বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার দিন দিন উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। সীমান্তপথে ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল ও বিভিন্ন ধরনের সিনথেটিক মাদকের প্রবেশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তরুণ সমাজ, শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষের একটি অংশ আসক্তির ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার, সমাজ এবং দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (UNODC) এবং বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়াবার পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’-এর বিস্তারও বেড়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকাকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র দেশে এসব মাদক প্রবেশ করাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে মাদক পাচারের অন্যতম প্রধান রুট মিয়ানমার সীমান্ত। ইয়াবার বড় চালান বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জব্দ হলেও নতুন নতুন কৌশলে পাচার অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে কয়েক কোটি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়, যা সমস্যাটির ব্যাপকতাই তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, খারাপ সঙ্গ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব এবং সহজলভ্যতা—এসব কারণে তরুণদের একটি অংশ মাদকের দিকে ঝুঁকছে। একবার আসক্ত হয়ে গেলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পায় চুরি, ছিনতাই, হত্যা, পারিবারিক সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ড নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার ও পাচারকারীদের গ্রেপ্তার করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়; সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবারভিত্তিক নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম এবং আসক্তদের পুনর্বাসনের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে। তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করলে মাদকাসক্তির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধই পারে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

