বিশেষ প্রতিবেদন : বেশ কয়েকটি সমীকরণকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে অংশগ্রহণকে ‘কৌশলী’ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি সরকারের পরীক্ষা নিতে চায়।
দলীয় সরকার এবং ‘অনুগত’ নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে না, এই নির্বাচনের মাধ্যমে সে বিষয়টিকে ‘আরো এক দফা’ প্রমাণ করতে চায় দলটি।
এতে নিরপেক্ষ ও সাহসী নির্বাচন কমিশন-ইসি পুনর্গঠন এবং শক্তিশালীকরণে বিএনপি যে প্রস্তাবনাগুলো রেখেছে, তার পক্ষে জনমত আরো জোরালো হবে বলে মনে করছে দলটির নীতিনির্ধারকরা।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সরকারের আচরণের পরীক্ষা নিতে চায় জানিয়ে দলটির নেতা ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, এটিকে বিএনপি ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে চাই, সরকারের চরিত্র ও মন-মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে কিনা। আর তা না হলে বুঝব, তাদের কাছে গণতন্ত্র আর নিরাপদ নয়। পরবর্তীতে আমরা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হব।’
আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ। সে অনুযায়ী নাসিক নির্বাচনই হচ্ছে এই কমিশনের অধীনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে হওয়া শেষ নির্বাচন।
এ পরিস্থিতিতে গত ১৮ নভেম্বর শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন ও শক্তিশালীকরণের প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির প্রস্তাবনা ও সুপারিশ তুলে ধরেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
তবে প্রস্তাবনাকে ‘অন্তঃসারশূন্য’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে বক্তব্য দিয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমেই নতুন ইসি গঠন হবে।
তবে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে শক্তিশালী ইসি গঠনে বিএনপির প্রস্তাবনা যে কতটা যুক্তিযুক্ত এবং সময়োপযোগী তা প্রমাণ করতে চায় বিএনপি। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে তা আবারো স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা।
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি স্থানীয় পর্যায়ের প্রায় সব নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সর্বশেষ ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিলেও ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচনে মাঝপথে সরে দাঁড়ায় দলটি। যদিও এর আগে ঢাকার বাইরে গাজীপুর থেকে শুরু করে সবকটি নির্বাচনে জয়ী হয় বিএনপি।
তবে বেশ কয়েকটি সমীকরণকে সামনে রেখে বিএনপি নাসিক নির্বাচনে অংশ নিয়েছে জানিয়ে দলটির নেতারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার যদি প্রভাব বিস্তার না করে তবে লাভ হবে বিএনপির। আবার যদি জোর করে ফল ছিনিয়ে নেয়, তাহলেও লাভ হবে বিএনপিরই। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির প্রার্থী ব্যাপক ভোটে জয়ী হবে বলে মনে করছেন তারা।
অন্যদিকে নির্বাচনে কারচুপি হলে মাঝপথে সরে দাঁড়িয়ে বিএনপি এই বার্তা দিতে পারবে যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন শেষ মুহূর্তের নির্বাচনটিও অবাধ করতে পারেনি। এর মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ ইসি গঠনের যে প্রয়োজনীয়তার কথা বিএনপি বলছে, তা আরো বেশি জোরালো হবে।
নাসিক নির্বাচনে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে বিএনপির দু’জন ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না। এরপরও সরকার সেসব নির্বাচন কীভাবে প্রহসনের নির্বাচনে পরিণত করেছে, তা সবাই দেখেছে। এই নির্বাচনে সরকার প্রভাববিস্তার করবে জেনেও বিএনপির অংশ নেওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এই নির্বাচনে যাই হোক তা বিএনপির পক্ষেই যাবে। মূলত বিএনপি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জাতির সামনে তুলে ধরতে চায়। কারণ একটি সরকার ক্ষমতায় থাকলে সেই দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রভাববিস্তারের ঘটনা ঘটবেই।
নাসিক নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির কৌশল উল্লেখ করে খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘বিএনপি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক দল। আমরা আগেও ভোটারবিহীন এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। সবাই দেখেছে, নির্বাচন নিয়ে কতটা প্রহসন হয়েছে।’
বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন ‘কতটা প্রহসনমূলক হতে পারে’ সেটি সবার সামনে উন্মোচন করতেই নাসিক নির্বাচনে বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বলেও জানান দলের স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।
এদিকে বর্তমান ইসি ও প্রশাসনের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব কিনা, সে প্রশ্ন তুলে নাসিক নির্বাচনকে ‘চ্যালেঞ্জ হিসেবে’ নেওয়ার কথা বলেছেন মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমি জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য লড়াই করে যাব। আমি ভেঙে যাব কিন্তু মচকাব না। এই নির্বাচনকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।’
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের স্বার্থে নির্বাচনী এলাকায় সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। এতে ভোটাররা ভয়-ডরহীনভাবে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে বলেও মনে করছে দলটি।
দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বিএনপি চায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হোক।
‘নারায়ণগঞ্জ যেহেতু গডফাদারদের শহর হিসেবে পরিচিত তাই সেখানে সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করলে সাধারণ ভোটাররা ন্যূনতম নির্বাচনী পরিবেশ পাবে। তাতে ভোটাররা তাদের পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দেবে। ভয়ে, আতঙ্কে কোনো গডফাদারকে ভোট দিতে হবে না’, বলেন তিনি।

