ঢাকাTuesday , 8 March 2016
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘উত্তরাধিকার সম্পত্তি’তে বঞ্চিত নারী

Link Copied!

nariবিশেষ প্রতিবেদক : আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। বাংলাদেশের সাংবিধানিকভাবে নারীদের সমান অধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু সংবিধান রচনার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার।
সংবিধানের ৭(২) ধারায় ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহা হইলে সেটা আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে’ বলা হলেও উত্তরাধিকার সম্পত্তি আইনে ধর্মীয় আইনই বহাল আছে।
সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন ধর্মীয় আইন পরিবর্তন করা হলেও মুসলিম সমাজে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তির ক্ষেত্রে হানাফি আইন অনুসরণ করা হয়। কিন্তু হিন্দু, বৌদ্ধ এবং বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠী সমাজে ‘উত্তরাধিকার সম্পত্তি’ আইন বহাল রয়েছে। শুধুমাত্র খ্রিষ্টান আইনে ‘উত্তরাধিকার সম্পত্তি’তে নারীর সমান অধিকার দেয়া হলেও অন্য ধর্মের ক্ষেত্র উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে এখনও সমান অধিকার নিশ্চিত হয়নি।
জানা যায়, ২০১১ সালের ৭ মার্চ সংবিধানের ধারা তোয়াক্কা না করে এবং ১৯৯৭ সালে প্রণীত নারীনীতি থেকে সরে এসে ‘উত্তরাধিকার এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তিতে নারীর সম-অধিকার’র বিধান রেখে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার খসড়া অনুমোদন দিয়েছিলেন মন্ত্রিসভা। অনুমোদিত নীতিমালায় নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ (সিডও) সনদ বাস্তবায়নসহ ১৯৯৭ সালের প্রায় সবকটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে প্রণীত নীতিমালায় বলা হয়, ‘নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জরুরি বিষয়াদি, যেমন- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জীবনব্যাপী শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, উপার্জনের সুযোগ, উত্তরাধিকার, সম্পদ, ঋণ-প্রযুক্তি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদসহ ভূমির ওপর অধিকার ইত্যাদির ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ ও সমান সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়া এবং সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।’
পরবর্তীতে ২০০৪ সালে তৎকালীন চার দলীয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার উক্ত নীতিমালায় ‘উত্তরাধিকার’, ‘সম্পদ’ এবং ‘ভূমির ওপর অধিকার’ কথাটি বাদ দিয়ে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০০৪’ প্রণয়ন করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৯৯৭ ও ২০০৪ সালের নীতিমালার আলোকে ’উত্তরাধিকার’ এবং ‘ভূমির ওপর নারীর অধিকার’ শব্দগুলো বাদ দিয়ে ‘বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নারীর সমান সুযোগ’ কথাটি যোগ করে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০০৮ ঘোষণা করে।
নারীনীতি সম্পর্কে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিপ্লবী নারী সংহতির সমন্বয়ক শ্যামলী শীল বলেন, ‘নারীনীতিতে নারীর অধিকার নিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। নারীনীতি ২০১১ তে উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে সমান অধিকার না দিয়ে, ‘উত্তরাধিকার’ সূত্রে পাওয়া এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তিতে সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। যা নারীর প্রতি চরম বৈষম্য। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ দলিল ‘সিডো আইন’র যেসব ধারা ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলোকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ ২০১১ নারীনীতিতে স্বাক্ষর করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শুধুমাত্র সম্পত্তির ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন প্রচলন রয়েছে। অন্য সকল ক্ষেত্রে (দণ্ড, ভোটাধিকার ইত্যাদি) আদালতের আইন বহাল আছে। ইরাক, সোমালিয়া বা ভারতে ধর্মীয় আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে সম্পত্তির ক্ষেত্রে নরীদের সমান অধিকার দেয়া হয়েছে। সংবিধানে যেখানে নারীর সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে, সেখানে ধর্মীয় বিধান রাখা এক প্রকার সংবিধানকেই অবমূল্যায়ন করা।’
সাংবিধানিকভাবে সমান অধিকারের কথা বলা হলেও উত্তরাধিকার সম্পত্তির ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন অনুসরণের প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জেলিনা সুলতানা বলেন, ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যের উদাহরণ হচ্ছে- উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীদের সমান অধিকার না দেয়া। সংবিধানে যেখানে অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্য সব আইন বাতিল করা হবে, সেখানে শুধুমাত্র উত্তরাধিকার সম্পত্তির ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন বহাল রেখে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের স্বার্থই উদ্ধার করা হচ্ছে।’
ধর্মীয় বিধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক ধর্মীয় বিধান পরিবর্তন করা হয়েছে। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে ১৯৩৭ সালে প্রণীত ‘মুসলিম আইন উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে দাদা বা নানার আগে যদি বাবা/মা মারা যান তাহলে দাদার বা নানার সম্পত্তি বাবার অন্য ভাইয়েরা ভোগ করতো। কিন্তু যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে ১৯৬১ সালে সে আইন পরিবর্তন করে বাবা/মা মারা গেলেও তার উত্তরাধিকাররা সম্পত্তির মালিক হওয়ার বিধান করা হয়েছে। তখন কোনো বাধা ছিল না। কারণ, সেখানে পুরুষের স্বার্থ উদ্ধার হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘১৯৬১ সালের মুসলিম আইনে পুরুষের চার বিবাহের ব্যাপারটি পরিবর্তন করে সালিশ পরিষদের সম্মতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে জেল-জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। স্বামীর মত স্ত্রীকেও তালাক দেবার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বিবাহের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিধি লঙ্ঘনকারীর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কমপক্ষে তিনবার তালাক না হলে হিল্লাহ বিয়েকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্বামী দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকলে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিয়ে পুনরায় বিয়ে করতে পারবে না। তবে ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন পরিবর্তন করে ‘কোনো ব্যক্তি চার বছর নিখোঁজ’ থাকলে স্ত্রী স্বামীকে আদালতের মাধ্যমে তালাক দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র উত্তরাধিকার সম্পত্তির ক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকারের কথা বললে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মাথা নষ্ট হয়ে যায়।’
জবির এই সহকারী অধ্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সংবিধানের ২৮নং ধারায় উল্লেখ আছে যে, ‘ধর্ম, গোষ্ঠি, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণেও কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না এবং রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবেন’। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটা হচ্ছে। সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে ধর্মীয় আইন পরিবর্তন হলেও উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সম্পূর্ণভাবে ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।’