
প্রকল্পের কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ (সিআইজি) সদস্যদের মাঝে উপকরণ বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ন চন্দ্র চন্দ
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছে ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রজেক্ট (এনএটিপি)-২। বর্তমান সরকারের যুগান্তকারী বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে ইতোমধ্যে প্রাণিসম্পদ একটি সম্ভাবনাময় ও লাভজনক শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাণিসম্পদ অঙ্গের তত্ত্বাবধানে উপযুক্ত প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাতকে আরো সমৃদ্ধ ও টেকসইকরণে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) ও ইউএসএঅঅইডি’র আর্থিক সহায়তায় দেশের ৫৭টি জেলার ২৭০টি উপজেলায় ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম-ফেজ ও প্রজেক্ট (এনএটিপি-২) বাস্তবায়ন করছে। এনএটিপি-২ প্রকল্পটি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), মৎস্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে। ক্ষুদ্র খামারের কৃষিপণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নির্বাচিত জেলাসমূহে ক্ষুদ্র খামারিদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে প্রবেশাধিকারের সক্ষমতার উন্নয়ন ঘটানো প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। প্রকল্প দলিল অনুযায়ী, প্রকল্পটি ১ অক্টোবর-২০১৫ থেকে শুরু হয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ সালে সমাপ্ত হওয়ার সময় নির্ধারিত হলেও প্রকল্পটি একনেকে মে-২০১৬ সালে পাশ হয়। প্রকৃতপক্ষে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে। প্রকল্পটির ১ম পর্যায়ের কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাসমূহ ২য় পর্যায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রকল্পটির কার্যক্রম ৫টি অংগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। গবেষণা অংগের কার্যক্রম বিএআরসি, ফসল অংগ ডিএই, মৎস্য অংগ মৎস্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অংগ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা অংগ কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রাণিসম্পদ অংগের আওতায় প্রতি ইউনিয়নে ৩টি করে মোট ৮,০৯৭টি প্রাণিসম্পদ সম্পর্কিত কৃষক দল কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ (সিআইজি) গঠন করা হয়েছে। সিআইজি’র মোট সদস্য সংখ্যা ২,০৮,০৫০ জন। ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিজস্ব জনবল না থাকায় প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য প্রতি ইউনিয়নে ১ জন করে মোট ২,৬৮১ জন কমিউনিটি এক্সটেনশন এজেন্ট ফর লাইভস্টক (ঈঊঅখ)-সিল নিয়োজিত করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র খামারে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। সিআইজিভুক্ত কৃষকসহ অধিক সংখ্যক কৃষকের মাঝে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি সম্প্রসারণে প্রযুক্তি প্রদর্শনী, উন্নত জাতের ঘাস চাষ প্রদর্শনী, মাঠ দিবস, উদ্বুদ্ধকরণ ভ্রমণ, কৃষক সমাবেশ, টিকা প্রদান ক্যাম্পেইন, কৃমি দমন ক্যাম্পেইন, উর্বরতা ক্যাম্পেইন ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।

প্রকল্পের উদ্যোগে টিকা প্রদান ক্যাম্পেইন
সংশ্লিষ্টরা জানান, আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি সম্প্রসারণে আইসিটি’র ব্যবহার বাড়ানোর জন্য প্রকল্পে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়াও কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে নির্বাচিত উৎপাদক সংগঠনগুলোকে প্রশিক্ষণসহ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার ফলে সামাজিক ও পরিবেশগত দিক থেকে যাতে কোন ক্ষতি না হয় সেজন্য সামাজিক ও পরিবেশ সুরক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা উন্নয়নে প্রকল্পের আওতায় আর্থিক সহায়তা প্রদানের সংস্থান আছে। ক্ষুদ্র খামারের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর সিআইজিগুলো প্রাণিসম্পদ লালন পালন সংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও চিহ্নিত সমস্যা সমাধানে কার্যক্রম গ্রহণের জন্য ক্ষুদ্র পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। ক্ষুদ্র পরিকল্পনাসমূহ ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সমন্বিত হয়ে উপজেলা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা করা হয়। উপজেলা সম্প্রসারণ সমন্বয় কমিটি (ইউইসিসি) কর্তৃক অনুমোদিত সম্প্রসারণ পরিকল্পনা মোতাবেক প্রকল্প থেকে বাজেট বরাদ্দ প্রদান করা হয় এবং মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয় বলে জানা গেছে।
এছাড়া, ৬,৯২২টি ব্যাচে ২,০৭,৬৬০ জন সিআইজি সদস্যকে উন্নত পদ্ধতিতে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি লালন পালনের উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সিআইজি পর্যায়ে ৪,৫৬৫টি প্রযুক্তি প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। পশুস্বাস্থ্য উন্নয়ন ও রোগবালাই প্রতিরোধে ১০,৪৬২টি টিকা প্রদান ক্যাম্পেইন এবং ৭,৫২২টি কৃমি দমন ক্যাম্পেইন আয়োজন করা হয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য ২,২৭৭টি মাঠ দিবস ও ২৭০ টি এক্সপোজার ভিজিটের আয়োজন করা হয়েছে।
কার্যকর ও ফলপ্রসূভাবে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার জন্য দক্ষ সম্প্রসারণ জনবল প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ২৪টি ব্যাচে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ৭০০ কর্মকর্তা, ৬টি ব্যাচে ১৮০ জন স্টাফ এবং ৪৮টি ব্যাচে ১,৪৪০ জন সম্প্রসারণ কর্মীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রকল্পের আওতায় এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রকল্পটির প্রাণিসম্পদ অংগের পরিচালক ডা. মনজুর মোহাম্মদ শাহজাদা নির্ধারিত সময়ে সকল কার্যক্রম বাস্তবায়নসহ শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, প্রকল্পটি সমাপ্ত হলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত আরো সমৃদ্ধ হবে এবং খাত সংশ্লিষ্ট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।

