ঢাকাSaturday , 16 July 2016
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঐতিহাসিক মুক্তাঙ্গন এখন ডাস্টবিন!

Link Copied!

muktangonবিশেষ প্রতিবেদন : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী মুক্তাঙ্গন পার্ক এখন ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। অথচ দেশের ঐতিহাসিক যে কোনো আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাগার ছিল এটি। কিন্তু এখন আর সেই প্রাণ চাঞ্চল্যতা নেই পার্কটিতে। দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এর গৌরব, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। নেই কোনো রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ ও মিছিল। তীব্র রোদ্র আর ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কেউ আর গলা ফাটিয়ে ভাত, ভোট ও গণতন্ত্রের অধিকারের কথা বলেন না। কার্যত মুক্তাঙ্গন এখন কেবলই ময়লার ভাগাড়।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র পুরানা পল্টন মোড় থেকে একটু সামনে এগুলেই ঐতিহাসিক এ পার্কটির অবস্থান।
ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানের পাশাপাশি এক সময় দেশের প্রগতিশীল সমস্ত রাজনৈতিক আন্দোলনের জমায়েতস্থল ছিল মুক্তাঙ্গন। এখানে এক সময় বক্তৃতা করেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মনি সিংহ ও মোজাফফর আহমদের মতো কিংবদন্তীরা। এমনকি এই সময়ের রাজনীতিকদের মধ্যে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াও এই পার্কে বক্তৃতা করতেন। বিশেষ করে স্বৈরাচার বিরোধী উত্তাল আন্দোলনের সময় এখান থেকেই তারা ঘোষণা করতেন নানা কর্মসূচি। বড় দলগুলোর পাশাপাশি ছোট-মাঝারি প্রগতিশীল ও বামপন্থী দলগুলোর প্রথম ভরসাই ছিল এ পার্ক। মুক্তাঙ্গনেই সবচেয়ে বেশি সভা-সমাবেশ ডাকতো তারা। এরকম ঐতিহাসিক অনেক ঘটনাপ্রবাহের নীরব সাক্ষী মুক্তাঙ্গন। পূর্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এটিকে ব্যবহারোপযোগী করা তো দূরের কথা এমন জায়গাটিকে রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনও অনুভব করছেন না কেউ। পার্কটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পার্কটিতে স্থাপন করতে পারতো কোনো স্মৃতি ফলক অথবা ঐতিহাসিক নিদর্শন। কিন্তু তার বদলে তারা সেখানে স্থাপন করেছে দুটি বড় বড় ডাস্টবিন। ফলে কয়েক বছরে মুক্তাঙ্গন হয়ে উঠেছে ময়লার ভাগাড়। বর্জ্য ও মল-মূত্রের গন্ধে মুক্তাঙ্গনের পাশ দিয়ে এখন হাঁটা দায়।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি নিষেদ্ধাজ্ঞার ফলে প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে এ পার্কটিতে এখন আর আন্দোলন সংগ্রামের কোনো কর্মসূচি পালন করা হয় না। সেখানে ডিএসসিসি কতৃপক্ষ বর্জ্যর ফেলার জন্য দুটি ডাস্টবিন স্থাপন করেছে। এ কারণে প্রধান সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথযাত্রীরা এখানে মূত্রত্যাগ করছেন হরহামেশা। এছাড়াও ছিন্নমূল মানুষদের যত্রতত্র মল-মূত্রত্যাগের ফলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।
এ পার্কটির উত্তর পাশের কিছু অংশ ব্যবহার করছে পুলিশ। সামান্য খোলা অংশ এখন আর ব্যবহারের উপযোগী নয়। আবার খানিকটা দক্ষিণ পাশেই অবৈধভাবে দখল করে গড়ে ওঠছে একটি মসজিদ। বর্তমানে মসজিদটির সংস্কার কাজ চলছে। এছাড়াও মসজিদের পাশের কিছু অংশ অবৈধভাবে দখল করে ‘ঢাকা মাইক্রোবাস ও কার মালিক সমিতি’ নামের একটি সংগঠন প্রাইভেটকার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজনীতি সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন, মুক্তাঙ্গণ পার্কটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে। এই পার্কটির উন্মুক্ত স্থানটিকে বলা যায়, ‘আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাগার’। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় তার ইতিহাস আজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য কলঙ্কজনক। এখান থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন সংগ্রামের ডাক এসেছে। কিন্তু কতৃপক্ষ বিষয়টিকে নিয়ে ভাবছেনই না। অবিলম্বে এ স্থানটির ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানান তারা।
তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, পার্কটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে অবেধ দখলদারদের থেকে উদ্ধার করে এর প্রবেশ পথে দেয়ালের খুঁটি বসিয়ে দেয়া হয়েছে। যাতে করে কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে না পারে। তবে পার্কে গিয়ে দেখা গেছে ভেতরে তেমন কোনো গাড়ি দেখা না গেলেও পুরো পার্ক জুড়ে রাখা হয়েছে দুটি বড়বড় ডাস্টবিন। যেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো পল্টনজুড়ে। পার্কের ভেতরে ঘুরতে আসা সাধারণ মানুষের বসার স্থানগুলোও ঢুকে পড়েছে অবর্জনার স্তূপে।
এদিকে দখলদাররা বিভিন্ন কৌশলে পার্কের গাছগুলো ধ্বংস করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাতের আঁধারে তারা বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে গাছের শেকড় নষ্ট করে দিচ্ছে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে পার্কের বড়বড় কয়েকটি গাছ সামান্য বাতাসে স্বমূলে উপড়ে গেছে। অন্যান্য গাছগুলোও মৃতপ্রায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাঈফুল হক বলেন, ‘মুক্তাঙ্গন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী। এখান থেকে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হয়ে সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, এমন অনেক ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশন তার এই ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারছে না। যা জাতির জন্য দুঃখজনক।’
অবিলম্বে এই মুক্তাঙ্গন যাতে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়, সে জন্য ডিএসসিসির প্রতি দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা শুভ্রাংশু চক্রবর্তী বলেন, ‘রাজধানীর মূল কেন্দ্রের মুক্তঙ্গনটি ছিল আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাগার। যেখান থেকে মানুষের ভোট, ভাত ও গণতন্ত্রের অধিকারের কথা বলা হতো। কিন্তু আজকে আর সেই মুক্তাঙ্গন নেই। এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না।’
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ স্থানটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে না আনতে পারলে মুক্তাঙ্গনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে বলেও মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দোকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, ‘পল্টনের ডাস্টবিন দুটি আপাতত পার্কের মধ্যে রাখা হয়েছে। খুব শিগগিরই এ ডাস্টবিন দুটি সরিয়ে ফেলা হবে। মুক্তাঙ্গন পার্কটি আগের রূপে ফিরে আসবে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহম্মদ বিলাল জানান, অচিরেই মুক্তাঙ্গন তার ঐতিহ্যের জায়গায় ফিরে আসবে। এখানে কোনো অবৈধ দখলদার থাকতে পারবে না। এ পার্কটি জনগণের বিনোদনের জন্য ব্যবহারোপযোগী করা হবে।