বিশেষ প্রতিবেদন : রাজধানীর বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া কোটা’ নির্ধারণ করা আছে। তবে ক্যাচমেন্ট বিভাজনের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরন করা হয় তাতে জটিলতার অভিযোগ করছেন অভিভাবকরা। বিষয়টি নিয়ে উৎকণ্ঠাও প্রকাশ করছেন তারা।
অভিভাবকদের অভিযোগ, কাছাকাছি দূরত্বে স্কুল থাকায় ক্যাচমেন্ট এলাকা নির্ণয়ে অনিয়ম হয়। থানা বা কলোনি এলাকা ভিত্তিক ক্যাচমেন্ট এলাকা নির্ণয় করা হয় বলে অনেক ক্ষেত্রেই ভাল স্কুলগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা যায়। যেমন: শান্তি নগরের বাসিন্দারা আইডিয়াল স্কুলেও ভর্তি হতে পারে না, আবার ভিকারুননিসাতেও ভর্তি হতে পারে না।
আবার, সরকারি-বেসরকারি স্কুলগুলোর জন্য ভর্তি কার্যক্রম নিয়ে নীতিমালা থাকলেও সঠিকভাবে মানা হয় না। তারা বলছেন, এক্ষেত্রে মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। নীতিমালা লঙ্ঘনেও কারো কোনো শাস্তি হচ্ছে না। যার কারণে স্কুলের সঠিক আসন বিন্যাস, ভর্তি পরীক্ষা, এলাকা কোটাসহ নানাবিধ অনিয়ম দেখা দেয়। সন্তানদের নিয়ে পড়তে হয় নানা দুশ্চিন্তায়।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের চেয়ারম্যান জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া নির্ধারণ প্রক্রিয়াটা সঠিকভাবে হচ্ছে না। এটা হওয়া উচিত স্কুলটি যে জায়গায় অবস্থিত সেখান থেকে পাশ্ববর্তী এলাকাটা কত স্কয়ার কিলোমিটার জায়গা ধরে বিস্তৃত সেটি নির্ধারণ করতে হবে। দেখা যায় কোথাও একটি থানা নিয়ে ক্যাচমেন্ট এরিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। আবার কোনো জায়গায় দেখা যায় একটি ওয়ার্ডের অর্ধেক নিয়ে করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো জায়গায় দেখা যায় একটা কলোনি এলাকা নিয়ে।
নির্ধারিত স্কুলগুলোতে ভর্তি করানোর ক্ষেত্রে সারাউন্ডিং এরিয়া করে স্কুলের আশপাশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ক্যাচমেন্ট এরিয়া নির্ধারণ করা উচিত। এক্ষেত্রে এ কোটার পরিমাণ ৪০ শতাংশের বেশি হওয়া দরকার।’
মূলত এখানে বাণিজ্য হচ্ছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এখানে আপসের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কারো সুবিধার জন্য কোনো এলাকায় একটু বেশি ধরা হয়, আবার কোনো এলাকায় কম ধরা হয়। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মুগদা শাখার ক্যাচমেন্ট এরিয়া ধরা হয়েছে পুরো মুগদা থানা এলাকা। অন্যদিকে প্রধান শাখার এরিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে শুধু মতিঝিল কলোনি এলাকা নিয়ে। আবার দেখা যাচ্ছে একই এলাকার মধ্যে ২-৩ টা স্কুল আছে। এসব ক্ষেত্রে ক্যাচমেন্ট এরিয়া সঠিকভাবে নির্ধারণ হয় না।’
ভর্তি ফি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘২০১১ সালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সেখানে বলা হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময় ৫ হাজার টাকার বেশি নিতে পারবে না। আর আংশিক এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৮ হাজার টাকার বেশি নেওয়া যাবে না। এ বছরও সেটি নির্ধারিত আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আগে ৩ মাসের টিউশন ফি যোগ করে ভর্তির সময় নেওয়া হতো। ওরা জানুয়ারি মাসে টিউশন ফি দুই ধাপে নেয়। ভর্তির সময় একবার নিয়ে নেয়। আবার ভর্তির পর নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ডায়েরি বাবদ এত টাকা, উন্নয়ন ফি এত টাকা, খাতার জন্য এত টাকা, সেমিনারের জন্য এত টাকা, জেনারেটর এত টাকা, এভাবে অনেক টাকা তুলে নেয়। সরকারের সঠিক মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় এগুলো করার সুযোগ পাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘ভর্তি নীতিমালায় আছে আগে আসন ঘোষণা করতে হবে। তারপর লটারি দিতে হবে। এখন আগে আসন ঘোষণা না করেই লটারি করা হয়। দেখা যায়, স্কুলে আসন থাকে ২০০ অথচ সিট দেখায় ৫০টা। বাকিদের টাকার বিনিময়ে ভর্তি করা হচ্ছে। এভাবে হলে আমরা সন্তানদের ভর্তি করাবো কি করে।’
অভিভাবক সালমা আক্তার বলেন, ‘আমার সন্তান এবার জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। আমি শান্তিনগর এলাকায় থাকি। কিন্তু ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ বেইলি রোড ব্রাঞ্চে ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় পড়িনি। এখন নবম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য দরখাস্ত কোথায় করবো সেটি নিয়ে চিন্তায় আছি।’
ভিকারুননিসা স্কুল রমনা থানা এলাকায় পড়ার কারণে টুইন টাওয়ারের এই এলাকা অর্থাৎ শান্তিনগর মোড় এলাকা ক্যাচমেন্ট এরিয়ার মধ্যে পড়েনি। উল্টো পাশ থেকে আবার সিদ্বেশ্বরী, বেইলি রোড, কাকরাইল মসজিদ পর্যন্ত এলাকা পড়েছে। আবার অন্যদিকে মধুবাগ, বড় মগমাজারসহ অনেক দূর পর্যন্ত এলাকা পড়েছে। আমরা অন্য থানা এলাকা হওয়ায় এত কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও ক্যাচমেন্ট এরিয়ার মধ্যে পড়িনি। অন্যদিকে আমি মতিঝিল আইডিয়াল এলাকায়ও পড়িনি। এখন চিন্তা করছি কিভাবে ভর্তি করবো।’
তিনি বলেন, ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া হওয়া উচিত সারাউন্ডিং এরিয়া অনুসারে। কিন্তু সেটি করা হচ্ছে না। দেখা গেছে পাশাপাশি হয়েও আমি পাচ্ছি না। অন্যদিকে আরেকজন অনেক দূর হলেও সে এরিয়ার মধ্যে পড়ছে। সারাউন্ডিং করে একটা নির্দিষ্ট মাপ থাকা উচিত এক স্কয়ার বা দুই স্কয়ার কিলোমিটার। কিন্তু কোনো থানা বা ওয়ার্ডকে কেন্দ্র করে এটি করা উচিত নয়। ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় দুটো থানা নেওয়া যায় কিন্তু এখানে নেওয়া হবে না কেন। ওয়াকিং ডিসট্যান্স হিসেবে টুইন টাওয়ার খুব একটা দূর না।’
তিনি আরো বলেন, ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়ার বিভাজনটা পুনর্বিন্যাস করা দরকার। আর এক্ষেত্রে স্থানীয় বাড়িওয়ালাদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ, তাদের চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তেমন থাকে না। ভাড়াটিয়ারা যে কোনো স্কুলের পাশে বাসা নিতে পারে।’
ফি নিয়ে তিনি বলেন, ‘ফি টা সরকার যখন নির্ধারণ করে দেয় তখন তারা কম নেয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলো তুলে নেয়। সেশন উন্নয়ন ফি, এই উন্নয়ন সে উন্নয়ন বিভিন্ন কিছুর কথা বলে পরে পুরো ৩০ হাজার বা তার চেয়েও অধিক টাকা তুলে নেয়। এটি বন্ধে সরকারের কার্যকরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
উদয়ন স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সুবর্ণা আক্তার বলেন, ‘আমার দুই সন্তান। তার মধ্যে একটা উদয়নে পড়ছে। আরেকজনকে গত বছর ভর্তি করাতে গিয়ে দেখি আমার আবাসিক এলাকা তাতী বাজার ক্যাচমেন্ট এরিয়ার মধ্যে পড়ছে না। যে কারণে তাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘দুই সন্তানকে একই স্কুলে পড়াতে পারলে আমাদের কষ্ট কম হতো। এখন আমাদের স্বামী-স্ত্রী দুইজনকে দুই স্কুলে বাচ্চা নিয়ে দৌঁড়াতে হয়। এর মধ্যে আবার দুজনের অফিস। সব মিলিয়ে খুব ঝামেলা করতে হয়।’
অভিভাবক সেলিনা হোসেন বলেন, ‘আমার সন্তান এবার পিইসি পরীক্ষা দিচ্ছে। এরপর তাকে রাজউকে ভর্তি করানোর চিন্তা আছে। এর জন্য কোচিং করাচ্ছি। একদিকে পিইসি পরীক্ষার পড়ার চাপ অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং-এ পড়ার চাপ সবমিলিয়ে বাচ্চাটা একেবারে পাগল বনে যাচ্ছে। জানিনা, ভর্তি পরীক্ষায় টিকবে কি না। এ নিয়ে মহাচিন্তায় আছি।’
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার মেয়ে আকলিমা আঞ্জুমা হোসেন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। ইংলিশ মিডিয়ামগুলো যে যার মতো চলছে। যেভাবে মন চাচ্ছে বেতন ফি নির্ধারণ করছে। এর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা থাকা দরকার। নীতিমালা থাকলে সুবিধা হতো।’

