কুষ্টিয়া প্রতিনিধি : কুষ্টিয়ার গড়াই নদীকে সচল করতে শতশত কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও পুরোপুরি সুফল মিলছে না। টানা ড্রেজিং চালিয়েও গড়াইকে বাগে আনা যাচ্ছে না। ফলে বছরের প্রায় অর্ধেক সময়ই পানি প্রবাহ অস্বাভাবিক ভাবে কমে যাচ্ছে।নভেম্বর মাসের পর উৎস মুখ থেকে নদীতে পানি প্রবাহ একেবারেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর এ জন্য অপরিকল্পিত ড্রেজিংকে দায়ী করেছেন পানি বিশেষজ্ঞসহ নদী পাড়ের মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তারা দাবি করছে, বিপুল অর্থের এই প্রকল্পের সুফল জনগণ ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে। গড়াই এর পানি সরবরাহের ফলে দক্ষিণাঞ্চলের পানির লবণাক্ততা অনেকাংশে কমতে শুরু করেছে যা সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
পরিবেশগত দিক থেকে পদ্মার প্রধান শাখা নদী গড়াইকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর ও মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া এলাকায় পদ্মা থেকে গড়াই উৎস মুখ শুরু হয়েছে। গত দেড় যুগ আগেই পলি ও বিপুল বালু জমে গড়াই নদীতে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
নদীকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালে সর্ব প্রথম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গড়াই নদীর মুখে মাটি কেটে পরীক্ষামূলক নদী খননের কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। কিছু দিনের মধ্যই বৃষ্টির পানিতে মাটি ও বালুতে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় ওই কাজে আর কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতে ওই সময় বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হয় যা পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে।
পরের বছর ১৯৯৮ সালে এ নদী পুনরুদ্ধারের লক্ষে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়। নেদারল্যান্ডের জিআরসি কোম্পানির মাধ্যমে জোরেশোরে এ কাজটি শুরু হলে এলাকাবাসীর মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তখন হরিপুর অংশে ড্রেজিংয়ের মাটি ও বালু ফেলে মহানগরের ট্যাগে নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি দিয়ে একটি দৃষ্টি নন্দন সবুজে ঘেরা সুন্দর পার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। বর্তমান মহানগরের টেকের সেই পার্কটিসহ আশেপাশের বিপুল জমি ভাঙনে নদীগর্ভে চলে গেছে।
জিআরসির কাজ শেষ হওয়ার পরের বছর থেকেই আবারো মরুকরনের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গড়াই নদীর মুখে বিশাল বালুরাশি জমে যাওয়ায় গড়াই নদী একেবারে মরাখালে পরিণত হতে থাকে। এর বড় প্রভাব পড়তে শুরু করে দক্ষিণাঞ্চলের নদী এবং সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র্যের উপর।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গড়াই নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, এলাকার খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা, সুন্দরবন এলাকার লবনাক্ত দূরীকরণ, দক্ষিণাঞ্চলের মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি, সেচ সহযোগিতা প্রদান, মৎস্য চাষ সুবিধা, সুন্দরবনের বৃক্ষরাজির উৎপাদন বৃদ্ধি, কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর যশোর ও খুলনা এলাকাকে মরুকরণের হাত থেকে রক্ষাসহ আরো বেশ কয়েকটি মহৎ লক্ষ্য নিয়ে ২০১০-১১ অর্থ বছর থেকে ৪ বছর মেয়াদী বৃহত্তর আকারের ড্রেজিং করতে ‘গড়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প-২’ প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৪২কোটি টাকা।
এ প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর মুখ থেকে শুরু হয়ে কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়ন অফিস পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ৪০ মিটার প্রস্থ গড়াই নদীর ৯৩ লাখ ঘন মিটার মাটি খনন করা করা হয়। এ প্রকল্পে পানি উন্নয়ন বোর্ড খনন কাজ অব্যাহত রাখতে পদ্মা ও গড়াই নামে ২টি ড্রেজার মেশিন ক্রয় করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জমা দেয়ার আগেই এই ২টি ড্রেজার মেশিন নিয়ে কেলেংকারীর ঘটনাও ঘটে। ফলে তৎকালীন পিডি ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে এ প্রকল্প থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। এ বছর দুটি ড্রেজার প্রায় ১ মাস নষ্ট হয়ে পড়েছিল। যার কারণে গোটা সময় খনন কাজ বন্ধ রাখা হয়।
গত বছর ভেড়ামারা সাব ডিবিশনকে খনন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। ব্যয় ধরা হয় ২৩ কোটি টাকা। একাজে ব্যাপক লুটপাট হয়। এ বছর ভেড়ামারাকে বাদ দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মানিকগঞ্জ সাব ডিভিশনকে খনন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। তবে তারা ব্যর্থ বলে দাবি করে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, মানিকগঞ্জ সাব ডিভিশন ঠিকমত খনন কাজ চালাতে ব্যর্থ। প্রায় দেড় মাস তারা খনন কাজ বন্ধ রেখেছিল। প্রকল্পে লুটপাট চলছে।
মানিকগঞ্জ সাব ডিভিশনের প্রকৌশলী শামীম আহমেদ অবশ্য বলেন, ‘দুটি ড্রেজারে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। যার কারণে সংস্কার কাজ করতে হয়েছে। এ সময় খনন কাজ বন্ধ ছিল। খনন কাজ ফের শুরু হয়ে বলে দাবি করেন তিনি। ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা সম্ভব হবে না।’
গত সপ্তাহ খানেক আগে গড়াই নদীর জুগিয়া অংশে গিয়ে দেখা যায় ড্রেজারটি অলস পড়ে আছে। খনন কাজ বন্ধ। ড্রেজারের কর্মচারীরা জানান, গত এক মাস ধরে খনন কাজ বন্ধ রয়েছে। তেলও শেষ হয়ে গেছে। ড্রেজারের ড্রাইভার জানান, দু’এক দিনের মধ্যে কাজ শুরু হবে।
খনন কাজের দায়িত্বরত নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এ বছর তারা খনন কাজ শুরু হয়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার খনন কাজ হয়েছে। ২৩ কিলোমিটার খননের টার্গেট রয়েছে। ড্রেজার নষ্ট না হলে কাজের আরও অগ্রগতি হতো। মার্চের মধ্যে খনন কাজ শেষ করতে পারব বলে মনে করছি। নদী পাড়ের বাসিন্দা শাহজাহান ও সালাম জানান, নদীতে পানি নেই এটাই বাস্তবতা। খননের পর যদি তিন মাস পানিই না থাকে তাহলে খুঁড়ে লাভ কোথায়? আমরাতো পানি পাচ্ছি না।
ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও খনন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী বলেন, ‘প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। অথচ নদীতে পানি থাকে না। যত টাকা নদীতে ঢালা হয়ে তাতে বিফলে গেছে। খনন করে বালু নদী পাড়েই রাখা হচ্ছে। বৃষ্টিতে সেই বালি নদীতে পড়ে আগের রূপে ফিরে যাচ্ছে। অনিয়ম ও দুর্নীতিরও নানা তথ্য পাওয়া গেছে বিভিন্ন সময়। এ বছর উৎস মুখ থেকে জিকে এলাকা পর্যন্ত পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। পানি প্রবাহ নেই। বন্ধ রয়েছে নৌকা ও ট্রলার চলাচল। নদীর উপর বাঁশের সাঁকো তৈরি করে পারাপার হচ্ছে লোকজন।
পরিবেশ ও পানি নিয়ে কাজ করেন গৌতম কুমার রায়। কথা হলে জানান, ‘যেভাবে ড্রেজিং চলছে তাতে গড়াইকে পুরোপুরো প্রবাহমান করা কঠিন।’ প্রতি বছর উজান থেকে প্রচুর পলি আসছে। যার বড় একটি অংশ গড়াই নদীর উৎস মুখ থেকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে জমছে। এ কারনে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
খনন কাজের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নৈমুল ইসলাম জানান, মানিকগঞ্জ সাব ডিভিশন খনন কাজ করছে। মূল কাজ তারা করছে। আমরা শুধু তদারকি করছি মাত্র। খনন কাজে অগ্রগতি কম। কেন তারা পারছে না এ প্রশ্নের উত্তর তারাই দিতে পারবে। প্রয়োজনে তাদের মুখোমুখি হয়ে আপনাদের সঙ্গে কথা বলব। তথ্য দিতে পারব।

