নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর সবচেয়ে বড় এবং নিয়মিত জুয়ার আসর বসে কোথায়? উত্তর হবে মতিঝিলের আরামবাগে। দীর্ঘ ফুটপাথ জুড়ে হকার এবং কাঁচা বাজার বসে কোথায়? এটারও উত্তর মতিঝিল ও এর আশপাশে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সরকারি-বেসরকারি অফিস আছে কোথায়- যেখানে বছরে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার হয়? এর উত্তরও মতিঝিলে। এরকম আরো অনেক কিছুই আছে মতিঝিলে। সঙ্গত কারণেই রাজধানীর রাজধানী খ্যাত এই মতিঝিলের দিকে অবৈধ আয়ের উৎস সন্ধানীদের নজর থাকে সবসময়ই একটু বেশি।
ক্লাবে জুয়ার আসর, মাদক ব্যবসা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাজার কোটি টাকার টেন্ডারবাজি, ফুটপাথের চাঁদাবাজি, বৈধ-অবৈধ ব্যবসা, স্কুল-কলেজে ভর্তি বাণিজ্য, ডিশ ব্যবসা, সবকিছু মিলিয়ে দেশে-বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক ক্যাডার কিংবা এলাকার উঠতি মাস্তান সবারই লক্ষ্য থাকে বাণিজ্যিক এই এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখা।
এ এলাকার আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে খুনের ঘটনাও ঘটেছে মতঝিল ও এর আশপাশের এলাকায়। সর্বশেষ খুন হন যুবলীগের (দক্ষিণ) সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান ওরফে মিল্কি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুক যুদ্ধে’ মারা যান যুবলীগের (দক্ষিন) যুগ্ম সম্পাদক এস এম জাহিদ সিদ্দিকী তারেক। এখনো পর্যন্ত নিখোঁজ কিংবা পলাতক আছেন যুবলীগ নেতা সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল ও ওয়াহিদুল ইসলাম আরিফ।
মতিঝিলের নিয়ন্ত্রণ নিতে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো কেন এত তৎপর সরেজমিনে এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, শুধুমাত্র দৈনিক বাংলা থেকে শাপলা চত্বর হয়ে রাজধানী মার্কেট পর্যন্ত ফুটপাথে দৈনিক চাঁদা ওঠে ৭ লাখ টাকা। মাসে দাঁড়ায় ২ কোটি ১০ লাখ এবং বছরে ২৫ কোটি টাকার বেশি।
সূত্র জানায়, পল্টন পুলিশ ফাঁড়ি থেকে রাজধানী সুপার মার্কেট পর্যন্ত এলাকার ফুটপাথের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আছে ৩টি গ্রুপ। শাপলা চত্বর থেকে রাজধানী মার্কেট পর্যন্ত ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছেন বিদেশে পালিয়ে থাকা একজন বড় মাপের সন্ত্রাসী। যাকে সকলে ‘বড়…’ নামে চেনেন।
দৈনিক বাংলা থেকে পল্টন পুলিশ বক্স পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করেন কৃষক লীগের আব্দুর রাজ্জাক ও শামীম গ্রুপ। শাপলা চত্বর থেকে দৈনিক বাংলা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আছে নতুন কমিশনার ও আরামবাগের ক্লাব পাড়ার পরিচিত মুখ সাইদের।
শুধুমাত্র ডিশ ব্যবসার মাধ্যমে মতিঝিল এজিবি কলোনি ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে প্রতি মাসে ন্যূনতম ১৬ লাখ টাকা নিট মুনাফা হয়। এছাড়া পরিবহন ও ফুটপাথ বাণিজ্য তো আছেই। তবে এগুলো মতিঝিলের আয়ের বড় উৎস নয়। কারণ এসব খাত থেকে আসা অর্থের বড় একটি অংশ ‘বড় ভাইরা’ তাদের ‘ছোট ভাই’দের পেছনে খরচ করেন। অবৈধ এই আয়ের অংশ পুলিশসহ পান আরো অনেকেই।
মতিঝিল থেকে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে টেন্ডার বাণিজ্য ও ক্লাবে জুয়ার বোর্ড থেকে প্রাপ্ত অর্থ। আরামবাগের জুয়ার বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করছেন যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতা। গণপূর্ত, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ডিপিডিসি এবং ওয়াসার হাজার কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণও এই নেতার হাতে। তার হয়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন যুবলীগ দক্ষিণের ‘খ’ আদ্যক্ষরের এক নেতা।
কমলাপুরের আইসিডি কন্টেনার ডিপো নিয়ন্ত্রণ করেন আহকাম ও সুলতান। তারা দুইজনই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
এছাড়া মতিঝিল-সবুজবাগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বৃহত্তর মতিঝিল এলাকার অবৈধ বিভিন্ন আয়ের উৎস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের দলের লোকজনকেই এইসব এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকতে দেখা যায়।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, যুবলীগ নেতা মিল্কির মৃত্যুর পর মতিঝিল এলাকার ‘দায়িত্ব’ বুঝিয়ে দিতে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত ও জিসান ফোন করেন যুবলীগ দক্ষিণের এক নেতাকে। তারা ওই নেতাকে তাদের গ্রুপের ছেলেদের কাছে এসব এলাকার টেন্ডার বাণিজ্য, ডিশ ব্যবসা, ফুটপাথ, কাঁচাবাজারসহ বৈধ-অবৈধ সব ধরনের ব্যবসা ছেড়ে দেয়া জন্য চাপ দেন।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, মিল্কির মৃত্যু পর মতিঝিলের একাংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে মিল্কি গ্রুপের শতাধিক সদস্যকে নিজ দলে টানার চেষ্টা করছিলেন জাতীয় পার্টির মতিঝিল থানার এক নেতা। তবে মিল্কির বিশ্বস্ত সহযোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা অন্য কোন ‘বড় ভাইয়ের’ জিম্মায় থাকতে চান না। নিজেদের ব্যবহার করার কোনো সুযোগ তারা কাউকে দেবে না।
তবে মতিঝিল এলাকায় ফুটপাথে চাঁদাবাজি বা ক্লাব পাড়ায় জুয়া খেলার কথা জানেন না বলে জানিয়েছেন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরমান আলী। তিনি বলেন, ‘মতিঝিল এলাকায় এ ধরনের কোনো কার্যকলাপের কথা আমাদের জানা নেই।’

