বাগেরহাট প্রতিনিধি : ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনজুড়ে এখন চলছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল, চিত্রল হরিণসহ বন্য প্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও খাল জরিপের কাজ।
সুন্দরবনের বাঘ প্রকল্পের আওতায় ইউএসএআইডি ও বন বিভাগের ওয়াইল্ড টিমের বিশেষজ্ঞরা ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে সরেজমিনে জীববৈচিত্র্যসহ বন্য প্রাণী ও খালের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জরিপ ও গণনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এসব জরিপ ও গণনার কাজে ইউএসএআইডি ব্যয় করছে ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। জরিপের কাজ আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি শেষ হবে। খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক (সিএফ) জহির উদ্দিন আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের মোট আয়তন স্থলভাগের পরিমাণ ৪ হাজার ১৪৩ বর্গকিলোমিটার, যা সমগ্র সুন্দরবনের ৬৮.৮৫ ভাগ। এই ম্যানগ্রোভ বনের প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরীসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড রয়েছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ, মায়া হরিণ, বন্য শূকর, উদবিড়াল, বনমোরগ, বানরসহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্য প্রাণীর বৃহত্তম আবাসভূমিতে আরো রয়েছে তিন শতাধিক প্রজাতির পাখি।
অন্যদিকে ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার বা সমগ্র সুন্দরবনের ৩১.১৫ ভাগ এলাকাই হচ্ছে নদী-খাল। এই জলভাগে রয়েছে ছোট-বড় প্রায় সাড়ে ৪০০ নদ-নদী ও খাল। সুন্দরবনের বিশাল এই জলভাগে মৎস্যসম্পদের মধ্যে রয়েছে রূপালী ইলিশসহ ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৬ প্রজাতির চিংড়ি, বিশ্বখ্যাত শিলা কাঁকড়াসহ ১৩ প্রজাতির কাঁকড়া, এক প্রজাতির লবষ্টার ও ৪২ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক। রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতীসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন, কচ্ছপ, গুইসাপ, লোনা পানির কুমির, হাঙর ও অজগরসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ।
এসব বন্য প্রাণী, জীববৈচিত্র্যের মধ্যে সুন্দরবনের প্রকৃতির পাহারাদার রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জরিপ বা গণনার কাজ শেষ হয়েছে। সর্বাধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে ওই বাঘ জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা চার শতাধিক থেকে কমে আশঙ্কাজনক হারে এসে দাঁড়ায় মাত্র ১০৬টিতে। এ নিয়ে সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মধ্যে শুরু হয় তোলপাড়। এরই প্রেক্ষাপটে বাঘ কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে বাঘের আবাসন্থল ও চলাচলের গতিপথ, হরিণসহ বন্য প্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও খালের সঠিক সংখ্যা ও বর্তমান অবস্থা হালনাগাদ জানতে ইউএসএআইডি ও বন বিভাগ সুন্দরবনে জরিপ বা গণনার কাজ শুরু করেছে।
সুন্দরবনের বন্য প্রাণী বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) জহিদুল কবির বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের জরিপের পাশাপাশি এই বনের খালগুলো গণনাসহ হালনাগাদ প্রকৃত অবস্থা জানতে জরিপ শুরু হয়েছে। সুন্দরবনের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার নদ-নদী ও খাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।’
তিনি বলেন, ‘সমুদ্রের পলিবাহিত জোয়ারের পানির পলিমাটি জমে সুন্দরবনের খালগুলোর বর্তমান অবস্থা কোন পর্যায়ে রয়েছে, হালনাগাদ সেসব তথ্য জানতে এই ম্যানগ্রোভ বনজুড়ে সরেজমিনে জরিপ ও গণনার কাজ পাশাপাশি চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
এ ছাড়া বিগত বছরগুলোতে সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগর উপকূলজুড়ে বিশাল বিশাল চর জেগে ওঠার পর প্রাকৃতিকভাবে সেখানে ম্যানগ্রোভ বনের সৃষ্টি হয়েছে। এসব নতুন বন এলাকায়ও প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন খাল। এসব খাল রয়ে গেছে হিসাবের বাইরে। এসব বিষয়কে সামনে রেখে সুন্দরবনের বাঘ প্রকল্পের আওতায় গত ২০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল, চিত্রল হরিণসহ বন্য প্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও খাল গণনা ও জরিপের কাজ। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি এসব জরিপ বা গণনার কাজ শেষ হবে বলে জানান তিনি।

