হাসান রেজা : বাংলাদেশের ফলের রাজা আমের মনকাড়া ঘ্রাণ এখন পৌঁছে গেছে ইউরোপে। বিশ্বজুড়ে এখন বাংলাদেশের আমের কদর। তাই দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও গড়ে উঠছে বাংলাদেশের আমের বিশাল বাজার।
দেশের বাইরে বিশেষ করে ইউরোপে আম পাঠানোর তোড়জোড় পড়ে গেছে কৃষি বিভাগ ও রপ্তানিকারকদের মাঝে।
বাংলাদেশের সুস্বাদু আম রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপে বহির্বিশ্বে আমের বিশাল রপ্তানি বাজার উন্মুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের কীটনাশক, ফরমালিন ও বিষমুক্ত নিরাপদ আম দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন যাচ্ছে ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী পোকা দমনে সেক্স ফেরোমন ট্র্যাপ অথবা পেপারব্যাগ ব্যবহার করে আম চাষিরা ফলিয়েছেন নিরাপদ ও বালাইমুক্ত এই রপ্তানিযোগ্য আম।
সূত্র জানায়, ইউরোপে আম রপ্তানির ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার সাতক্ষীরার চুক্তিবদ্ধ চাষিদের মাধ্যমে উৎপাদিত নিরাপদ ও বালাইমুক্ত সুস্বাদু হিমসাগর আমের দু’টি চালান ইতালি এবং ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছে। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাসিন এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে মৌসুমের প্রথম এ চালানে ৭ মে. টন আম গেছে। আজ বুধবারও একই প্রতিষ্ঠানের আরো ৫ মে. টন আমের চালান যাওয়ার কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের উপপরিচালক (রপ্তানি) কৃষিবিদ মুহা. আনোয়ার হোসেন খান দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, আমাদের দেশের সুস্বাদু আম রপ্তানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)’র শর্ত অনুযায়ী চুক্তিভিত্তিক চাষের মাধ্যমে নিরাপদ আম উৎপাদনে শতভাগ প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। চলতি বছরের ১৫ মে থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত আমরা ইউরোপে আম রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছি।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি ও লক্ষ্মণভোগ আম ইউরোপে রপ্তানি হবে। এর মধ্যে ৬০-৭০ শতাংশ হিমসাগর, ২০ শতাংশ ল্যাংড়া এবং বাকি ১০ শতাংশ অন্যান্য জাতের আম রপ্তানি হবে। এ বছর চুক্তিভিত্তিক চাষিদের মাধ্যমে দেশের ১৫টি জেলার ৫২ উপজেলায় প্রায় ৩ হাজার একর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। এ থেকে প্রায় ২৪ হাজার মে. টন আম উৎপাদনের আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। চলতি বছর ইউরোপে প্রায় ৮শ’ মে. টন এবং অন্যান্য দেশে আরো ৭-৮শ’ মে. টন আম রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে আম রপ্তানি নতুন নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০১৫ সালে ৭শ’ মে. টন আম ইউরোপে রপ্তানি হয়েছে। তবে ২০১৬ সালে ইইউ’র বেঁধে দেওয়া শর্তাবলী প্রতিপালিত না হওয়ায় মাত্র ২৭০ মে. টন আম রপ্তানি হয়। চলতি বছর নিরাপদ ও বালাইমুক্ত আম উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টরা আগে থেকেই উদ্যোগী হয়েছে। ইইউ’র শর্তাবলী প্রতিপালন সাপেক্ষে নিরাপদ ও বালাইমুক্ত আম উৎপাদনে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস অনুসরণ ও চুক্তিভিত্তিক চাষ নিশ্চিত করা হয়।
রাজধানীতেও পাওয়া যাবে নিরাপদ আম : চুক্তিভিত্তিক চাষের মাধ্যমে উৎপাদিত নিরাপদ ও বালাইমুক্ত এ আম ঢাকার বাজারেও বিক্রি হবে বলে জানা গেছে। চেইনশপ আগোরার সব আউটলেটে বিষমুক্ত ও নিরাপদ এ আম শীঘ্রই পাওয়া যাবে; এগুলো প্রিমিয়াম আম হিসেবে ক্রেতাদের নিকট বিক্রি হবে। গত শনিবার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে রাজধানীতে অবস্থিত আগোরা’র সকল শাখার মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
এদিকে, চুক্তিভিত্তিক চাষ পদ্ধতিতে আম উৎপাদনে চাষিদের আগ্রহ বেড়ে গেছে। কেননা, বাজারমূল্যের চাইতে অনেক বেশি দাম পাচ্ছেন তারা।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্ববাজারে আম রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেশকিছু সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশের আম যখন পাকে তখন বিশ্ববাজারে অন্য কোনো দেশের আম আসে না। এ ছাড়া ইংল্যান্ডের ক্রেতারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আম গ্রহণ করেছেন। তারা বলেন, বাংলাদেশের আম বিশ্বের অন্যতম সুস্বাদু ফল। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করতে পারে, তাহলে বছরে ১ থেকে দেড় হাজার মে. টন আম রপ্তানি করাও সম্ভব।
সূত্র জানায়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের আম নিয়ে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। স্বাদ এবং পুষ্টিগুণের দিক দিয়ে বাংলাদেশের আম বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকলেও শুধু উদ্যোগের অভাবে এতদিন বাংলাদেশের আম বহির্বিশ্বে তেমন পরিচিতি পায়নি। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশে উৎপাদিত আমের চাহিদা প্রতি বছর বাড়ছে।
জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংগনিরোধ উইংয়ের পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ মহসীন দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, বাংলাদেশের আম রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা চলতি বছর ইইউ’র শর্তাবলী সম্পূর্ণরূপে প্রতিপালন করে চুক্তিভিত্তিক চাষের মাধ্যমে নিরাপদ আম উৎপাদন করেছি। এ বছর আম রপ্তানির চালান মাত্র শুরু হলো। আশা করছি, আমাদের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।
আম উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশের পুষ্টিচাহিদা পূরণের পাশাপাশি আম হতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য। এতে চাষিরা যেমন লাভবান হবেন; তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও আম রাখবে বড় ভূমিকা।

