম্পানি যে দৃষ্টিকোন দিয়েই এই মানদণ্ড বজায় রাখার চেষ্টা করুন না কেন, দেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে শুরু করে মুদ্রাস্ফিতীর বাংলাদেশ সবই আমরা প্রতক্ষ্য করছি এই সময়ে। কিন্তু প্রত্যক্ষ করছি না এই কথিত উন্নয়নের পেছনের চালিকা শক্তি এবং এর সার্বিক অবস্থা নিয়ে। একটি দেশ এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম শর্তই হলো দেশের আভ্যন্তরীন জনগোষ্ঠির ক্ষমতাকাঠামোর সমতা বিন্যাস। এখন আমরা যদি টেকসই উন্নয়নের কথা বলি তাহলে আমাদের সামনে উঠে আসে ‘অর্থনৈতিক সমতা, ‘সামাজিক সমতা’ এবং ‘পরিবেশগত সমতা’র কথা। আর এই তিন সমতা পুরোপুরি নির্ভর করে দেশের নারী এবং পুরুষের সমান অংশগ্রহনের উপর। দেশ যদি সত্যিই এগিয়ে থাকে তাহলে এবার প্রশ্ন করা যাক, আমাদের সমাজের নারী এবং পুরুষের কি এখনও সমান অংশীদারিত্ব রচিত হয়েছে?
একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিশ্ব আচমকা এক অর্থনৈতিক ধসের মধ্যে পতিত হয়। তাবৎ মোড়ল দেশগুলো অর্থনৈতিক অচলাবস্থার প্রশ্নে হুমড়ি খেয়ে পরে। অনেক গবেষক দিনরাত এই ধসের পেছনের কারণে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন নিজেদের তথ্যের উপর ভিত্তি করে। এদের মধ্যে কেউ তারল্যমান, যুদ্ধ, তেলের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি কারণ দেখিয়েছেন। কিন্তু ড. স্টিভেন নামের এক অর্থনীতিবিদ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দিকে আলোকপাত করেছেন এই সমস্যার শেকড় অনুসন্ধান করতে গিয়ে। তিনি গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, পুঁজিবাদী এই বিশ্ব ধাক্কা খাওয়ার অন্যতম কারণ হলো দায়িত্বপ্রাপ্ত পুরুষ প্রধানের অর্থনীতির ভুলের কারণে এই ধস সৃষ্টি হয়েছে। যেহেতু নারীরা ওই অর্থে ক্ষমতা কাঠামোর শীর্ষে অবস্থান করেনি তাই নারীদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে। প্রাতিষ্ঠানিকই হো আর অপ্রাতিষ্ঠানিকই হোক সকলক্ষেত্রে নারীদের জ্ঞানত এবং অজ্ঞানত পিছিয়ে রাখার কারণেই নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি। ঠিক এই স্থানেই দাড়িয়ে অনেকেই একটি প্রশ্ন করে থাকেন যে, আত্মনির্ভরশীল নারী এবং নারীর স্বাধীনতা বিষয়টি কি একই?
আত্মনির্ভরশীল নারী এবং নারীর স্বাধীনতা বিষয়টি মোটেও এক নয়। এমন যদি হয় যে প্রায় প্রতিটি ক্ষমতাকাঠামোতেই নারীর সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা হলো কিন্তু নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করা হলো না, তাতে আখেরে কোনো লাভই হবে না। কারণ নারীর স্বাধীনতা এবং আত্মনির্ভরশীলতা সতন্ত্র কোনো বিষয় নয়। দুইটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত দিক দিয়ে নারীর স্বাধীনতা মিললেই তবে আত্মনির্ভরশীল নারীর মুর্তরূপ আমরা দেখতে পাবো। আমাদের এই পৃথিবীর সমাজে বৈষম্য এতোটাই গেড়ে বসেছে যে, দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টার ফলেও ক্ষমতাকাঠামোতে নারী এবং পুরুষের সমতা বিধান হচ্ছে না। অন্যদিকে এই বৈষম্য রোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে কার্যকরী হওয়ার বদলে আরও প্রচ্ছন্নভাবে সেই আগের অবস্থাটিকেই পরিপুষ্ট করছে।
এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় এই মুহূর্তে নেই যে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পর থেকে যতগুলো সরকার দেশটির ক্ষমতায় এসেছে তারা সবাই কম-বেশি নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছেন। উদাহরন হিসেবে আমরা সিডও দলিল ও বেইজিং ১৫-এ স্বাক্ষরকে ধরতে পারি। বাংলাদেশ বারবার জাতিসংঘের মূল স্লোগান লৈঙ্গিক সমতা অর্জন, নারীকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা ইত্যাদি বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে, কিন্তু এই সাড়া পরবর্তীতে দলিল বা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ সরকারগুলো নেয়নি। সরকারগুলো বারংবার নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং আত্মনির্ভরশীল নারী তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু আত্মনির্ভরশীল হতে গেলে যে নারীকে স্বাধীন হতে হবে এই লক্ষ্যে কেউই কথা বলছেন না। কারণ নারীকে আত্মনির্ভরশীল হতে গেলে তাকে নিজের পছন্দ বুঝতে হবে, নিজের মেধা অনুযায়ী ক্ষেত্র বেছে নিতে হবে, সমাজের গোড়া থেকে নারীকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে…এতগুলো পথ পাড়ি দিলেই তবে একজন স্বাধীন নারী মূলত আত্মনির্ভরশীল হতে পারবে।
এভাবে এদের দিন বদলায়নি। পেটেভাতেই জীবন শেষ। স্বাধীনতার কথা ভাববার অবকাশ নেই।
নারীর স্বাধীনতা বিসয়ে বিস্তারিত আলোচনার মধ্যবর্তী অবস্থানে আরও একটি বিষয়ে আলোচনা না করলেই নয়। আর সেই বিষয়টি হলো ‘নারীর অধিকার’। নারীকে ক্ষমতাকাঠামোতে প্রবেশের রাস্তা হিসেবে বিভিন্ন এনজিও, সরকারি মাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান নারীকে তার অধিকার অর্জনের পথে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, নারী তার অধিকার অর্জন করতে পারলেই বাকীসব সমস্যা এমনিতেই মিটে যাবে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, ‘নারীর অধিকার’ বিষয়টিও পুরোপুরি পুরুষতান্ত্রিক। কারণ পুরুষই সেই অধিকারসমূহ নারীর জন্য ঠিক করে দিচ্ছে, যে অধিকারগুলো একবিংশ শতাব্দীর এই সন্ধিক্ষণে নারীদের দিলেও পুরুষের ক্ষমতাতান্ত্রিকতায় কোনো ছেদ পরবে না, উল্টো নারীকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যাবে। এই নারী অধিকারের অর্ন্তনির্হিত মনোজাগতিক দাসত্বের সোজাসাপটা উদাহরণ আমরা হরহামেশাই বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী চিত্রে দেখতে পাই। কিংবা বলা ভালো, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার নিজের শরীরের একটি অংশ হিসেবে নারীকে গ্রহন করছে সত্যি, কিন্তু সেই নারীকেও অধিকারের প্রশ্নে পণ্য বানিয়ে দিচ্ছে, যাতে সেই পণ্য নারী পুঁজি পুরুষের বিরুদ্ধে মাথাতুলে না দাড়াতে পারে। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে আদতেই ‘নারীর অধিকার’ নারীর আত্মনির্ভরশীলতা এবং তার স্বাধীনতা অর্জনের পথে কতটুকু ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়।
১৮৮৪ সালে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস তার ‘দ্য ওরিজিন অব দ্য ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রপার্টি অ্যান্ড দ্য স্টেট’ বইয়ে লেখেন, ‘শিকার ও খাদ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে যেসব সমাজ প্রতিষ্ঠিত, যেখানে জনজাতির সবাই শ্রম দান করে এবং সব সম্পত্তি সম্প্রদায়ের মালিকানাভুক্ত, সেখানে নারী কোনো দ্বিতীয় স্থান ভোগ করত না। নারীর অধঃস্তনতার অভ্যুদয় ঘটে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর ভিত্তি করে যখন নির্দিষ্ট শ্রেণীসমাজ গড়ে ওঠে। পুরুষ প্রাধান্য কম-বেশি বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতায় পরিলক্ষিত হয়, তা দুই লিঙ্গের মধ্যে কোনো দেহগত বৈশিষ্ট্যের জন্য নয়, বরং কালক্রমে তা ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পুরুষের ওপর বর্তালে নারীর অধঃস্তনতা বিকাশ লাভ করে।’ যে কথা এঙ্গেলস আজ থেকে ১৩১ বছর আগে লিপিবদ্ধ করে গেছেন সেই সত্যিটুকুও আমাদের পক্ষে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মানতে কষ্ট হয়।
বিশ্বভাতৃ সংঘ জাতিসংঘের করা এক সমীক্ষায় দেখা যায় পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ কর্ম সমাধা করে নারী এবং ৪৫ ভাগ খাদ্য উৎপাদন করলেও তারা আয়ের শতকরা দশ ভাগ এবং সম্পত্তির শতকরা এক ভাগ মালিকানা ভোগ করে। তাহলে দেখতেই পারছেন নারী আত্মনির্ভরশীল হলেও আদতে কোনো কাজ হচ্ছে না, ফল ভোগের অধিকার এবং তারই কাজের ফল যে তিনি নিজেই ভোগ করতে পারেন এই স্বাধীন মনোভাবও নারীর ভেতরে বেড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের সব নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জণসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশ বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনোরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা বা শর্তের সম্মুখীন হতে হবে না এবং যে কোনো অনগ্রসর এলাকার নারী বা শিশু অথবা নাগরিকদের উন্নতির জন্য রাষ্ট্র বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। ২৯নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের কর্মে নিয়োগ লাভের ব্যাপারে সব নাগরিকের সমান সুযোগ থাকবে এবং কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক রাষ্ট্রের কর্মে নিয়োগ বা কর্ম লাভের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না অথবা তাঁর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না। যে আইনের বিধান বা পরিণতি চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে তা অন্যায্য এবং অযৌক্তিক হলে সংবিধানের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।
মোদ্দা কথা, স্বাধীনতার বিষয়টি মূলত লৈঙ্গিক নয়। পুঁজি তার স্বার্থে স্বাধীনতাকে বিভিন্ন মাত্রায় দেখায়, যারই মুর্তরূপ নারী স্বাধীনতা কিংবা পুরুষ স্বাধীনতা। যে কারণে মানুষের স্বাধীনতা দরকার সেই একই কারণে নারীরও স্বাধীনতা দরকার। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে মানুষের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মাত্রই নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হবেন। নারীদের বন্দি করে রাখার মানে একজন মানুষকে বন্দী করে রাখা এই বক্তব্যটি জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি আত্মনির্ভরশীলতা নয়, নারী স্বাধীনতা নয়…মানুষ হিসেবে একজন নারীও স্বাধীন।
লেখক: আরাফাত আরিফ, সাংবাদিক