রাজশাহী প্রতিনিধি : মোটা অংকের চাঁদার দাবিতে বিলের পানি আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার এক মাস পরও বিলের মুখ বন্ধ রেখে কৃষক ও ইটভাটা মালিকদের সঙ্গে চাঁদা নিয়ে দরকষাকষি চালাচ্ছেন এসব প্রভাবশালীরা। প্রভাবশালীরা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মী বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।
বিষয়টি এলাকার সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর কানে গেলেও কোনো প্রতিকার হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের দক্ষিণ কোলঘেষে মাটিকাটা ইউনিয়নের সাহাব্দিপুর ও হরিশংকরপুরসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করে গত আগস্ট মাসে। নিচু এসব জমিতে পানি জমলেও বন্যা কমে গেলে হরিশংকরপুর এলাকার পানি নিষ্কাশনে তৈরি একটি ব্রিজের নিচ দিয়ে পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছিল।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সময় জমি ও ভাটা মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায়ের জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ইউপি সদস্য বাদরুল আলম টকেন, তার ছেলে সেকটার ও কামরুজ্জামান লেনিন মাস্টারসহ আরো কয়েকজন প্রভাবশালী নিজেদের ‘এমপির লোক’ পরিচয় দিয়ে ব্রিজের নিচে কাঠের কপাট ও বালির বস্তা দিয়ে নিষ্কাশন মুখটি বন্ধ করে দেন। এর ফলে পদ্মার পানি নদীর তলে চলে গেলেও বিলের পানি আর নামতে পারেনি।
এলাকার কৃষক সবেদ আলী ও মামুন আলীসহ বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, তারা বিলে আউশ ও আমন চাষ করেন। কিছুটা পানি জমলেও তাতে ধানের ক্ষতি হয় না। কিন্তু এবার স্থানীয় কিছু নেতা নিষ্কাশন মুখটি বন্ধ করে দিয়ে পানি আটকে রেখেছেন। এতে গত দেড় মাস ধরে পানি আটকে থাকায় ধানেরও ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক।
ধান পেকে গেলেও পানি থাকায় ধান কাটতে সমস্যা হচ্ছে। এখন আওয়ামী লীগ দলীয় এমপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদা না পাওয়ায় নিষ্কাশন মুখটি খুলতে দিচ্ছেন না। ফলে এসব জমিতে এখনো পানি জমে আছে।
পানি নেমে যাওয়ার পর যেসব কৃষক বিলের মধ্যে বোরো ধান, পেঁয়াজ, গম, আলুসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষের পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। কিন্তু এখন তারা চরম বিপাকে পড়েছেন।
বিল এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বিলের প্রায় হাজার একর এলাকাজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বন্ধ নিষ্কাশন মুখটি খুলে দিলে একঘণ্টার মধ্যে বিলের সব পানি পদ্মায় নেমে যাবে। কিন্তু প্রভাবশালীরা বলছেন, তারা চাঁদা না পেলে গেট খুলতেই দেবেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিলের একজন ইটভাটা মালিক জানান, এই বিলের মধ্যে চারটি ইটভাটা রয়েছে। এসব ভাটাতে কয়েক হাজার মানুষ কাজ করেন। নেতারা এসব ইটাভাটা মালিকদের কাছ থেকেও কয়েক লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেছেন। ভাটা এলাকাগুলো পানিতে ডুবে থাকায় তারাও কাজ শুরু করতে পারছেন না।
জিয়া ইকো ব্রিকস নামের একটি স্বয়ংক্রিয় ভাটার একজন কর্মকর্তা জানান, কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে তারা ভাটাটি করেছেন। এখানে বিদেশি টেকনিশিয়ানও আছেন। মৌসুম শুরু হলেও তারা কাজই শুরু করতে পারছেন না পানি জমে থাকায়। এতে তাদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে কৃষকরা জানিয়েছেন, এর আগেও এসব নেতা কৃষক ও ভাটা মালিকদের জিম্মি করে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিলেন। এবারও তারা সেই একই উদ্দেশে গত দেড় মাস ধরে বিলের পানি আটকে রেখে চাঁদার জন্য চাপ দিচ্ছেন। পানি না বের হলে কয়েকশ’ কৃষক চাষাবাদ থেকে বঞ্চিত হবেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাটিকাটা ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বাদরুল আলম টকেন বলেন, ‘বিলে মাছ থাকায় আমরা পানিটা আটকে রেখেছি। নিলাম দিয়ে যে টাকাটা পাওয়া যাবে, তা দিয়ে স্থানীয় মসজিদ মাদ্রাসার উন্নয়ন করা হবে।’
তিনি চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, পানি আটকে থাকায় এলাকার কৃষকদের ক্ষতি হচ্ছে। স্থানীয় সাংসদের অনুমতি নিয়েই তারা পানি আটকে রেখেছেন বলে দাবি করেন।
তবে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘আমি কাউকে পানি আটকে রাখতে বলিনি। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে এর সত্যতা পেলে সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

