ঢাকাSaturday , 6 June 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মুক্তির স্বপ্নে বিভোর ছিটমহলবাসী

Link Copied!

sitনিজস্ব প্রতিবেদক : দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনামুক্তির স্বপ্ন দেখছেন বাংলাদেশের ভিতরে সবচেয়ে বড় ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার প্রায় দশ হাজার মানুষ। ছিটমহল বিনিময়ের বাধা কাটায় স্বপ্নে বিভোর ছিটমহলবাসী। নতুন নতুন স্বপ্ন বুনছেন কল্পনার খাতায়। নাগরিকত্ব, চাকরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা পাওয়ার আশায় বুক বেধে আছেন তারা। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্কুল-মাদরাসা করারও পরিকল্পনা নিয়েছেন বাসিন্দারা। এমনকি ছিটমহলে খুন-খারাপি হলেও তেমন কোনো বিচার ছিল না। খুন করে ধরা পড়লেও সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল জরিমানা। খাঁচায় বন্দী পাখির এ দশা থেকে মুক্তির আভাসে স্বাধীনতা আসছে বলেও মন্তব্য করেন ছিটমহলের বাসিন্দারা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সবার মাঝে রয়েছে না পাওয়ার বেদনা। বাংলাদেশের ভিতরে ভারতীয় ছিটমহলে বসবাস হলেও কোনো দেশের নাগরিক সুবিধাই তারা কখনও পাননি। ছেলে-মেয়েরা বাংলাদেশের স্কুলে পড়ার সুযোগ পেলেও এ দেশে তাদের চাকরি হয়নি। এমনকি ছিটমহলের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও পদে পদে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয় তাদের।
আজ শনিবার বাংলাদেশে আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্থলসীমান্ত চুক্তির অনুসর্মথনের দলিল হস্তান্তরের কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ছিটমহল উন্নয়নে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছেও তাদের ঘোষিত ছিটমহল উন্নয়ন প্যাকেজ থেকে বরাদ্দ চান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দারা। দু’দেশ থেকে ঘোষিত বাজেটে ছিটমহলগুলোতে বইছে উৎসবমুখর আমেজ।
কুড়িগ্রাম সীমান্ত থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার ভেতরে ফুলবাড়ি থানায় ১ হাজার ৬৪৩ একর আয়তনের দাসিয়ার ছড়া বাংলাদেশের ভেতরে সর্ববৃহৎ ভারতীয় ছিটমহল। লোকসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী, দাসিয়ার ছড়ার নতুন ঠিকানা হবে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ারছড়া শাখার সভাপতি মো. আলতাফ হোসেন বলেন, ‘১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। একই আলো-বাতাসে মানুষ হলেও আমরা পাইনি স্বাধীনতার স্বাদ। খাঁচার পাখির বন্দী জীবনে আমরা ৬৮ বছর কাটিয়ে দিয়েছি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এক ভয়ানক জীবন যাপন করেছি।’
তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল নাই, বিদ্যুৎ নাই, স্কুল-কলেজ নাই, বিচার-আচার নাই, কোনো দেশেই সহজে চলাচলের উপায় নাই।’
আলতাফ হোসেন জানান, শিক্ষিত মানুষ একেবারে নেই, তা নয়। মিথ্যা ঠিকানা দিয়ে আমরা ছেলে মেয়েদেরও পড়া-লেখা করাচ্ছি। কিন্তু ছিটমহলের বাসিন্দা হওয়ায় চাকরির সুযোগ তাদের হয়নি।
তিনি জানান, আব্দুস সালাম নামে একজনের দুই ছেলে শাহজাদা ও শাহজাহান সেনাবাহিনীতে চাকরির সব ধাপ পেরিয়ে শেষে পুলিশি তদন্তে বাদ পড়ে যান।
আলতাফ বলেন, শুনেছি পশ্চিমবঙ্গে এই ছিটমহলের মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য ভারত ৩ হাজার ৮ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী কাছে আমাদের আবেদন তিনি যেন আমাদের জন্য প্যাকেজের কিছু অংশ দেন।
কেতারু নামের এক বৃদ্ধ বলেন, ছিটের মানুষের কোনো দাম নাই। নানা সময়ে নানা বাধার মুখে আমাদের পড়তে হয়। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে যাচ্ছি জেনে খুবই আনন্দ লাগছে। এতদিন ভারতের নাগরিক ছিলাম। কিন্তু ভারত আমাদের ভালোভাবে নিত না। আবার বাংলাদেশে ঢুকতেও নানা বাধা।
অপর এক বৃদ্ধ আব্দুর রহমান বলেন, ‘বাপ-দাদার গোর (কবর) এখানে তাই আর ভারত যেতে চাই না। বাংলাদেশের মাটিতে থাকতে চাই।’
এ ছিটমহলের এক বাসিন্দা বলেন, ‘ছিটমহলের সমস্যাগুলো বলে বোঝানো যাবে না। বাংলাদেশে বিয়ে করতে গিয়েও তাকে বিপত্তিতে পড়তে হয়েছে। কোনো পরিবার তাদের মেয়েকে ছিটের বাসিন্দার সঙ্গে বিয়ে দেয় না, কারণ কোনো ঝামেলা হলে মামলা করা যায় না।’
ছিটমহল বিনিময় কমিটির আলতাফ হোসেনের সঙ্গে আলাপে ছিটমহলের বিচার ব্যবস্থাসহ তাদের চাওয়া-পাওয়ার নানা বিষয়ে উঠে আসে। তিনি জানান, আগে দাসিয়ারছড়ার ‘মুরুব্বিরা’ বসে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন। এরপর ১৯৮০ সালে একটি আনুষ্ঠানিক প্রশাসন পায় ছিটমহলবাসী। তখন একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। তাদের তত্ত্বাবধানে ইউনিয়ন পরিষদের মতো করে নির্বাচন চালু হয়, যাতে একজন চেয়ারম্যান ও নয়জন মেম্বার নির্বাচনের ব্যবস্থা তৈরি হয়। তারাই এ এলাকার প্রশাসন। ১৯৮০ সাল থেকে দুই মেয়াদে ১০ বছর মো. নুরুজ্জামান মিয়া এ এলাকার চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে আসগর আলী ও নজরুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান হন। কিন্তুগত কয়েক বছর ধরে এ নির্বাচনও বন্ধ বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, আগে এখানে খুন করে ধরা পড়লেও সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল জরিমানা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ভিতর ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হবে। একইভাবে ভারতের ভিতর থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল হয়ে যাবে ভারতের ভূমি। এ প্রক্রিয়ায় ছিটমহলবাসীরা তাদের জমিতে তাদের ভিটামাটিতে বসবাসের সুযোগ পাবেন। কাউকে স্থানান্তরের প্রয়োজন হবে না। তবে তাদের জাতীয়তা বদলে যাবে। কেউ ভারতে যেতে চাইলে তিনি আগের দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এই ছিটমহলের কিছু মানুষ ভারতে ফিরে যেতে চায়। মূলত যাদের পরিবারের লোকজন দিল্লিতে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত আছেন তারাই ভারতে যেতে চান।
উন্নয়ন চান ছিটমহলবাসী
ছিটমহলগুলোর অধিকাংশতেই নেই তেমন রাস্তা ঘাট, নেই স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা। তাই সরকারের নিকট তাদের জোর দাবি যতদ্রুত সম্ভব উন্নয়ন বাজেট বাস্তাবায়ন করার। এ ছাড়া প্রশাসনের তদারকি বাড়িয়ে খুব দ্রুত স্বাভাবিক করে আনা হউক ভেঙে পড়া আইন-শৃঙ্খলা।
ছিটমহলের নাগরিকরা জানান, প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় ছিটগুলোতে চলছে সীমাহীন অনিয়ম।
ছিটমহল উন্নয়নে প্রশাসনের বিশেষ পরিকল্পনা
অধিকার বঞ্চিত ছিটবাসীদের জীবন মানের উন্নয়নে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। ইতোমধ্যে ছিটমহলবাসী তাদের অধিকার আদায়ের সংগঠন ছিটমহল বিনিময় সমন্বয়ের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম জেলার ১২টি ছিটমহলের মানুষের জীবন মানের উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, কৃষি, যোগাযোগ, অবকাঠামো, হাট-বাজার, বিদ্যুৎসংযোগসহ ২৪টি আইটেমের উন্নয়ন প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন কুড়িগ্রামের ১২টি ছিটমহলের উন্নয়নে বিশেষ প্যাকেজ প্রস্তাবনা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।