হাসান রেজা : কৃষি যন্ত্রপাতির অনুকূলে এখন থেকে ৫০ শতাংশ উন্নয়ন সহায়তা বা ভর্তুতি পাবেন কৃষকরা। অন্যদিকে হাওড় আওতাধীন ইউনিয়ন ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় ভর্তুকির হার আরো বেশি; এ অঞ্চলের কৃষকরা কৃষি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি পাবেন। আগে ভর্তুকির হার ছিল ৩০ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফসলের বপন/রোপন ও কর্তন মৌসুমে দেশজুড়ে শ্রমিক সংকট যখন চরমে সেই পরিস্থিতিতে সরকারের এ উদ্যোগের ফলে কৃষকরা অত্যন্ত উপকৃত হবেন যা দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি ব্যবসাবন্ধব লাভজনক কৃষি ব্যবস্থাপনাকে অনেক দূর এগিয়ে নেবে।
জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প (২য় পর্যায়)’র ২য় সংশোধন গত ১০ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। এর ফলে কৃষি যন্ত্রে উচ্চহারে ভর্তুকি ছাড়াও প্রকল্পের আওতায় পাওয়ার টিলার যন্ত্রের বরাদ্দকৃত অর্থ রিপার যন্ত্রের অনুকূলে স্থানান্তর, কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়ায় সেবা প্রদান কার্যক্রমের সূচনা করাসহ প্রকল্পের মেয়াদ ১ বছর বৃদ্ধি পেলো। সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পের কার্যক্রম ২০১৯ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করে এর ব্যয় ৩৩৯ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ শেখ মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ২য় সংশোধিত ডিপিপি অনুয়ায়ী, প্রকল্পের আওতায় প্রদানকৃত ভর্তুকির হার ৩০ শতাংশ থেকে উন্নীত করে হাওড়ের আওতাধীন ইউনিয়ন ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় ৭০ শতাংশ এবং দেশের অবশিষ্ট সকল এলাকার জন্য ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। কৃষকরা এখন থেকে ভর্তুকির আওতাধীন যন্ত্র রিপার (ধান ও গম), পাওয়ার থ্রেসার, কম্বাইন হারভেস্টর, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, সিডার ও ফুট পাম্পের ক্ষেত্রে বর্ধিত হারে ভর্তুকি পাবেন। ইতোমধ্যে সারাদেশের উপজেলা কৃষি অফিসগুলোকে কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নতুন নির্ধারিত হার অবহিতকরণসহ বর্তমান বোরো ফসলের কর্তন মৌসুমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে রিপার ও কম্বাইন হারভেস্টর যন্ত্রের সরবরাহ বৃদ্ধির নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন অনেকাংশে কৃষি উৎপাদনশীলতার উপর নির্ভরশীল। বেশ কিছু ক্ষেত্রে কৃষিখাত যথেষ্ট সমৃদ্ধ হলেও বাড়ছে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা। ক্রমবর্ধমান হারে কৃষি শ্রমিকের শহরমুখিতা, শ্রমিকের উচ্চমূল্য এবং সমাজে কৃষি কাজের নিম্ন মর্যাদার কারণে বাংলাদেশের কৃষিখাত এখন তীব্র শ্রমিক সংকটের মুখোমুখি। বিশেষ করে, রোপন ও কর্তনের ভরা মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের অভাবে কৃষকরা একরকম অসহায় হয়ে পড়েন এবং উৎপাদন ব্যয়ও উচ্চহারে বেড়ে যায়। আবার উৎপাদিত ফসলের বিভিন্ন স্তরে অপচয় ও অদক্ষতার ফলে কৃষিকাজে লাভবান হতে পারছে না কৃষকরা। এমতাবস্থায় কর্তন ও রোপন কাজে দ্রুত যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। যান্ত্রিকীকরণের এরূপ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রকল্পের আওতায় ভর্তুকি প্রদানের হার ৩০ শতাংশ যথেষ্ট ছিল না। বিশেষ করে যখন দেশের অধিকাংশ কৃষকই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র এবং যাদের রয়েছে বিনিয়োগ সক্ষমতার অভাব। এ প্রেক্ষিতে মাঠে জরুরি ভিত্তিতে কর্তন ও রোপন যন্ত্র সহজলভ্য করার প্রয়োজনে ভর্তুকির হার বৃদ্ধি অত্যাবশ্যক ছিল। পরবর্তীতে ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোটায় আনয়নের মাধ্যমে এ যাত্রাপথে একটি ভাল সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, প্রকল্পে আওতায় পাওয়ার টিলার যন্ত্রের বাদ্দকৃত অর্থ রিপার যন্ত্রে অনুকূলে স্থানান্তর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কর্ষণ কাজে যান্ত্রিকীকরণের হার ৯০ শতাংশের উপরে এবং প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার যন্ত্র মাঠ পর্যায়ে যুক্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিশেষ এ কাজে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে এবং সেবা প্রদানের বাজারও তৈরি হয়েছে। সুতরাং এখন পাওয়ার টিলারের অনুকূলে ভর্তুকি মাঠ পর্যায়ে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে না। পক্ষান্তরে শস্য কর্তন ও আহরণে যান্ত্রিকীকরণের হার বর্তমানে ১ শতাংশের নিচে বিধায় রিপার ও হারভেস্টর যন্ত্রের উপর জোর দেয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় পাওয়ার টিলার যন্ত্রের বরাদ্দকৃত অর্থ রিপার যন্ত্রের অনুকূলে স্থানান্তর করা হয়েছে।
প্রকল্পের ২য় সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী, কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়ায় সেবা প্রদান কার্যক্রমও পরিচালিত হবে। প্রকল্প সূত্র জানায়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্রমান্বয়ে শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় সনাতন পদ্ধতির কৃষি কাজে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, আধুনিক যান্ত্রিক ও বাণিজ্যিক কৃষি ব্যবস্থা যুবকদের মাঝে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে। এরূপ প্রেক্ষাপটে গ্রামের শিক্ষিত যুবকদের কৃষি কাজে আগ্রহ সৃষ্টি এবং এদের মাধ্যমে কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়ায় সেবা প্রদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে। গ্রামীণ যুবকদের এ পেশায় নিয়োজিত করার লক্ষ্যে যন্ত্র ভাড়া প্রদানের নতুন ধরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সরকারের কৃষি নীতি অত্যন্ত প্রসংশিত; কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বিভিন্ন সময়ে কৃষি ও কৃষক বান্ধব নানা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাহ্বা পেয়েছেন। কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট নিরসন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণসহ কৃষিকে লাভজনক করতে যন্ত্রপাতিতে নতুন এ ভর্তুকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

