
জাজিরার ডুবিসায়বর গ্রামে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে স্থাপিত কালোজিরা প্রদর্শনী ক্ষেতের পরিচর্যা করছেন কৃষক আবু জাফর কাজি
নিজস্ব প্রতিনিধি : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)’র সমন্বিত কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রমে শরিয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। প্রকল্পের নানাবিধ কর্মকাণ্ডের ফলে বসতবাড়িতে মিশ্র ফলবাগান সৃষ্টির মাধ্যমে পুষ্টি চাহিদা পূরণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে কৃষক দল গঠন, ফসল চাষে পরামর্শ প্রদান, শস্য বহুমুখীকরণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, পুষ্টিভিত্তিক ফসলের প্রদর্শনী, কৃষি ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন ধরণের সহায়তা প্রদান কৃষকদের মধ্যে নবজাগরণের সৃষ্টি করেছে বলে মতামত স্থানীয়দের।
উপজেলায় কার্যক্রম শুরুর পর প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আধুনিক ও সময়োপযোগী চিন্তাভাবনা এবং তদানুযায়ী বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে এলাকার মানুষ বিশেষ করে কৃষকের ধ্যান-ধারণা বদলাতে থাকে। প্রকল্পের বিভিন্ন পুষ্টিভিত্তিক কার্যক্রমে এলাকার মানুষ তাদের আঙিনায় মিশ্র ফল বাগান সৃষ্টির মাধ্যমে নিজস্ব পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে প্রকল্পের সহায়তা গ্রহণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফল বাগান সৃষ্টি ও এর তদারকিতে শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তকরণে উৎসাহিত করা, দেশীয় ও হাইব্রিড ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রশিক্ষণ প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে বদলে গেছে এখানকার কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম।
প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে পৌরসভাসহ ১২টি ইউনিয়নে মোট ১৩টি কৃষক গ্রুপ গঠিত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে নানাবিধ পুষ্টিভিত্তিক ফসলের প্রদর্শনী আয়োজনের পাশাপাশি বিদ্যালয় ও বসতবাড়িতে মিশ্র ফল বাগান ও শাকসবজির প্রদর্শনীও পালিত হচ্ছে। ফসল চাষ, যত্ন ও মাড়াইয়ের জন্য রয়েছে বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্র। শুধু তাই নয় ফসল যাতে রোগবালাইয়ের হাত থেকে রক্ষা পায় সেজন্য প্রকল্প থেকে গ্রুপের মাঝে সরবরাহ করা হয় ফুট পাম্প, হ্যান্ড স্প্রেয়ারের মতো আধুনিক যন্ত্র। প্রকল্প থেকে সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতির মধ্যে আরো আছে পাওয়ার টিলার, এলএলপি এবং পাওয়ার থ্রেসার। কৃষকরা জানান, এসব যন্ত্র প্রকল্প থেকে গ্রুপের মাঝে সরবরাহ করা হয় নামমাত্র জামানত এবং ভাড়ার বিনিময়ে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, এ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরুর আগে তাদের কৃষি ব্যবস্থাপনা এতো মসৃণ ছিল না। পৌরসভার আক্কেল মাহমুদ কান্দি কৃষক সমবায় সমিতির সদস্য আব্দুল মনসুর খাঁ বলেন, আমরা এই কৃষক গ্রুপ করার আগে অন্যের মেশিন দিয়ে জমি চাষ করতাম, মেশিনের অভাবে সঠিক সময়ে চাষ দেয়া যেত না। কিন্তু এখন গ্রুপের মেশিন দিয়ে সময়মতো দলভুক্ত কৃষকরা চাষ করতে পারছি। তিনি আরো বলেন, মেশিন ভাড়া নিয়ে আশপাশের কৃষকরা জমি চাষ করছে।
ফসল আবাদে সেচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; সময়মতো সেচ দিতে না পারলে ফসলের ফলন অনেকাংশে কমে যায়। এ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রুপের মাঝে একটি করে উন্নতমানের এলএলপি সরবরাহ করা হয়েছে। এখন এই উপজেলার কৃষকদের আগের মতো অন্যের সেচ যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল হতে হয় না। বড়কান্দি ইউনিয়নের কৃষক গ্রুপের আবু হোসেন বলেন, আমি প্রতিবছর ৪-৫ বিঘা জমিতে গমসহ নানারকম সবজির আবাদ করি। জমিতে পানি দেয়ার জন্য অনেক টাকা খরচ করার পরও সময়মতো পানি দিতে না পারায় ফলন অনেক কম হতো, এখন গ্রুপের মেম্বার হয়ে এই সুবিধাগুলো পাচ্ছি। তাই আমার ফলন আগের চেয়ে ১৫-২০ ভাগ বেড়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রকল্পের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হলো নানামুখী পুষ্টিভিত্তিক ফসলের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা। বসতবাড়িতে শাকসবজির প্রদর্শনী করে সফলতার বিষয়ে জয়নগরের কৃষক সালাম খাঁ বলেন, আমরা বাড়িতে শাকসবজি তেমন একটা করতাম না; কিন্তু আমাকে পুষ্টি প্রকল্পের একটি প্রদর্শনী দেয়ার পর থেকে এখন বাড়িতে প্রত্যেক মৌসুমে নানারকম সবজির বাগান করি, নিজে খাই এবং বাজারে বিক্রি করি। আমার বাগান দেখে আমাদের গ্রামের আরও ১০-১২ জন নিজেদের বাড়িতে শাকসবজির চাষ করছে।

জাজিরার উত্তর ডুবলদিয়া গ্রামে প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে স্থাপিত অজিত মাদবরের রসুনের ক্ষেত পরিদর্শন করছেন প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ মহাম্মদ মাইদুর রহমান, শরিয়তপুর জেলার উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. কবির হোসেনও এ সময় উপস্থিত ছিলেন
স্কুলপড়ুয়া শিশুদের দিনের একটি বড় অংশ কাটাতে হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সে সময় যদি তাদের খাদ্যাভ্যাসে একটু পুষ্টির ছোঁয়া দেয়া যায়, তাহলে মেধাসম্পন্ন জাতি বিনির্মাণ অনেকটাই সহজ হবে। পাশাপাশি কোমলমতি শিশুরা কিভাবে ফলের গাছ লাগাতে হয়, কিভাবে যত্নআত্তি করতে হয়, সবজি কেন চাষ করব, কিভাবে করব, কেনইবা এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ইত্যাদি বিষয়ে জানার সুযোগ পাচ্ছে। এজন্য প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মিশ্র ফল বাগান প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়, যা দেখে উপজেলার অনেক প্রতিষ্ঠান মিশ্র ফল বাগানে আগ্রহী হয়েছে যা ঐ প্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের দৈনিক পুষ্টি ঘাটতি পূরণে সহায়তা করছে। উপজেলার বিকেনগর ফোরকানিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসায় প্রায় ২শ’ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এখানে এই প্রকল্পের একটি মিশ্র ফল বাগানের প্রদর্শনী রয়েছে। বাগানে আছে আম, লিচু, পেয়ারা এবং সফেদার মতো সুস্বাদু মিষ্টি জাতীয় ফল গাছ। ফল মৌসুমে শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে বাগানটি অবদান রেখে চলেছে। মাদ্রাসার তত্ত্বাবধায়ক মাওলানা ইব্রাহিম খলিল বলেন, মাদ্রাসায় বাগানটির দেখভাল ছাত্রছাত্রীরা নিজেরাই করছে। গাছে ফল আসলে ছাত্রছাত্রীরা খেতে পারছে; ফলে তাদের পুষ্টি চাহিদা কিছুটা হলেও পূরণ হচ্ছে।
প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে আধুনিক উন্নত জাতের পাশাপাশি দেশীয় উন্নত জাতের অনেক প্রদর্শনী স্থাপিত হয়েছে। প্রদর্শনীর মধ্যে রয়েছে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষ, তরমুজ চাষ, বোরো ধান, কালোজিরার চাষ, মসুর, গোল আলু, মিষ্টি আলু, গম, ভুট্টার আবাদ। এ প্রসঙ্গে জয়নগরের ভুট্টা চাষি জব্বার আলী বলেন, আমাদের ইউনিয়নে আগে ভুট্টা চাষ হতো না। আমি পুষ্টি প্রকল্পের প্রদর্শনী পেয়েছিলাম। ঐ বছর অনেক ফলন হয় এবং লাভজনক হওয়ায় এখন আমি প্রত্যেক বছরই ২-৩ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করি।
সেনেরচর ইউনিয়নের চাষি আবেদ আলী কালোজিরা চাষ করে সফল হয়েছেন। তিনি বলেন, বিগত ২ বছর পুষ্টি প্রকল্পের প্রদর্শনীর কালোজিরা চাষ করছেন এবং লাভবান হচ্ছেন বেশ। সেই সাথে তার দেখাদেখি ২০-২৫ জন নতুন করে কালোজিরা চাষ করছেন।
জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (জাজিরা) কৃষিবিদ মো. হাবিবুর রহমান বলেন, সরকারের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প অত্র উপজেলায় চলমান; কিন্তু এই প্রকল্পটি পুষ্টি, শস্যবহুমুখিকরণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষক প্রশিক্ষণ, বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাকসবজি ও ফল বাগান স্থাপনে উপজেলার কৃষি ব্যবস্থায় ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছে। কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, খাদ্যভিত্তিক পুষ্টি বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং মেধাবী প্রজন্ম বিনির্মাণে প্রকল্পটি তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখছে বলে আমি মনে করি।

