নিজস্ব প্রতিবেদক : ৩০ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাচন। তাই ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে সারাদেশের জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বই পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। কিন্তু শনিবার সে অবস্থান থেকে সরে ২৮ ডিসেম্বর রাত ১২টার মধ্যে বই পৌঁছে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাথমিকের প্রায় ৩ কোটি বই এখনো তৈরিই হয়নি। সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া, পৌর নির্বাচন ও রিজার্ভ ডে না থাকায় নতুন করে জটিলতায় পড়েছে গত চার বছর ধরে নিয়মিত বই উৎসব।
প্রাথমিকের বই প্রস্তুত না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর ড. মিয়া ইনামুল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রাথমিকের বইয়ের কভার তৈরি করা হয় আর্টকাট পেপার দিয়ে। যার বেশির ভাগ আমদানি করতে হয়। কিছু দেশীয় বাজার থেকে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। প্রাথমিকের প্রায় ৭০ ভাগ বই পৌঁছে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলে। বাকি ৩০ ভাগের মধ্যে ৩ ভাগ হচ্ছে আমাদের আপদকালীন রিজার্ভ। বাদবাকি ২৭ ভাগ বইয়ের ইনার, কাভার তৈরি হয়ে গেছে। এখন শুধু মুদ্রণ শেষ হলেই পেস্টিং করে বই পৌঁছে দেয়া হবে।’
বই ছাপানো সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখের ওপরে বই ছাপানোর কাজ চলছে। যে সময় আছে তাতে ২৮ ডিসেম্বরের আগেই বই ছাপানোর কাজ শেষ হবে। ছাপা শেষ হলে একরাতের মধ্যেই সারাদেশে বাকি বইগুলো আমরা পৌঁছে দিতে পারবো।’
বিশ্বব্যাংকের খামখেয়ালির কারণে এবার রিজার্ভ ডে নেই বলে অভিযোগ করেছেন ড. মিয়া ইনামুল হক সিদ্দিকী।
তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে বিশ্বব্যাংকের নানা রকম তাল-বাহানার কারণে নির্ধারিত সময়ে চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। চুক্তি বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় এবার রিজার্ভ ডে রাখার সুযোগ পাইনি আমরা। প্রথমে ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে সারাদেশে বই পৌঁছে দেয়ার দিন ধার্য করলেও এখন কার্যত প্রাইমারির সব বই প্রস্তুত না হয়ায় এটা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা আশা করছি, ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে সারাদেশে বই পৌঁছে দিতে পারবো।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ডিসেম্বরের শেষের দিকে অতিমাত্রায় শৈত্যপ্রবাহ থাকতে পারে। সাধারণত শৈত্য প্রবাহের কারণে সৃষ্ট কুয়াশা ও কনকনে ঠাণ্ডার কারণে ঘর থেকেই বের হওয়া দুঃসাধ্য! যানবাহন অচল দাঁড়িয়ে থাকে। এমন পরিস্থিতে কীভাবে বই পৌঁছে দেয়া হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মিয়া ইনামুল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ২২ ডিসেম্বর আমরা বসে এ বিষয়ে আলোচনা করবো। আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
পৌর নির্বাচন চলাকালীন প্রত্যন্ত অঞ্চলে বই পৌঁছে দেয়া কতটা সহজ হবে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. ইনামুল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘পৌর নির্বাচনে উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অফিসারদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কাজেই এ সময়টাতে তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বই পৌঁছে দেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকবেন।’
মাধ্যমিক ও প্রাক-প্রাইমারির প্রায় ৯৪ শতাংশ ও প্রাথমিকের প্রায় ৭০ শতাংশ বই জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে পৌঁছানো হয়েছে বলে দাবি করেন ড. ইনামুল হক সিদ্দিকী।
২০১৬ সালে মাধ্যমিকের জন্য প্রায় ২১ কোটি ৯২ লাখ, প্রাথমিকের জন্য প্রায় ১০ কোটি ও প্রাক-প্রাথমিকের জন্য প্রায় ৬৬ লাখসহ মোট ৩৫ কোটি বই ছাপানোর পরিকল্পনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংকের ঝামেলা মিটে গেলেও কর্ণফুলি সময়মতো কাগজ না দিয়ে নতুন সঙ্কট তৈরি করেছিলো। গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্ধিত দামের দোহাই দিয়ে মেট্রিকটন প্রতি ৫ হাজার টাকা বাড়িয়েও নেয় রাষ্ট্রয়াত্ব এ কাগজ কলটি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মেট্রিকটন কাগজ ৬৪ হাজার টাকায় ক্রয় করলেও কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম) থেকে ক্রয় করতে হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার টাকায়।
কর্ণফুলীর দেখাদেখি ২২টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানও গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্ধিত দামের দোহাই তোলে। চুক্তির বাইরে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দাবি করে তারা এনসিটিবিকে চিঠি দেয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. ইনামুল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘কর্ণফুলী সরকারি কাগজ মিল। সরকার রাষ্ট্রয়াত্ব প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে কোনো ধরনের ভর্তুকি দিতে পারে।’
২২টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাদের দাবি চুক্তি ও আইন বহির্ভূত। তারপরও আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে চিঠি পাঠিয়েছি। এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেভাবে বিবেচনা করবে বিষয়টি সেভাবে সুরাহা হবে।
উল্লেখ্য, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী এবং জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার ফল আগামী ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশ করা হবে। সেদিনই গণভবনে ২০১৬ সালের নতুন বইয়ের উৎসব উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রীতি অনুযায়ী কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ উৎসবরে উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
২০১০ সাল থেকে ১ জানুয়ারি বই উৎসব প্রচলিত থাকলেও এবার বছরের প্রথম দিন শুক্রবার হওয়ায় ২ জানুয়ারী নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত ন্যাশনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে বই উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।

