
রাজধানীর গাবতলীতে নবনির্মিত কেন্দ্রীয় বীজ পরীক্ষাগার
হাসান রেজা : বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) রাজধানী ঢাকার গাবতলীতে গড়ে তুলেছে আন্তর্জাতিকমানের বীজ পরীক্ষাগার যা দেশের সম্ভাবনাময় বীজ শিল্পে নবদিগন্তের সূচনা করেছে। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এ পরীক্ষাগার বীজ পরীক্ষণ সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ প্রযুক্তির উপকরণ ও যন্ত্রপাতি দ্বারা সমৃদ্ধ বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, দেশের বীজ শিল্পকে এগিয়ে নিতে ১৯৭৪ সালে ময়মনসিংহের দোলাদিয়ায় বীজ পরীক্ষাগারের যাত্রা শুরু হয়। বিএডিসি ও বেসরকারি পর্যায়ে গুণগত মানসম্পন্ন বীজের চাহিদা ও সরবরাহ নিশ্চতকরণে পরীক্ষাগারটি ১৯৮৪ সালে রাজধানীর গাবতলীতে স্থানান্তর করা হয়। এটি ১৯৯৮ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল সিড টেস্টিং এজেন্সি (আইএসটিএ)’র সদস্য। সংশ্লিষ্টরা জানান, পুরাতন পরীক্ষাগারে বীজ পরীক্ষণে বেশকিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, সংকট ছিল আধুনিক ও উন্নত যন্ত্রপাতির। আইডিবি’র অর্থায়নে নির্মিত নতুন পরীক্ষাগারটি আধুনিক ও উন্নত যন্ত্রাপাতি দ্বারা সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে বীজ পরীক্ষণ ও বীজ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের যেকোন অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে।
সূত্র জানায়, ৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন এ ল্যাবরেটরি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বীজ পরীক্ষার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে আধুনিক ও উন্নত বিভিন্ন ধরণের উপকরণ ও যন্ত্রপাতি। ৪তলা বিশিষ্ট এ ভবনে পরীক্ষাগারের পাশাপাশি রয়েছে আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ডরমেটরি।
জানা গেছে, ৭তলা ভিত্তির উপর ৪তলা স্থাপনার মোট আয়তন ১ হাজার ৯শ’ ৮৪ বর্গমিটার। ভবনের প্রথম তলায় রয়েছে একটি করে বীজ নমুনা রেজিস্ট্রেশন, আর্দ্রতা পরিমাপকরণ, নমুনা প্রস্তুতকরণ ও বীজ সেটিং কক্ষ এবং ৩টি জার্মিনেশন চেম্বার। দ্বিতীয় তলায় আছে বীজের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ৩টি কক্ষ, গার্ড স্যাম্পল সংরক্ষণ এবং বীজের বিশুদ্ধতা নির্ণয় কক্ষ।
বীজ পরীক্ষণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আধুনিক ও উন্নত যন্ত্রপাতি আমদানির মাধ্যমে সমৃদ্ধ করা হয়েছে এই পরীক্ষাগার। বীজের পিউরিটি টেস্টর জন্য এখানে আছে ভারত থেকে আমদানিকৃত পিউরিটি সিড বোর্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকট্রিক্যাল ব্যালান্স; বীজ পৃথকীকরণের জন্য ভারত থেকে আমদানিকৃত সেন্ট্রিফিউগাল, কোনিক্যাল ও সয়েল/রিফল ডিভাইডার। একই দেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে সিড ব্লোয়ার ও সিড গ্রেডার। সঠিকভাবে আর্দ্রতা নিরূপণের জন্য এখানে আছে ভারত থেকে আমদানিকৃত সিড গ্রিন্ডার, কোরিয়ান ওভেন, কোরিয়ান ভ্যাকুয়াম ডেসিকেটর, যুক্তরাষ্ট্রের ময়েশ্চার এনালাইজার, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত থেকে আমদানিকৃত ইলেক্ট্রিক্যাল ময়েশ্চার মিটার। এ জাতীয় বীজ পরীক্ষণের জন্য আরো আছে ডিজিটাল ময়েশ্চার মিটার, সিভ শেকার, সিড স্যাম্পল ট্রায়ার, পিএইচ মিটার, হাইগ্রোমিটার, ডিজিটাল থার্মোমিটার থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সকল যন্ত্রপাতি। জার্মিনেশন টেস্টের জন্য আছে ভারত থেকে আমদানিকৃত অত্যাধুনিক জার্মিনেটর মেশিন ও চেম্বার। বীজ গণনার জন্য এখানে আছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ভারত থেকে আমদানিকৃত ইলেক্ট্রিক্যাল সিড কাউন্টার ও ভ্যাকুয়াম সিড কাউন্টার।

নিবিড় বীজ পরীক্ষণ
বীজের গুণগত মান নির্ণয়ের জন্য আছে জার্মানির মিডিয়া প্রিপারেশন চেম্বার, কোরিয়ান ইনকিউবেশন চেম্বার, কোরিয়ান ল্যামিনার এয়ার ফ্লো কেবিনেট, কোরিয়ান সেন্ট্রিফিউগ; রয়েছে জার্মানি ও যুক্তরাজ্য থেকে আমদানিকৃত সর্বশেষ প্রযুক্তির বিভিন্ন ধরণের মাইক্রোস্কোপ। এছাড়া আছে কোরিয়ান অটোক্লেভ, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লাস্ক স্ক্রাবার, গ্লাসওয়্যার ওয়াশার। পাশাপাশি গ্রো-আউট টেস্টের মাধ্যমে বীজের জেনেটিক বিশুদ্ধতা নিরূপণের সুন্দর ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এখানে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বেসরকারি উদ্যোক্তারাও এখানে তাদের বীজের গুণগত মান পরীক্ষা করাতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রতি নমুনা পরীক্ষা ফি ১০ টাকা, ময়েশ্চার পরীক্ষার জন্য ২ টাকা, বিশুদ্ধতা পরীক্ষার জন্য ৫ টাকা এবং জার্মিনেশন টেস্টের জন্য ১০ টাকা করে সার্ভিস চার্জ নেয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সারাবছর বিএডিসি’র এই পরীক্ষাগারে বিভিন্ন ফসলের বীজ পরীক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। পাশাপাশি বীজ সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রশিক্ষণ, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও আলোচনা সভার নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে এখানে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে বীজ প্রযুক্তির উপর প্রশিক্ষণ প্রদানের এতোদিন যে সীমাবদ্ধতা ছিলো নতুন এ পরীক্ষাগার স্থাপনের ফলে তা অনেকটা দূর হয়েছে। এখানে সরকারি, বেসরকারি, এনজিও কর্মকর্তাদের বীজ সম্পর্কিত আধুনিক প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির ওপর প্রশিক্ষণসহ বীজ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানগুলোও আয়োজন করা সম্ভব হবে। বিএডিসি’র নিজস্ব বীজ পরীক্ষণের যে চাহিদা রয়েছে তা বর্তমানে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। সেইসাথে বেসরকারি বীজ প্রতিষ্ঠানগুলোর বীজ পরীক্ষা করাও সম্ভব হচ্ছে। এ পরীক্ষাগারে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার বীজ নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরীক্ষাগার স্থাপনের ফলে বাংলাদেশের গুণগত মানসম্পন্ন বীজ রফতানির অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা জানান, বীজ ল্যাবরেটরিগুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল সিড টেস্টিং এজেন্সি (আইএসটিএ)। কিন্তু বাংলাদেশি কোনো এ প্রতিষ্ঠানের এতোদিন সনদ বা স্বীকৃতি ছিল না। নবনির্মিত ল্যাবরেটরির আইএসটিএ কর্তৃক স্বীকৃতি অর্জনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। সনদ অর্জিত হলে বীজ রফতানির জন্য প্রয়োজনীয় বীজ পরীক্ষা শেষে প্রত্যয়নপত্র প্রদান করবে এ ল্যাবরেটরি কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বীজ পরীক্ষাগারের যুগ্ম-পরিচালক মো. ওবায়দুল ইসলাম দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, সারাদেশে বিএডিসি কর্তৃক সরবরাহকৃত বীজের গুণগত মান এই ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর চাষিদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। বীজের গুণগত মান নিশ্চিত করে সরবরাহের কারণে অন্যান্য যেকোন উৎসের বীজের ফলনের চেয়ে বিএডিসি’র বীজের ফলন প্রায় ১৫-২০ শতাংশ বেশি। এতে করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে।

