
জাতীয় বীজ বোর্ডের ৯২তম সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন কৃষি সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহ্
নিজস্ব প্রতিবেদক : গতকাল ৫ এপ্রিল কৃষি সচিব ও জাতীয় বীজ বোর্ডের সভাপতি মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহ্’র সভাপতিত্বে জাতীয় বীজ বোর্ডের ৯২তম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় হাইব্রিড ধানের ১টি জাত নিবন্ধন, ইনব্রিড ধানের ৩টি জাত ছাড়করণ, দেশি পাটের ১টি, তোষা পাটের ১টি, মেস্তার ১টি ও ইক্ষুর ১টি জাত ছাড়করণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ব্রি হাইব্রিড ধানের জাতটি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত আমন মৌসুমে চাষাবাদের উপযোগী। জাতটির গড় জীবনকাল ১১৫-১২০ দিন। প্রস্তাবিত জাতটির চেক জাত বিনা ধান৭ এর চেয়ে ২০ শতাংশ ফলন বেশি। জাতটির ফলন ৬ টন/হেক্টর। চাল চিকন ও লম্বা আকৃতির। জাতটি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোর অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য কারিগরি কমিটি জাতীয় বীজ বোর্ডে ব্রি হাইব্রিড ধান৬ হিসেবে নিবন্ধনের সুপারিশ করেছে।
ব্রি ধান৭৯ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত আমন মৌসুমে চাষাবাদের উপযোগী। জাতটির গড় জীবনকাল ১৩৫ দিন। উচ্চতা ১১২ সে. মি.। চাল লম্বা মাঝারি চিকন ও ভাত ঝরঝরে সাদা। রোগ-বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রচলিত জাতের চেয়ে কম। ফলন ৫.৫-৭.০ মে. টন। ১৮-২১ দিনের আকস্মিক বন্যা ও বন্যা পরবর্তী ১৫-২০ দিনের মাঝারি জলাবদ্ধতা (৫০-৬০ সে. মি.) থাকলেও এ জাতটি ৪-৪.৫ টন/হেক্টর ফলন দিতে সক্ষম।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত ব্রি ধান৮০ আমন মৌসুমে চাষাবাদ উপযোগী। জাতটির গড় জীবনকাল ১৩০-১৩৫ দিন। উচ্চতা ১২০ সে.মি। চাল মাঝারি লম্বা ও মোটা এবং সুগন্ধিযুক্ত। ফলন ৪.৫-৫ টন/হেক্টর। এ জাতের চালে সুগন্ধি থাকায় এটি রপ্তানির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বিনা ধান১৯ আউশ মৌসুমের জন্য চাষাবাদের উপযোগী। জীবনকাল ৯০-১০৫ দিন। জাতটির গড় ফলন ৩.৮৪ টন/হেক্টর। সর্বোচ্চ ফলন ৫.০০ টন/হেক্টর। খরা সহিষ্ণু এ জাতটি খরা প্রবণ, বরেন্দ্র এলাকা ও পাহাড়ী এলাকায় চাষাবাদ করার উপযোগী।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বিজেআরআই তোষা পাট-৭ জাতের বীজের রং নীলাভ সবুজ। আঁশ উৎপাদনের জন্য জাতটির গড় জীবনকাল ১২০ দিন। গড় পপুলেশন ৩.৩ লাখ/হেক্টর। গাছের উচ্চতা ৩.৫৮ মিটার। বেসাল ডায়মিটার ১৮.২৫ মিমি:। এ জাতটির গাছ লম্বা, গাঢ় মসৃণ ও দ্রুত বর্ধনশীল; যা O-৯৮৯৭ জাতের চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বিজেআরআই দেশি পাট-৯ জাতটি নাবীতে বপনযোগ্য। এর আঁশ ধবধবে, বীজ নীলাভ। আঁশ উৎপাদনের জন্য জাতটির গড় জীবনকাল ১২০ দিন। গড় পপুলেশন ৩.৩ লাখ/হেক্টর। গাছের উচ্চতা ৩.৪০ মিটার। বেসাল ডায়মিটার ২১.৪১ মি.মি.। জাতটি হলুদ মাকড় আক্রমণ সহিষ্ণু। তিন-চার ফসলি শস্যক্রমে উপযোগী। পাতার বোটার উপরিভাগ হালকা লাল। প্রচলিত জাতের তুলনায় এটি স্বল্পমেয়াদী জাত, কাণ্ড সবুজ, পাতার বোঁটার উপরিভাগ হালকা লাল রং, পাতা বল্লমাকৃতি এবং হলুদ মাকড়ের আক্রমণ সহিষ্ণু।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বিজেআরআই মেস্তা-৩ জাতটি আঁশ উৎপাদনকারী উন্নত জাত। আঁশ উৎপাদনের জন্য জাতটির গড় জীবনকাল ১২০ দিন। গড় উচ্চতা ৭.৩২ ফুট। উঁচু, মাঝারি উঁচু, খরাপীড়িত পতিত/শুষ্ক চরাঞ্চলে বপন উপযোগী। শিকড়ে গিট রোগ হয় না; জাতটি মসৃণ ও দ্রুত বর্ধনশীল। এটি খরা সহনশীল ও নেমাটেড প্রতিরোধী। কাণ্ড, পত্র, উপপত্র গাঢ় সবুজ যা এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত মেস্তা জাতসমূহ হতে সম্পূর্ণ আলাদা।
বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বিএসআরআই ৪৬ জাতটির কাণ্ড লম্বা, সোজা মধ্যম আকারের হলুদাভ সবুজ। এর জীবনকাল ৩৩০-৩৪৬ দিন। পর্ব মধ্য আকৃতির, কাণ্ড মাঝারি শক্ত ও নিরেট। গড় ফলন ১১৫.৬ টন/হেক্টর। গিড়া ফোলা, চোখ বড় ও ডিম্বাকৃতির। পরিপক্ক চোখের উপরিঅংশ গ্রোথরিং স্পর্শ করে থাকে। এ জাতের ইক্ষুতে ফুল দেখা যায়। এ জাতের ইক্ষুতে চিনি ধারণ ক্ষমতা জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। জাতটি বন্যা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু। ঈশ্বরদী-৩৯ এর মত লাল পঁচা ও স্মার্ট রোগ প্রতিরোধী।
উল্লেখ্য, জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের আওতাধীন বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত নোটিফাইড ফসলের জাত ছাড়করণ ও অনুমোদনের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম হচ্ছে জাতীয় বীজ বোর্ড। ফোরামটি ১৯৭৭ সালের বীজ অধ্যাদেশের ৩ ধারা মোতাবেক গঠিত। নোটিফাইড ফসলের ছাড়করণের জন্য প্রস্তাবিত জাতগুলো বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির মাধ্যমে জাতীয় বীজ বোর্ডের কারিগরি কমিটিতে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রেরণ করা হয়। কারিগরি কমিটি গবেষণালব্ধ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বীজ বোর্ডে প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জাতগুলো অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করে। জাতীয় বীজ বোর্ড বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে জাত ছাড়করণ ও নিবন্ধনের জন্য অনুমোদন প্রদান করে। দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত জাতগুলোকে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ছাড়করণের পূর্বে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে অন ফার্ম ও অন স্টেশন দুই বছর পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জাতগুলোর Distinctness, Uniformity Ges Stability (DUS)পরীক্ষা করা হয়। এছাড়াও জাতগুলোর চাষাবাদ এবং ব্যবহারের উপযোগিতা পরীক্ষা করা হয়। পরবর্তীকালে দেশের আবহাওয়া, মাটি ও জলবায়ুতে চাষ উপযোগী জাতগুলোর জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ছাড়করণের অনুমোদন দেয়া হয়।

