
ঢাকার সাভারে নির্মাণাধীন ‘প্রাণিসম্পদ মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার’
হাসান রেজা : প্রাণিসম্পদ উপখাতের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণ করে মানসম্পন্ন প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্মিত হচ্ছে আন্তর্জাতিকমানের একটি গবেষণাগার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতাধীন ‘প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার স্থাপন প্রকল্প’র তত্ত্বাবধানে রাজধানীর অদূরে সাভারের সিএমবি মোড়ে ১.৬৪ একর জমিতে গড়ে তোলা হবে এ গবেষণাগার।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পন্ন হলে প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ যেমন পশু-পাখির খাদ্য, ঔষধ, প্রজনন উপকরণ ইত্যাদি এবং উৎপাদিত দ্রব্যাদির মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদের উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া, গুণগত মানসম্পন্ন মাংস ও মাংসজাত দ্রব্যাদি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও সহায়ক হবে।
প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৬৬ কোটি ১৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা এবং এর বাস্তবায়নকাল জুলাই-২০১৬ হতে জুন-২০১৯ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রাণিসম্পদের খাদ্য ও ফিড এডিটিভস্সহ ঔষধ, হরমোন, স্টেরয়েড ও তার রেসিডিউ এর গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে বেসকরকারি খাতে গুণগত মানসম্পন্ন পশু-পাখির খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণ উৎপাদনের জন্য সনদ প্রদান করা যাবে। এছাড়া, প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনাসহ প্রাণিসম্পদ হতে উৎপাদিত পণ্য ও উপজাতের রুটিন এনালাইসিস পরিচালনা করা সম্ভব হবে। সর্বোপরি প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে গুণগত মানসম্পন্ন পশু-পাখির খাদ্য ব্যবহারে জনসচেতনতা সৃষ্টি হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রাণিসম্পদ উপখাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উপখাত মানব খাদ্য হিসেবে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র হ্রাস ও খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। কিন্তু, দেশে গুণগত মানসম্পন্ন প্রাণিজাত খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়নি। এছাড়া, প্রাণিজাত খাদ্যের পুষ্টি ও নিরাপত্তায় ভোক্তাদের সচেতনতাও বর্তমানে অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, বর্তমানে দেশে বাণিজ্যিক মুরগি উৎপাদন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পশু-পাখির ঔষধ, প্রজনন সামগ্রী ও খাদ্য সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। চাহিতব্য এসব উপকরণ অভ্যন্তরীণ উৎস হতে মেটানোর পাশাপাশি প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। নির্মিতব্য এই গবেষণাগারটি দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত এবং আমদানিকৃত এসব পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, গুণগত মানের নির্দেশক তৈরি, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ, মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার স্থাপন, মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রকল্পের কার্যক্রমের ফলে কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দারিদ্র হ্রাস পাবে, নারীর ক্ষমতায়ন ঘটবে, খাদ্য নিশ্চয়তা ও খাদ্য নিরাপত্তা ইস্যুতে কার্যকরি ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় বর্তমানে ৬৪টি জেলা প্রাণি হাসপাতাল, ৯টি এফডিআইএল, ১ টি সিডিআইএল, ১টি নিউট্রিশন ল্যাব, ১টি পাবলিক হেলথ সেকশন এবং ১টি মাননিয়ন্ত্রণ শাখা চলমান আছে। এসকল গবেষণাগারে কেবলমাত্র কিছু রুটিন পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। যা বিশ্বের অন্যান্য গবেষণাগারের স্ট্যান্ডার্ড এর সমকক্ষ নয় এবং মান নিয়ন্ত্রনের জন্য যথেষ্ট নয়। এছাড়া বর্তমানে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য বিষয়ে অনেক সচেতন হয়েছেন; খামারিরা গবাদি পশু-পাখি লালন পালনে উন্নত উপকরণের নিশ্চয়তা চান।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রাণিসম্পদের সকল উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত রোগ, রোগ জীবাণু, রাসায়নিক ও জৈব রাসায়নিক পদার্থের অনুপ্রবেশকে রোধ করা যাবে। এই গবেষণাগারটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে পদক্ষেপ নিবে এবং অন্যান্য গবেষণাগারের সাথে সমন্বয় সাধন করবে। এছাড়া, এই গবেষণাগারে পরীক্ষা ফি, এনালাইসিস ফি সংগ্রহের মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের পথকেও সুগম করবে।
প্রকল্পটির প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে ৬তলা বিশিষ্ট একটি মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব, ৪তলা বিশিষ্ট একটি ডরমিটরি ভবন, বাউন্ডারি ওয়াল, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ডিপ টিউবওয়েল, ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) ইত্যাদি নির্মাণ করা। পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগারের জন্য যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, কেমিক্যাল ও রি-এজেন্ট ক্রয় করা হবে। এছাড়া, মাঠ পর্যায়ের ৫শ’ জন কর্মকর্তা ও ৫শ জন কর্মচারিদের ২দিন মেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং ১০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশে এবং ৩২ জন কর্মচারিকে দেশে মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। তাছাড়া, মান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ইনভেস্টিগেটিভ গবেষণাও পরিচালিত হবে বলে জানায় প্রকল্প অফিস।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মোস্তফা কামাল দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, প্রকল্পের অধীন ল্যাব এবং ডরমিটরি ভবনের নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং তা দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০১৮ সালের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ হবে এবং ২০১৯ সালের শুরুর দিকেই প্রাণিসম্পদের মান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম শুরু করা যাবে। ফলে গুণগত মানসম্পন্ন এবং নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ তথা দুধ মাংস ডিম সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মেধা সম্পন্ন জাতি গঠনে বর্তমান জনমুখী সরকারের অঙ্গিকার বাস্তবায়িত হবে। মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের জন্য এটি হবে একটি মাইলস্টোন।

