সিলেট প্রতিনিধি
বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনসহ আরো বেশ কয়েকটি কারণে সিলেটে দিন দিন বেড়েই চলেছে গরম। এ বছরের এপ্রিল মাসে সিলেটে ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করে সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তর। যা স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
এমন অবস্থায় অস্বাভাবিক তাপমাত্রার ফলে জনজীবনে নেমে আসে অস্থিরতা। ব্যাঘাত ঘটে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রায়। তবে এখন সেই পরিমান তাপমাত্রা না থাকলেও স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে তা এখনো অনেক গুন বেশি রয়েছে। বাৎসরিক গড় হিসেবে সিলেটে তাপমাত্রার পরিমান স্বাভাবিকের চেয়ে ২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। তবে তা কিছুটা ওঠানামা করে।
অন্যদিকে দিন দিন গরমের এই তীব্রতা বাড়লেও কমে আসছে বৃষ্টিপাতের পরিমান। যে পরিমান মিলি মিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা তা অর্ধেকের চেয়েও বেশি নিচে নেমে এসেছে। গত জুলাই মাসে যেখানে ৮শ’ ১৯ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হওয়ার কথা, সেখানে ৩শ’ ১১ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর এই বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার ফলে কৃষি ভিত্তিক এই দেশের কৃষি উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ছে। সময়মতো পানি না পাওয়ায় কৃষকরা নির্দিষ্ট সময়ে গোলায় ধান তুলতে পারছেন না। বিগত ১০বছরে সিলেটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এবং এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে এক পরিসংখ্যানে এমন তথ্যই জানালেন সিলেট আবহাওয়া অফিসের সংশ্লিষ্টরা।
আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছরের এপ্রিল মাসে সিলেটে ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। যা স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। মূলত তাপমাত্রা ২৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকার কথা। অন্যদিকে ২০১৩ সালের ১১ জুন ৩৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১২ সালের ২ এপ্রিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ৩৭ দশিমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১০ সালের ২১ মার্চ ৩৭ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৯ সালের ২০ ও ২১ জুলাই ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৮ সালের ৮ আগস্ট ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৭ সালের ১ ও ২ মে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৬ সালের ২ মে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
এদিকে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তীত হয়ে যাচ্ছে দেশের ঋতুগুলোও। ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ হলেও এখন আর গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত আর বসন্তের সাথে তার চরিত্রের অনেকটাই ব্যতিক্রম দেখা যায়। এখন বসন্ত আসলে শোনা যায় না, ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, আজ বসন্ত। সত্যিই এখন বসন্তের শুরুতে গাছে গাছে নতুন পাতা গজাতে দেখা যায় না। কৃষ্ণচূড়ার ডালে টকটকে লাল পাতা গজায় আরো পরে। বর্ষাকালে এখন আর খালবিলে থইথই পানি দেখা যায় না।
গ্রীষ্মকাল শেষ হয়ে গেলেও গরমে ফেটে যাওয়া জমিতে বৃষ্টির পরশ পড়ে না। পৌষ মাস গিয়ে মাঘ মাস চলে আসে, শীত আর আসে না। পিঠাপুলি খাওয়ার ধুমও পড়ে না। কার্তিক-অগ্রহায়নে যেখানে সোনালী ধানে কৃষকের গোলা ভরে ওঠার কথা সেখানে তা আরো পরে ওঠে। দিন দিন এভাবেই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে ঋতু, এমনটাই মনে করছেন অনেকে। এখন চলছে বর্ষাকাল। কিন্তু যে পরিমান বৃষ্টি হওয়ার কথা তা হচ্ছে না। ফলে এখন আমন ধান চাষ করার কথা থাকলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ার কারণে সময় মতো কৃষকরা মাঠে ধান ফলাতে পারছেন না।
সিলেট আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, জুলাই মাসে যেখানে বৃষ্টি ২৫ দিন হওয়ার কথা, সেখানে বৃষ্টি ৩০ দিন হয়েছে। কিন্তু দিন বাড়লেও বৃষ্টির পরিমান কমে আসছে। জুলাই মাসে যেখানে ৮শ’ ১৯ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হওয়ার কথা, সেখানে ৩শ’ ১১ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার ফলে কৃষিভিত্তিক এই দেশের কৃষি উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ছে। সময়মতো পানি না পাওয়ায় কৃষকরা নির্দিষ্ট সময়ে চাষাবাদ করতে পারছেন না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে চাষাবাদে কৃষকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে অনেক সময় বৃষ্টিপাত যে মাসে বেশি হওয়ার কথা, সে মাসে কম হলেও পরবর্তী মাসে বৃষ্টিপাত বেশি হয়ে যায়। যে কারণে বৃষ্টিপাত রেকর্ড এ ভারসাম্য অনেকটা চলে আসলেও কৃষকরা সময় মতো মাঠে ধান ফলাতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
দিন দিন তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে গরম বাড়ছে। এরমধ্যে আরো অনেকগুলো কারণ আছে। গাছপালা নিধনও অন্যতম আরেকটি কারণ। তাছাড়া পাহাড়-পুকুর কমে যাওয়ার ফলে তাপ শোষণ করতে পারছে না। ফলে তা ভূমি শোষণ করছে। যে কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের নদীগুলোরও খনন কাজ না করায় তার নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। এসব কারণে দিন দিন তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে।’

