
প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার সোনাইছড়ি ১০ কিউসেক ভাসমান পাম্প স্কীম
হাসান রেজা : দেশের ২৬টি জেলার ৭৯টি উপজেলায় ৫৬ হাজার ৯শ’ ৪৫ হেক্টর জমিতে ডাবল লিফটিং প্রযুক্তিতে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ১ লাখ ৭০ হাজার ৮শ’ ৩৫ মে. টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিকল্পনা দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)’র আওতাধীন ডাবল লিফটিংয়ের মাধ্যমে ভূ-পরিস্থ পানির সাহায্যে সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্প (৩য় পর্যায়) বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, বাংলাদেশের সেচ পদ্ধতি মূলত ভূ-গর্ভস্থ পানি নির্ভর। প্রতিনিয়ত ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ার সাথে সাথে ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাকৃতিক উৎস যেমন-শাখা খাল, নদী, হাওড়, বাওড়সহ অন্যান্য উৎসে পানির প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক জলাধারের পানির স্তর শস্যক্ষেতের তুলনায় নীচে নেমে যাওয়ার কারণে ল্যান্ড বেইজড পাম্প দিয়ে শস্যক্ষেতে সরাসরি সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না। এ সমস্যা থেকে উত্তরোণের পদ্ধতি হিসেবে প্রথমত বড় ধরণের পাম্পিং সেট যেমন ২৫ কিউসেক, ১২.৫ কিউসেক ও ১০-কিউসেক ভাসমান পাম্প ব্যবহার করে বড় বড় নদী, বিল থেকে পানি প্রাইমারি লিফটিং করে শাখা খাল বা অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাধারে সরবরাহ করা হয়। পরবর্তীতে ছোট ছোট ল্যান্ড বেইজড পাম্প (৫ কিউসেক, ২ কিউসেক, ১ কিউসেক) ব্যবহার করে সেই পানি সেকেন্ডারি লিফটিংয়ের মাধ্যমে ফসলি জমিতে সেচ দেয়া হয়। দুইবার পানি উত্তোলন করে জমিতে সেচ দেয়ার এই পদ্ধতি ডাবল লিফটিং সেচ পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত।
বিএডিসি সূত্র জানায়, ৮২.৪০৮০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ইতোপূর্বে ‘ডাবল লিফটিংয়ের মাধ্যমে ভূ-পরিস্থ পানির সাহায্যে সেচ সম্প্রসারণ (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্প জুলাই-১৯৯৯ হতে জুন-২০০৭ মেয়াদে দেশের ২২টি জেলায় বাস্তবায়িত হয়েছে। পরবর্তীতে প্রকল্পটির ২য় পর্যায় গ্রহণ করা হয় এবং ১০৬.৬৮৩৩ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই-২০০৯ হতে জুন-২০১৪ মেয়াদে ৩২টি জেলার ৯৫টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের ২য় পর্যায়ের সফলতা বিবেচনায় এর ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে অধিক এলাকা সেচের আওতায় এনে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রকল্পের ৩য় পর্যায় গ্রহণ করা হয় বলে জানা গেছে। বর্তমানে প্রকল্পের ৩য় পর্যায় ১শ’ ১৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে জুলাই-২০১৫ থেকে জুন-২০২০ মেয়াদে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার মল্লিকপুর শুনই ২৫ কিউসেক ভাসমান পাম্প স্কীম
সূত্রমতে, প্রকল্প এলাকায় অতিরিক্ত ১৭০৮৩৫ মে. টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে ৫৬৯৪৫ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আনয়নের জন্য কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। পাশাপাশি সেচের পানি পরিবহন ও সঞ্চিত পানির পরিমাণ বৃদ্ধি করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের নিকট সঠিক জায়গায় এবং সঠিক সময়ে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং ‘অন ফার্ম ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট টেকনোলজি’ ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের ফলন পার্থক্য কমানো এবং প্রকল্প এলাকায় আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতেও কাজ চলছে। এছাড়া, আধুনিক কারিগরি জ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে ইরিগেশন ওয়াটার ইউজার এসোসিয়েশন এবং কৃষকদের দক্ষতার উন্নয়নেও বেশকিছু কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্প এলাকায় ৫৬,৯৪৫ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে ১০৮টি ভাসমান পাম্প ও ৪৩৩টি ল্যান্ড বেইজড্ পাম্প ক্ষেত্রায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প মেয়াদে ৮ সেট ১০ কিউসেক ভাসমান পাম্প সেট ক্রয়, ১০ সেট ১২.৫ কিউসেক ভাসমান পাম্প ক্রয়, ৩০ সেট ১০০ অশ্বশক্তি সম্পন্ন বৈদ্যুতিক মটর (ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড) ক্রয়, ৫০ সেট ৩৫-৪০ অশ্বশক্তি সম্পন্ন বৈদ্যুতিক মটর (ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড) ক্রয়, ১০০ সেট ৩০ অশ্বশক্তি সম্পন্ন বৈদ্যুতিক মটর (ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড) ক্রয়, ২ সেট সোলার পাম্পিং সেট ও প্যানেল ক্রয়, মালামাল ক্রয়সহ ১০০ কিলোমিটার বারিড পাইপ লাইন নির্মাণ, ১৮০টি ডিসচার্জ বক্স নির্মাণ, ২০ হাজার মিটার পাকা সেচনালা নির্মাণ, ৫০টি হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার নির্মাণ, ৫৫ কি. মি. সংযোগ খাল পুনঃখননসহ অন্যান্য স্ট্রাকচার নির্মাণ ও ১৫০টি বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের কার্যক্রমে ইতোমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এর মধ্যে ১ সেট ৫ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন সোলার পাম্পিং সেট ক্রয় ও স্থাপন করা হয়েছে, ৮ সেট ১০ কিউসেক পাম্পিং সেট ক্রয়, ১০ সেট ১২.৫ কিউসেক ভাসমান পাম্পের পন্টুন ক্রয়, ৩০ সেট ১০০ অশ্বশক্তির বৈদ্যুতিক মটর ক্রয়, ২০ সেট ডিজেল ইঞ্জিনচালিত ৫ কিউসেক পাম্পিং সেট ক্রয়, ৫০ সেট বৈদ্যুতিক মটরচালিত ৫ কিউসেক পাম্পিং সেট ক্রয়, ১ লাখ ২২ হাজার মিটার ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, ৫ হাজার ৭৫ মিটার ভূ-পরিস্থ সেচনালা নির্মাণ, ৩৫ কি. মি. সংযোগ খাল পুনঃখনন, ৯৩টি হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার (ফ্লুম, ডিসচার্জ বক্স, পাইপ কালভার্ট, ফুট ব্রীজ, রিটেইনিং ওয়াল ও অন্যান্য সেচ অবকাঠামো) নির্মাণ এবং ১০০টি সেচ স্কীমে বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
চলতি ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ল্যান্ড বেইজড পাম্পের খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয়সহ ১৬ সেট ব্যারিড পাইপ লাইনের মালামাল ক্রয়, ১ সেট ৫ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন সোলার পাম্পিং সেট ক্রয় ও স্থাপন, ৭ হাজার ৯শ’ ৭০ মিটার ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, ১০ কি. মি. সংযোগ খাল পুনঃখনন, ১৩০টি হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার (ফ্লুম, ডিসচার্জ বক্স, পাইপ কালভার্ট, ফুট ব্রীজ, রিটেইনিং ওয়াল ও অন্যান্য সেচ অবকাঠামো) এবং ২৮টি সেচ স্কীমে বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নভেম্বর-২০১৮ পর্যন্ত ৩৫ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সুলতান আহমেদ দৈনিক পাঞ্জেরী’কে বলেন প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প এলাকায় সেচকাজে ভূ-পরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়বে এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমবে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখাসহ দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে এবং প্রকল্প এলাকার দারিদ্র বিমোচনসহ আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

