বিশেষ প্রতিবেদন : নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ‘জয়ের জন্য মরিয়া’ বিএনপি আত্মবিশ্বাসে টইটুম্বুর হলেও দলটির ‘ভয়’ হয়ে দেখা দিচ্ছে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অতীত রেকর্ড।
নারায়ণগঞ্জকে ‘সন্ত্রাসকবলিত এলাকা’ হিসেবে অভিহিত করে নির্বাচনে প্রভাববিস্তারের শঙ্কার কথা জানিয়ে আগেই সেনা মোতায়েনের দাবি তুলেছিলো বিএনপি। দলটির সেই অবস্থান এখনো একই আছে। তবে নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি শনিবার ইসি চুড়ান্তভাবে নাকচ করে দেওয়ায় দলটির ভীতি আর শঙ্কায়-দুটোই বেড়েছে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, নাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে আর কয়েকদিন বাকী। নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা থাকলেও তারা একধরণের ভীতি ও আশঙ্কার দোলাচালে দুলছে। দিন যত ঘনিয়ে আসছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী, ক্যাডারদের দৌরাত্মের মাত্রা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ভোটারদের ভীতিহীনভাবে ভোট প্রদান ও তাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন কত জরুরি সেটা নারায়ণগঞ্জের এক রিটার্নিং কর্মকর্তার কথাতেই পরিস্কারভাবে ফুটে উঠেছে। রিটার্নিং কর্তকর্তা বলেছেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভূক্ত সবগুলি কেন্দ্রই ঝুঁঁকিপূর্ণ।’
তবে সেখানে নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে ভালো রয়েছে জানিয়ে ভোটে সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা চূড়ান্তভাবে নাকচ করে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে শনিবার দুপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান তিনি।
সিইসি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে সুন্দর রয়েছে। আগামীতে তা আরও উন্নত হবে। এখন পর্যন্ত সেনা মোতায়েনের মতো কোনো পরিস্থিতি নেই।’
এ সময় ভোটকেন্দ্র দখল ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকা অস্ত্রের যথাযথ প্রয়োগের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু লোক কেন্দ্র দখল করল আমার লোক অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আর্মসের প্রোপার ইউজ করতে হবে। কেউ যেন জোরপূর্বক কেন্দ্রে ঢুকতে না পারে, কেন্দ্র দখল করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি, রিটার্নিং কর্মকর্তা, জেলা ও স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘নারায়ণঞ্জে সন্ত্রাসী-মাস্তান ও বহিরাগত, যারা নির্বাচনে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছি।এখন তা চলমান রয়েছে। আগামীতে এ অভিযান আরও দৃশ্যমান করতে বলেছি।’
তিনি বলেন, ‘আগের রাতে যাতে কোনো ধরনের জোরাজুরি না হয়, কেন্দ্র দখল করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছি। ভোটের দিনও যাতে কেউ কেন্দ্র দখল করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সেনা মোতায়েন করা না-করা নির্বাচন কমিশনের ব্যাপার। প্রয়োজন মনে করলে ইসি নারায়ণগঞ্জে কেবল সেনাবাহিনী মোতায়েন কেন, যেটা প্রয়োজন মনে করে, সেটাই করবে।’
তবে শনিবার নারায়ণগঞ্জে দলীয় মেয়র প্রার্থীর সাখাওয়াত হোসেন খানের পক্ষে প্রচার চালাতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনে ফের সেনা মোতায়েন দাবি তোলেন। যদিও শুরু থেকেই সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি।
স্থানীয় জনগণের হাতে লিফলেট তুলে দিয়ে ধানের শীষের জন্য ভোট চেয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেশের মানুষ আজ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত। নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন যদি সুষ্ঠু হয়, তার উপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, তার ওপর নির্ভর করবে আরেকটি নির্বাচনের ভবিষ্যৎ।’
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, নাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী ও ক্যাডারেরা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লোকজন এবং ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। নাসিক নির্বাচন কার্যক্রম সিসি টিভির আওতায় আনার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো নজির লক্ষ্য করা যায়নি।
বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘পরিবেশ পরিস্থিতিতে নির্বাচনী মাঠের সমতা আনার জন্য অবিলম্বে নারায়ণগঞ্জ স্থানীয় প্রশাসনে নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের বদলি এবং নির্বাচনকে ভয়ভীতিমুক্ত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের কোনো বিকল্প নেই।’
নির্বাচনে আগে নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ বলেও অভিযোগ করেন বিএনপির এই নেতা।
দলটির দায়িত্বশীলরা মনে করছেন, সেনা মোতায়েনের দাবি নির্বাচন কমিশন অগ্রাহ্য করায় কার্যত লাভবান হয়েছে বিএনপিই। কারণ কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে এ জন্য ইসিই দায়ী থাকবে। এতে যে কোনো নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের যে দাবি বিএনপি জানিয়ে আসছে, তা আরো জোরালো হবে। এই পরিস্থিতিতে ভয়, শঙ্কা আর প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা নিয়েই তুমুল প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি।
নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছে দলটি। শনিবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়ে বড় একটি দল নারায়ণগঞ্জে গণসংযোগ করেছেন।
নাসিক নির্বাচনে যে কোনো মূল্যে জয়ের কথা ভাবছেন দলটির নেতারা। নির্বাচনে তারা শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে চান। এ লক্ষ্যে দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় মনিটরিং টিমগুলো কাজ করছে। প্রচারের শেষ সময় পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতিদিন যাওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছে দলের হাইকমান্ড। নাসিক নির্বাচনকে বিএনপি এতোটা গুরুত্ব দিয়েছে যে, এই মুহূর্তে দলের জেলা কমিটিগুলো পুনর্গঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমও কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে যুবদল ও ঢাকা মহানগরে নতুন কমিটি দেওয়ার কার্যক্রম। সার্বিক কার্যক্রম মনিটরিং করছেন স্বয়ং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
আগামী ২২ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠেয় এ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ৭ দলের প্রার্থী রয়েছেন। নির্দলীয় কাউন্সিলর পদে ১৫৬ জন সংরক্ষিত পদে ৩৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

