
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এমপি কর্তৃক রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় প্রকল্পের প্রশিক্ষণ উদ্বোধন এবং উপকরণ বিতরণ কার্যক্রম
হাসান রেজা : দুগ্ধজাত গাভীর জেনেটিক মান বৃদ্ধির মাধ্যমে অধিক দুধের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতাধীন ব্রীড আপগ্রেডেশন থ্রু প্রজেনী টেস্ট প্রকল্প (৩য় পর্যায়)। প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ ধরনের প্রজনন কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন জাতের সুপিরিয়র প্রুভেন ষাঁড় তৈরি করা হচ্ছে; এর ফলে দেশে সংকর জাতের গাভীর উৎপাদন এবং পুনরুৎপাদন বৈশিষ্ট্যাবলির নিম্নমুখিতা দূর করে দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৫০ ভাগ চাহিদা পূরণ হয় প্রাণিসম্পদ উপখাত থেকে। তাই দুধ, ডিম, মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর আমিষের চাহিদা পূরণে কাজ করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। সংস্থাটির আওতাধীন ব্রীড আপগ্রেডেশন থ্রু প্রজেনী টেস্ট প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষায় ১ম এবং ২য় পর্যায়ের সফল সমাপ্তির পর বিগত ২০১৪ সাল থেকে প্রকল্পটির ৩য় পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ৪৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এ প্রকল্পটি ২০১৯ সালে সমাপ্ত হবে। কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র আছে দেশের এমন জেলাসমূহের ১৮০টি উপজেলা এবং অধিক দুগ্ধ উৎপাদনশীল এলাকায় প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পভুক্ত এলাকায় উচ্চ কৌলিতাত্ত্বিক গুণসম্পন্ন প্রজনন স্টক গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে গরুর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং দেশে আমিষের ঘাটতি অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রমতে, সুপিরিয়র প্রুভেন বুল উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে উচ্চ জেনেটিক মানসম্পন্ন বুল হতে সিমেন উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। এছাড়া, প্রুভেন বুল উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রজেনী টেস্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত সংযোগ খামারিদের সংগঠিত করা ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেও বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন ডেইরি ব্রিডিং বুলের চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে অধিক উৎপাদনশীল গাভী চিহ্নিতকরণ ও নিবন্ধিকরণও প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
সূত্র জানায়, প্রকল্পের ৩য় পর্যায়ের আওতায় ক্যান্ডিডেট বুলের বকনা প্রজেনীর সকল তথ্যাদি মূল্যায়ন করে এ পর্যন্ত ৮টি বুলকে সুপিরিয়র প্রুভেন বুল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি এই ৮টি বুলকে প্রুভেন বুল হিসেবে ঘোষণা করেন। এ সকল প্রুভেন বুল হতে সংগৃহীত সিমেন কৃত্রিম প্রজনন কাজে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট রোডম্যাপ অনুসারে বিভিন্ন জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া, মোট ৮৬টি ক্যান্ডিডেট বুল নির্বাচন করা হয়েছে এবং এদের সিমেন সংগ্রহ করে মাঠ পর্যায়ে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে প্রায় ৫,০০০ প্রজেনী উৎপাদিত হয়েছে। এ সকল প্রজেনীর তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে আগামী ২০২০ সাল থেকে ক্যান্ডিডেট বুলকে প্রুভেন বুল হিসেবে মূল্যায়নের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং এর মধ্য হতে প্রতি বছর ২-৩টি বুলকে সুপিরিয়র প্রুভেন বুল হিসাবে ঘোষণা করা হবে। পরবর্তীতে উচ্চ জেনেটিক মানসম্পন্ন ষাঁড় পাওয়ার জন্য সর্বোত্তম গাভীগুলোর সাথে কৃত্রিম প্রজনন করা হবে।

সংযোগ খামারীদের মাঝে ইনসেনটিভ বিতরণ
বাস্তবায়িত কার্যক্রমসমূহ : প্রকল্পের আওতায় গবাদিপশুর আধুনিক ও উন্নত ব্যবস্থাপনা, প্রুভেন বুল তৈরির জন্য প্রজেনীর তথ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ৩,৬১৩ জন সংযোগ খামারি, ৪৩৭ জন এলিট গাভীর মালিক, ২৫৬ জন কর্মকর্তা ও ১৬০ জন কর্মচারিকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ৩,৬১৩ জন সংযোগ খামারী ও ৪৩৭ জন এলিট গাভীর মালিককে ইনসেনটিভ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া, প্রজেনী টেস্টিং পদ্ধতির আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কে ১০ জন কর্মকর্তা প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
৫০০টি এলিট গাভী নির্বাচন করে এসব গাভীর মালিককে ভবিষ্যতে প্রজেনী টেস্টিং কার্যক্রমে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার জন্য ইনসেনটিভ প্রদান করা হবে। সাধারণত যেসব দেশী-ফ্রিজিয়ান সংকর জাতের গাভীর প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ লিটার দুগ্ধ উৎপাদনশীলতা রয়েছে সেগুলোকে এলিট গাভী হিসেবে চিহ্নিত করে রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হয়। এ পর্যন্ত ৪৩৭টি এলিট গাভী নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রকল্প এলাকার এলিট গাভীর মালিক ও নির্বাচিত খামারিদের কাছ থেকে ১৩-১৮ মাস বয়সী দেশি-ফ্রিজিয়ান সংকর জাতের উচ্চ জেনেটিক মানসম্পন্ন ১৭৭টি ষাঁড় বাছুর নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় গবাদিপশুর বিজ্ঞানভিত্তিক লালনপালনের উদ্দেশ্যে খামারিদের গাভী, বকনা, ষাঁড় বাছুরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন-মিনারেল প্রিমিক্স, কৃমিনাশক ট্যাবলেট, টিকা এবং ঔষধ সরবরাহ করা হচ্ছে। তাছাড়া, ক্যান্ডিডেট বুলের সিমেন প্রসেসিং, ক্যারিওটাইপিং এবং বিভিন্ন রোগের ল্যাবরেটরি ডায়াগনোসিসের জন্য বিভিন্ন প্রকার কেমিক্যালস এবং রি-এজেন্টও সরবরাহ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. লুৎফর রহমান খান দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, বর্তমান জনবান্ধব সরকারের সময়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রজনন ব্যবস্থাপনা, যথাযথ সিলেকশন-কালিং পদ্ধতি অনুসরণ এবং দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেকসইকরণের ফলে দুধ এবং মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পন্ন হলে দেশের দুগ্ধ শিল্প আরো সমৃদ্ধ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

