দুই দলের দুই জন অন্যতম শীর্ষ নেতার অংশগ্রহণে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশেষ ঘরোয়া বৈঠকের পর আবারও কাছাকাছি এসেছে বিএনপি ও জামায়াত। দল দুটির শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি আগ্রহের বিষয়টিকে সামনে রেখে শীর্ষ নেতারা যুগপৎ কর্মসূচির কৌশল নিয়েও আলোচনা করেছেন। ফলে, আবারও রাজপথে সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতকেও দেখা যাবে। তবে ধর্মভিত্তিক ও বামপন্থি ঘরানার অন্যান্য দলগুলোকে যুগপৎ কর্মসূচির দিনে রাজপথে চাইলেও এখনও পর্যন্ত তেমন একটা সাড়া মেলেনি। এ ক্ষেত্রে আন্দোলন-কর্মসূচিতে যুক্ত না হলেও সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা ও নির্বাচন বর্জনের বিষয়ে সবগুলো দল ঐকমত্য পোষণ করেছে। বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, আগামী ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ‘মহাসমাবেশ’ কর্মসূচির দিনেই ‘মহাসমাবেশ’ ডাকতে পারে জামায়াত। আগামী দুয়েক দিনের মধ্যেই এ সংক্রান্ত ঘোষণা আসতে পারে। সূত্র জানায়, সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যাপক জমায়েত, মানুষের অংশগ্রহণ ও সর্বোপরি সরকারকে দাবি মানাতে বাধ্য করতে রাজপথে দুই দলের সমন্বিত অবস্থানের কোনও বিকল্প নেই বলে মনে করে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষনেতৃত্ব। একইসঙ্গে একাধিক ‘বিদেশি বন্ধু রাষ্ট্র’ও এ ব্যাপারে গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছে বলে দাবি করেছে সূত্র। রবিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। মাঝখানে কার্যকর ফলোআপ করা হয়নি। তবে বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলের মতো জামায়াতও কর্মসূচি পালন করেছে। এখন যেহেতু এই সরকারের পতনে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ, গোটা পরিস্থিতি সেদিকে ধাবিত হচ্ছে, ইনশাল্লাহ আবারও যুগপৎ কর্মসূচি শুরু হবে।’ কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ উল্লেখ করেন, ‘এবারের যুগপৎ হবে কার্যকর যুগপৎ আন্দোলন।’ এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি যেসব দলের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বে, সেখানে জামায়াত নেই। যুগপতের ব্যাপারে আমার জানা নেই। তবে তাদের মতো প্রোগ্রাম দেবে, কবে দেবে, কোথায় দেবে, সেটা তাদের ব্যাপার।’ বিএনপি ও দলটির সঙ্গে যুগপতে যুক্ত একাধিক জোটের নেতারা জানান, সরকার পতনের আন্দোলনকে আরও চাঙ্গা ও কার্যকর করতে যুগপতের বাইরে থাকা ধর্মভিত্তিক, বাম ও অন্যান্য ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে বিএনপি। এসব দলের সঙ্গে বিএনপির কিছু নেতা সরাসরি ও গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারাও কিছু দলের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে কয়েকটি সংগঠন ইতোমধ্যে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির তরফে ‘নানা অফার’ পাওয়ার কারণে তারা এরইমধ্যে প্রার্থী বাছাই কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। কিছু দল এখনও অপেক্ষা করছে— পরিস্থিতি কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে, কোন দল শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, সেসব পর্যবেক্ষণ করছে। এক সময় বিএনপি-জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি। বিএনপির পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি।’ ধর্মভিত্তিক দলের একটি সূত্র বলছে, পরিস্থিতি সরকারের বিরুদ্ধে গেলে নড়েচড়ে বসতে পারে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। বিভিন্ন সময় দলটির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক থাকলেও দলের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক কারাগারে থাকায় সে অবস্থা এখন নেই। ইতোমধ্যে তিন দিনের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে মামুনুল হকের মুক্তির দাবিতে। এগুলো হচ্ছে— ৩ নভেম্বর ঢাকায় পদযাত্রা কর্মসূচি, ১০ নভেম্বর দেশের জেলায় জেলায় বিক্ষোভ, ১ ডিসেম্বর রাজধানীতে ছাত্র সমাবেশ। শুক্রবার (২১ অক্টোবর) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ইসমাঈল নূরপুরী উল্লেখ করেন মামুনুল হককে মুক্তি না দিলে নির্বাচন প্রতিহত করা হবে। তবে দলটির সূত্র জানায়, মাওলানা মামুনুল হক মুক্তি পেলেও সরকারের সঙ্গে আর আপসরফার সুযোগ নেই। এ কারণে রাজনৈতিকভাবে বিএনপির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখার পক্ষে দলের একটি অংশ। গণতন্ত্র মঞ্চের একজন নেতা জানান, বাম ঘরানার মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক— সিপিবি, বাসদসহ অন্যান্য দল যুগপৎ কর্মসূচিতে যুক্ত না হলেও তারাও মুভমেন্টের বাইরে থাকতে চায় না। এ কারণে অফিসিয়ালি বাম দলগুলো যুগপতে যুক্ত হবে না। তবে কোনও না কোনোভাবে তারা রাজপথে থাকবে এবং নির্বাচনি শিডিউল এলে তা প্রত্যাখ্যান করে কর্মসূচি দেবে। ইসলামী আন্দোলনের একাধিক নির্ভরযোগ্য নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বিএনপির পক্ষ থেকে ইসলামী আন্দোলনকে কাছাকাছি নেওয়ার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে দলের শীর্ষনেতাদের নিয়মিত ফোনালাপ হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শুক্রবার (২০ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ইসলামী আন্দোলনের যুব সমাবেশে যোগ দিয়েছেন যুবদল সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল। তবে ইসলামী আন্দোলন এককভাবেই সরকারবিরোধী কর্মসূচি এগিয়ে নেবে। এক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে মিল রেখে যুগপৎ কর্মসূচিতে যুক্ত হবে না ইসলামী আন্দোলন। দলের একজন প্রভাবশালী নেতা বলেন, ‘বিএনপি প্রকাশ্যে ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে বসতে রাজি নয়। সম্প্রতি পূজার একটি অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মৌলবাদীদের ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেছেন। এসব কিছু আমাদের সামনে রয়েছে। ফলে, তাদের সঙ্গে যুগপতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই।’ ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেন, ‘যুগপতের ব্যাপারে এখনও চিন্তা নাই কোনও। তারা যেসব দাবি নিয়ে মাঠে আছে— নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি, অবাধ নির্বাচনের পথ তৈরির দাবিতে, এসব দাবিতে আমরাও মাঠে আছি। রাজনীতির ময়দানে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়— আওয়ামী লীগের সঙ্গে, বিএনপির সঙ্গে বা অন্যান্য আরও অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তবে এখনও যুগপৎ নিয়ে কিছু চিন্তায় আসেনি।’ দলের প্রচার ও দাওয়াহ বিষয়ক সম্পাদক আহমদ আবদুল কাইয়ূম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আগামী ২৭ অক্টোবর জেলায় বিক্ষোভ ও ৩ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ ডেকেছে ইসলামী আন্দোলন। বিএনপি ও যুগপতে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, আগামী ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় মহাসমাবেশ থেকে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা আসবে। এসব কর্মসূচির মধ্যে অবস্থান, ঢাকামুখী পদযাত্রা, অবরোধের মতো কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হলেও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে আরও অন্তত তিন দিন সময় নেবে বিএনপি। নেতারা জানান, আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যুগপৎসঙ্গীদের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক হবে। ওই বৈঠকের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন। গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা সাইফুল হকের ভাষ্য— মহাসমাবেশ থেকে নতুন প্রোগ্রাম আসবে। কর্মসূচি কঠোরতার দিকে যাবে। আন্দোলনের যতগুলো ফর্ম আছে, তা সবই করা হবে। পরিস্থিতি বাধ্য করছে এবং সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করবে কর্মসূচির ধরন। আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সরকারকে বিদায় করতে চাই। সরকার নির্বাচন করতে পারবে না। দেশের মানুষ একতরফা নির্বাচন হতে দেবে না। মঞ্চের আরেক প্রভাবশালী নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘মহাসমাবেশে কী আসবে তা এখনও নির্ধারণ হয়নি। আমাদের কিছু মিটিং আছে, সেগুলোর পর দেওয়া হবে।’ তবে বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, মহাসমাবেশের পর প্রতিটি রাজনৈতিক ইভেন্টকে কেন্দ্র করে প্রোগ্রাম আসবে। নির্বাচনি শিডিউল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে একটি বড় প্রোগ্রাম আসবে। এভাবে ক্রমান্বয়ে নির্বাচনের দিকে গেলে নির্বাচন বর্জন ও মানুষকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে কর্মসূচি দেওয়া হবে। সবকিছুতেই মার্কিন ভিসানীতির বিষয়টিকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় রাখছে বিএনপির শীর্ষনেতৃত্ব। তবে মাহমুদুর রহমান মান্না ও সাইফুল হক মনে করেন, সরকার কোনও অবস্থাতেই নির্বাচন পর্যন্ত যেতে পারবে না। এর আগেই সরকারের পতন নিশ্চিত হবে। মঞ্চের সমন্বয়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু দাবি করেন, আমি বিশ্বাস করি, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন হবে।

