নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ মহান মুক্তিযোদ্ধের চেতনা থেকে সরে গেছে এমন অভিযোগ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে আনতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক সর্দার আমিরুল ইসলাম সাগর। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের ‘প্রকৃত সংখ্যা’ নিরূপণে ‘মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা সেল’ গঠন করা হয়েছে। এই সেলের কাজ হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিরূপণের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে একটি অভিসন্দর্ভ রচনা করা, যেটি আগামী ২৬ মার্চ সেমিনারের মাধ্যমে পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করা হবে।’ দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টালকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান সর্দার আমিরুল ইসলাম।
এই ছাত্রনেতার জন্ম সিরাজগঞ্জে। বাবা ফখরুল আলম। মা মরহুমা লায়লা আলম। ২০০২-০৩ সেশনে তিনি ভর্তি হন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই শিক্ষার্থী বর্তমানে ঢাবির আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে কোরিয়ান ভাষার ওপর কোর্স করছেন। গত ২১ ডিসেম্বর রাজধানীতে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের এক সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে।’ এরপর খালেদা জিয়ার ওই বক্তব্যকে সমর্থন করে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ‘নির্বোধ’ বলেছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
খালেদা জিয়ার ওই বক্তব্যকে সমর্থন করে গয়েশ্বর রায়ের কথার রেশ ধরে ছাত্রদলের মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক সর্দার আমিরুল ইসলাম সাগর বলেন, ‘আমরা মনে করি, একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা কী ছিল, সেটি সুরাহা হওয়া উচিত। তারা নির্বোধ ছিলেন কি না কিংবা কেন তারা মারা গেলেন- এরও সুরাহা করতে হবে। তবে বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে আমাদের কোনো কটাক্ষ নেই। তাদের সম্মান দেয়া দরকার, সেটা বেগম খালেদা জিয়াই দিয়েছেন। কারণ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান যে স্বাধীনতা ও একুশে পদক রয়েছে সেগুলো প্রবর্তন করেছেন খালেদা জিয়ার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই।’
প্রসঙ্গটির ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘একাত্তরে অনেকে মুক্তিযুদ্ধপন্থি ছিলেন। বুদ্ধিজীবী ছিলেন যারা, তাদের অনেকেই মাঠে নেমেছেন। চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম তাদের একজন। তিনি একজন বুদ্ধিজীবী, নিজেই যুদ্ধ করেছেন। আবার অনেক বুদ্ধিজীবী আছেন, যারা মুক্তিযু্দ্ধে যাননি। তারা কেন যুদ্ধে যাননি, তখন তারা কিভাবে ছিলেন, একাত্তরে তাদের কী ভূমিকা ছিল? -এগুলো এখন বিচার-বিশ্লেষণের সময় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস বি-নির্মাণ ও অভিন্ন জাতি গঠনে এটি করা উচিত। ঠিক যেভাবে খালেদা জিয়াও বলেছেন- মুক্তিযুদ্ধের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে।’
শহীদদের সংখ্যা প্রসঙ্গে সর্দার আমিরুল ইসলাম সাগর বলেন, ‘আমরা বলে থাকি, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছেন। এই সংখ্যা নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই। বরং একটা জাতি যতো বেশি ত্যাগের মাধ্যমে তাদের স্বাধীনতা অর্জন করে, সে জাতি ততো বেশি মহিমান্বিত। তাই সংখ্যাটা ৩০ লাখ না হয়ে তিন কোটি হলে আমি ব্যক্তিগতভাবে আরো খুশি হবো। তিন কোটি প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘সংখ্যাটা আসলে কতো? এটা কি ৩০ লাখ, নাকি তিন কোটি, নাকি তিন লাখ? এটা নিরূপণ হওয়া খুব জরুরি। কারণ, এখন পর্যন্ত সরকারি গেজেট অনুযায়ী মাত্র ২ লাখ ৭৫ হাজার শহীদ পরিবার ভাতা পান। তারা তো ভাতা পায়। বাকি ২৭ লাখ ২৫ হাজার শহীদ পরিবারের ভাতা কে খায়? এটা কি ভূতের পেটে যায়, নাকি কোনো কালো বিড়ালের পকেটে যায়? এটি সুরাহা হওয়া খুব জরুরি।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের সময়ের কথা উদ্ধৃত করে ছাত্রদলের মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক এ সম্পাদক বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের বেশকিছু ভিডিও ক্লিপ আছে, যেগুলো আমি সংগ্রহে রেখেছি। সেখানে তিনি কোথাও মিলিয়নস, আবার কোথাও ফিউ মিলিয়নস বলেছেন। এছাড়া তৎকালীন পত্র-পত্রিকার কাটিংয়ে দেখা গেছে, এই সংখ্যাটা নিয়ে বিতর্ক আছে। সুতরাং এই সংখ্যা নিয়ে যে বিতর্ক আছে, সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আমার নেত্রী (খালেদা জিয়া) এই বিতর্কের একটা সমাধান চেয়েছেন। তার সময়ই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের তিনিই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত করেছেন। সুতরাং তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।’
ছাত্রদলে মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক নামে নতুন পদ সৃষ্টির উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিএনপি বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের দল, মুক্তিযোদ্ধাদের দল। নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথাকে অবিকৃতভাবে ছড়িয়ে দিতে ম্যাডাম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত আগ্রহে এবং ছাত্রদলের অভিভাবকদের সময় ও বাস্তবতার নিরিখে প্রসূত সিদ্ধান্তে এই পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।’
নতুন এই পদের কর্মপরিকল্পনা প্রসঙ্গে সর্দার আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে দুটো প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এর মধ্যে একটির কাজ শুরু হয়েছে। এটি হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা সেল। এই সেলের কাজ হচ্ছে- এতোদিনেও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত শহীদদের সংখ্যা কেন নিরূপণ হয়নি, এর পেছনে কী বাধা ছিল, কারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে- এসব বিষয় নিয়ে একটি অভিসন্দর্ভ রচনা করা হবে। আশা করি, আগামী ২৬ মার্চ সেমিনারের মাধ্যমে পুস্তিকা আকারে এটি প্রকাশ করা হবে। দ্বিতীয় প্রকল্পটি হচ্ছে, ২৬ মার্চের পর মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রতি সপ্তাহে পাঠচক্রের আয়োজন করা। এটি হবে উন্মুক্ত।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান অবৈধ সরকারের সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী আছে, যারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, তাদের বলা হয় সল্টলেকের মুক্তিযোদ্ধা। সল্টলেকের এই মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে আনতে যা যা করা দরকার ছাত্রদলের মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে আমি তাই করবো।’
ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচন কাউন্সিলের মাধ্যমে না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কাউন্সিলই যে গণতান্ত্রিকভাবে নেতৃত্ব নির্বাচনের একমাত্র উপায়, তা কিন্তু নয়। বরং ছাত্রদল যে প্রক্রিয়াতে নেতৃত্ব নির্বাচন করে থাকে সেখানে অধিক গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী নেতৃত্ব বের হয়ে আসে। ইসলামের প্রথম যুগে খলিফা নির্বাচনের আদলে ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ার প্রাথমিক অংশ হিসেবে ছাত্রদলের সাংগঠনিক নেত্রী (খালেদা জিয়া) ছাত্রনেতাদের সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিবিধ উপায়ে যাচাই-বাছাই করেন। এর মধ্য দিয়ে যোগ্য নেতাদের একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা বের হয়ে আসে।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘ম্যাডাম এরপর বিদ্যমান কমিটির সকল নেতাকে নিয়ে বসেন। কমিটির বাইরেও যদি কোনো অংশ থেকে থাকে তিনি তাদের নিয়েও বসেন। প্রত্যকে সুপারিশ-অভিযোগ উত্থাপন করে নেতা নির্বাচনের দায়িত্বভার ম্যাডামের ওপর ছেড়ে দেন। ছাত্রনেতাদের বক্তব্য ও নানা কর্মকাণ্ড বিচার-বিশ্লেষণ করে ম্যাডাম ছাত্রদলের নেতা নির্বাচন করেন। এর ফলে গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী নেতৃত্বে বের হয়ে আসে।’
ছাত্রদলের কমিটিতে নিয়মিত ছাত্রদের পরিবর্তে অছাত্র, বিবাহিত ও ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্তকরণ প্রসঙ্গে সর্দার আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘১৬ বছর পড়াশোনা করে একজন ছাত্র সরকারের মন্ত্রণালয়ের অফিসার হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করে। ছাত্রনেতারাই কালের পরিক্রমায় এক সময় ওইসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেবে, সরকারি অফিসারদের পরিচালনা করবে। তাই ছাত্রনেতাদের গড়ে উঠতে তো আপনাকে কিছুটা সময় দিতেই হবে। আর যাদের অছাত্র বলা হচ্ছে, তারাও নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত।’
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে ২৯ বছরের বয়সসীমা বেঁধে দেয়া হলেও ছাত্রদলের ক্ষেত্রে কোনো বয়সসীমা না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগের বেঁধে দেয়া বয়স ২৭। প্রতিবার তারা ২ বছর গ্রেস দেয়। দেখুন, কিছু কাটে ধারে আর কিছু কাটে ভারে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কমিটিতে কিছু অভিজ্ঞ ছাত্রনেতাকে রাখা হয়। তবে বাকি সবার বয়সই কিন্তু অলিখিতভাবে ত্রিশের আশপাশেই থাকে।’
‘অছাত্ররাই ছাত্রদলের নেতৃত্বে রয়েছে’- এমন অভিযোগ করে ‘অছাত্রদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না’- মর্মে উপাচার্য ও ছাত্রলীগের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেখুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্ররাজনীতি করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ পরিষদ’ আইনে। এই আইনে বলা আছে, ক্রিয়াশীল সকল ছাত্রসংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। আর সংগঠন তাদের নেতা নির্বাচন করবে। এর ফলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে আসা ছাত্র সংগঠনের নেতা-নেত্রীরা মধুর ক্যান্টিনভিত্তিক রাজনীতি করতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে কয়েকটি উদাহরণ টেনে সর্দার আমিরুল ইসলাম সাগর বলেন, ‘ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অথচ এই আইনের জোরেই তিনি ঢাবির আঙ্গিনায় রাজনীতিতে সক্রিয়। একইভাবে ছাত্রলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি রানা ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী। তিনিও এই আইনের জোরেই মধুর ক্যান্টিনে আসেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফ্যাসিস্ট মনোভাবাপন্ন হওয়ার কারণেই ছাত্রদলের বেলায় এই আইন ভুলে যান।’

