ঢাকাTuesday , 27 December 2016
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

উন্নত প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্রুড ব্যাংক প্রকল্পের নানামুখী কার্যক্রম

Link Copied!

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার কারবালায় মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে স্থাপিত মাছ চাষে আধুনিক প্রযুক্তির এরেটর মেশিন যার মাধ্যমে পানিতে সঠিক মাত্রার অক্সিজেন মিশ্রিত হচ্ছে

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার কারবালায় মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে স্থাপিত মাছ চাষে আধুনিক প্রযুক্তির এরেটর মেশিন যার মাধ্যমে পানিতে সঠিক মাত্রার অক্সিজেন মিশ্রিত হচ্ছে

হাসান রেজা : উন্নত প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব রক্ষা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার ও বেসরকারি হ্যাচারি মালিকদের কাছে গুণগত মানসম্পন্ন ব্রুড মাছ সরবরাহে নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে মৎস্য অধিদপ্তরের ব্রুড ব্যাংক স্থাপন (৩য় পর্যায়) প্রকল্প। প্রকল্পের কার্যক্রমের ফলে মাছের অন্তঃপ্রজনন ও সংকরায়ণের সমস্যা নিরসন করে গুণগত মানসম্পন্ন ব্রুড মাছ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, কার্প জাতীয় প্রজননক্ষম মাছ এবং দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছের কৌলিতাত্ত্বিক গুণাগুণের উন্নয়ন ঘটবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের ২৩ জেলার ২৭টি সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে এ প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভৌগোলিক কারণে মাছ চাষের জন্য অধিক উপযোগী যে এলাকাসমূহে মাছের রেণু ও পোনার অতিরিক্ত চাহিদা রয়েছে, কার্প জাতীয় ব্রুড মাছের উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধাসম্পন্ন এবং প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত খামার ব্যতীত ২৭টি সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার প্রকল্প এলাকা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সারাদেশে পোনা বাজারজাতকরণের জন্য সুবিধাজনক স্থানের ওপর ভিত্তি করে প্রকল্প এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে বলেও জানান তারা।
সূত্র জানায়, বিগত দুই দশকে রেনু ও পোনা উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও বেসরকারি হ্যাচারি মালিকদের কারিগরি জ্ঞান ও সচেতনতার অভাব এবং সঠিক প্রযুক্তি অনুসরণ না করায় অন্তঃপ্রজনন সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনার গুণগতমান ঠিক থাকছে না। ফলে মাছের উৎপাদন আশানুরূপ মাত্রায় বৃদ্ধি না পাওয়ায় মৎস্য চাষের সাথে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ব্রুড ব্যাংক স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পটির প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে যথাক্রমে ২০০০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এবং ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল মেয়াদে বাস্তবায়ন করে। এ দু’টি পর্যায়ে প্রকল্পের মাধ্যমে ৩২টি খামার/হ্যাচারিকে ব্রুড ব্যাংকে রূপান্তর, সরকারি-বেসরকারি হ্যাচারিতে কৌলিতাত্ত্বিক গুণাগুণসম্পন্ন ব্রুড মাছ সরবরাহ, প্রতি বছর প্রায় ২০ মেট্রিক টন গুণগত মাছের রেণু উৎপাদন, উন্নতমানের ব্রুড ব্যবস্থাপনা ও গুণগত মানের মৎস্য বীজ উৎপাদন প্রযুক্তি বিষয়ে মৎস্য চাষি ও বেসরকারি হ্যাচারি মালিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ঐ দু’টি পর্যায়ের সাফল্যের ভিত্তিতে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং গুনগতমান সম্পন্ন রেনু, পোনা, ব্রুড ও দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমানে প্রকল্পটির তৃতীয় পর্যায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। সেপ্টেম্বর-২০১৪ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের কার্যক্রম আগামী ডিসেম্বর-২০১৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে প্রকল্প অফিস।

মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের ভৌত অবকাঠামোগত কার্যক্রম পরিদর্শন করছেন প্রকল্প পরিচালক মো. সিরাজুর রহমান

মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের ভৌত অবকাঠামোগত কার্যক্রম পরিদর্শন করছেন প্রকল্প পরিচালক মো. সিরাজুর রহমান

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হ্যাচারি মালিক ও সাধারণ মৎস্য চাষীদের মাঝে প্রাকৃতিক উৎস থেকে (হালদা, যমুনা, পদ্মা নদী) রেণু সংগ্রহ করে সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে লালন পালনের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন ব্রুড মাছ সরবরাহ এবং দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছে ব্রুড উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে প্রকল্পটি। এছাড়া, প্রকল্প এলাকায় সিলভার কার্প, বিগহেড কার্প, গ্রাস কার্পের মূলজাত চীন থেকে আমদানি করে সরকারি খামারে লালন পালন করে বেসরকারি পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়াও সম্ভব হবে। মৎস্য চাষ ব্যবস্থাপনার আধুনিক কলাকৌশল প্রদর্শন ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে প্রকল্পভুক্ত এলাকার মৎস্যচাষি, হ্যাচারি ও নার্সারি মালিকগণের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে প্রকল্পটি।
জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ৫ হাজার ৫শ’ জন বেসরকারি হ্যাচারি মালিক/অপারেটর, নার্সারার, মৎস্য চাষি, মৎস্যজীবীসহ মৎস্য চাষে সম্পৃক্ত এনজিওকর্মীদের ব্রুড মাছ উৎপাদন, প্রজনন পদ্ধতি ও চাষ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ৫ দিনের প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত আছে যার মধ্যে ৪ হাজার ২শ’ ৭৫ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া, প্রশিক্ষণার্থীদের ডাটাবেইজ প্রণয়নের কার্যক্রম চলমান বলে জানিয়েছে প্রকল্প অফিস। প্রকল্পের মাধ্যমে হালদা, পদ্মা ও যমুনা নদী হতে প্রাকৃতিক উৎসের কার্প জাতীয় মাছ ও দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছের রেণু সংগ্রহ করে প্রকল্পের আওতাধীন মৎস্যবীজ উৎপাদন খামারসমূহে পোনা প্রতিপালন করা হচ্ছে। পোনার গুণগত মান, পরিমাণ, বৃদ্ধির হার, বেঁচে থাকার হার ইত্যাদি সন্তোষজনক বলেও জানা গেছে। এই পোনা থেকে ব্রুড তৈরি করে বেসরকারি খামারি পর্যায়ে সূলভ মূল্যে বিক্রি করা হবে এবং সরকারি খামারগুলোতে তৈরিকৃত ব্রুড থেকে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্নতমানের পোনা উৎপাদন করে চাষী পর্যায়ে বিপণন করা হবে। এছাড়া, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য সংশ্লিষ্ট আইন যেমন-হ্যাচারি আইন, মৎস্য ও পশু খাদ্য আইন ইত্যাদি বাস্তবায়নে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে কেন্দ্রীয় কর্মশালা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ৪টি উৎপাদন পরিকল্পনা পর্যালোচনা বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এবং বেসরকারি হ্যাচারি মালিক ও অপারেটর, নার্সারার, মৎস্য চাষি, মৎস্যজীবী, মৎস্য চাষে সম্পৃক্ত এনজিওকর্মীদের হাতে-কলমে ব্রুড মাছ ব্যবস্থাপনার বাস্তবধর্মী জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে ৪টি অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর পরিচালনা করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রকল্প অফিস। প্রকল্পের আওতাধীন ২৭টি মৎস্যবীজ উৎপাদন খামারে সীমানা প্রাচীর ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও মেরামত; গ্যারেজ, গার্ড শেড ও স্টোর রুম নির্মাণ; পুকুর খনন ও পুনঃখনন; পুকুর পাড়ে রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ; প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ ও মেরামত; পানি সরবরাহ অবকাঠামো নির্মাণ; হ্যাচারি ইউনিট নির্মাণসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে প্রকল্প অফিস। চীন থেকে মূল জাতের সিলভার কার্প, বিগহেড কার্প, গ্রাস কার্পের পোনা আমদানির কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে বলেও জানা গেছে।

টাঙ্গাইল সদরের মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার পরিদর্শন করছেন সহকারী প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল হাসান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান এবং খামার ব্যবস্থাপক মোখলেসুর রহমান

টাঙ্গাইল সদরের মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার পরিদর্শন করছেন সহকারী প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল হাসান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান এবং খামার ব্যবস্থাপক মোখলেসুর রহমান

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ব্রুড ব্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে উন্নতমানের ব্রুড উৎপাদন কার্যক্রম একটি পুরোপুরি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রচেষ্টা এবং এ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। সরকারি এ উদ্যোগের সাথে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ জনবল জড়িত বিধায় এর মাধ্যমে প্রাপ্ত রেণু বা পোনার গুণগতমান সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত হয়। তারা জানান, ইতোপূর্বে বেসরকারি পর্যায়ে মাছ চাষে যে গুণগত অবক্ষয় বিদ্যমান ছিল ব্রুড ব্যাংক স্থাপনের ফলে তা অনেকাংশে দূর করা সম্ভব হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ব্রুড ব্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে উন্নত গুণসম্পন্ন কার্প জাতীয় মাছের ৬,৭১৮ কেজি রেণু, প্রায় ৫৮.০ লাখ পোনা ও ১২২.০ মেট্রিক টন ব্রুড সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারি মালিকদের সরবরাহ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. সিরাজুর রহমান দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে মাছের কৌলিতাত্ত্বিক গুনাগুণ উন্নয়ন এবং জলজ জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় প্রজাতির মৎস্য সংরক্ষণ অন্যতম প্রধান নিয়ামক। প্রকল্পের মাধ্যমে ২৭টি সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে কৌলিতাত্ত্বিক গুণাগুণ সম্পন্ন কার্প জাতীয় মাছ ও দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছের ব্রুড ও পোনা মাছ উৎপাদন এবং তা দেশের অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি মৎস্য হ্যাচারি ও খামারে সরবরাহের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই বর্ধিত মৎস্য উৎপাদন সরকারের রূপকল্প ২০২১ সফল করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়। এছাড়া দেশের শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।