নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘সময় এখন নারীর : উন্নয়নে তাঁরা, বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরে কর্ম জীবনধারা’ শিরোনামে আজ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে উদ্যাপিত হচ্ছে নারী দিবস। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অধিকার রক্ষা, নারী-পুরুষের সমতা ও নারীর প্রতি ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাই এবারের নারী দিবসের মূল লক্ষ্য।
দেশ গড়ার সব কাজেই আজ পুরুষের সহযোদ্ধা হিসেবে অবদান রাখছেন নারীরা। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, বিচার, প্রশাসন, কূটনীতি, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সর্বক্ষেত্রে নারীর সফল ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা এখন যথেষ্ট দৃশ্যমান।
সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে বিশ্বের সব উন্নয়নের সম-অংশীদার হিসেবে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের নারীসমাজও একইভাবে বেগম রোকেয়ার দেখানো পথ ধরে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, মহান স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধসহ দেশ গঠনে অসামান্য ভূমিকা রেখে চলেছে।
মানুষ হিসেবে একজন নারী পরিপূর্ণ অধিকারের দাবিতে দীর্ঘকাল যে আন্দোলন চালিয়ে আসছে, তারই সম্মানস্বরূপ প্রতি বছর ৮ মার্চ পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আদি নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস। দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস।
১৮৫৭ সালে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৮ সালে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। ওই সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন।
সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সম অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ দিবসটি পালন শুরু হয়। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের আগে দিবসটি পালিত হয়। ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করার পর দিবসটি পালনের জন্য জাতিসংঘ আহ্বান জানায়। ১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৮মার্চ নারী দিবস পালনের জন্য উত্থাপিত বিল অনুমোদন পায়। ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করে । ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০০৯ সালে বিশ্বের ২৯টি দেশে সরকারি ছুটিসহ প্রায় ৬০টি দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালিত হয়। তবে ২০১০ সালে বিশ্বজুড়ে নারী দিবস পালনে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বানী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ ও বিশ্বের সকল নারীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
নারী দিবসে বিশ্বের ২৭-২৮টি দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। এতকিছুর পরও নারী শ্রমিক এখনো পুরুষের চেয়ে কম পারিশ্রমিক পায়।
আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের ২০০৯-এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে পুরুষের চেয়ে নারী ১৬ শতাংশ পারিশ্রমিক কম পায়। অন্য এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে নারীরা কাজ করছে শতকরা ৬৫। বিপরীতে তার আয় মাত্র শতকরা ১০। পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সংখ্যানুপাত প্রায় সমান। অথচ দুনিয়ার মোট সম্পদের একশ ভাগের মাত্র এক অংশের মালিক মেয়েরা। মেয়েদের গৃহস্থালি কাজের আর্থিক স্বীকৃতি এখনো দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ তা অর্থনৈতিক মূল্যে অদৃশ্যই থাকে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা তো বটেই, উন্নত বিশ্বের চিত্রটাও অনেকটা একই।

