নিজস্ব প্রতিবেদক : ওরা আন্তঃজেলা ‘সাংবাদিক’। দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে জেলা থেকে জেলায় ছুটে বেড়ান তারা। দুর্নীতিগ্রস্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরই থাকে তাদের টার্গেট। না, ওনারা কোনো সংবাদের পেছনে ছুটেন না। ওনারা ছুটেন ‘অন্যকিছু’র পেছনে। তারা নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো গণমাধ্যমের সাথেই নেই সম্পর্ক। কখনো কোনো সংবাদও লিখেন না তারা। তবে তাদের হাবভাব, ভাবভঙ্গী, হুমকি-ধমকিতে তটস্থ থাকেন দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি-বেসরকারি লোকজন। পেশাদার সাংবাদিকদের মতো এদেরও আছে ‘প্রেসক্লাব’। ভুয়া পুলিশ, র্যাব, ডিবি কিংবা ভুয়া চিকিৎসকদের মতো এরাও ভুয়া সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত।
এদের মধ্যে কেউ যৌনকর্মীদের দালাল, কেউ কেরোসিন বিক্রেতা, কেউ মানবপাচরকারী, কেউ পুলিশের সোর্স। তবে অধিকাংশেরই নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। শুধু ‘সাংবাদিকতার’ আড়ালে প্রতারণাই যেন এদের পেশা। এরা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলবেঁধে হানা দেয়।
পেশাদার সাংবাদিকদের মতো এদেরও থাকে বিভিন্ন সোর্স। তার মাধ্যমেই এরা ওইসব প্রতিষ্ঠান কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তির দুর্নীতি সম্পর্কিত কিছু তথ্য সংগ্রহ করে। পরে ওইসব তথ্যের ভিত্তিতে হানা দেয় সেখানে। আর সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেয় মোটা অঙ্কের অর্থ।
বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের ভুয়া সাংবাদিককে পুলিশ আটকও করেছে। কিন্তু তারপরও থেমে নেই এদের তৎপরতা। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের একটি ভুয়া সাংবাদিক গ্রুপকে আটকের পর বেরিয়ে আসে অভিনব কিছু প্রতারণার কথা।
গত ১৫ সেপ্টম্বর ফরিদপুরের নর্থ চ্যানেল ভূমি অফিসের কর্মচারীরা এরকম চার ভুয়া সাংবাদিককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। এদের কাছ থেকে একটি প্রাইভেটকার, বিভিন্ন পত্রিকার বেশকিছু ভুয়া পরিচয়পত্র ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এরা পুলিশকে জানায়, তারা মাসে একাধিকবার ঢাকা থেকে প্রাইভেটকার ভাড়া নিয়ে কয়েকজন মিলে নির্দিষ্ট কোনো জেলাকে টার্গেট করে বেরিয়ে পড়ে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে সরকারি ভূমি অফিস, বিআরটিএ অফিস, পাসপোর্ট অফিসসহ সরকারি এমন সব প্রতিষ্ঠান যেখানে ঘুষের লেনদেন হয়। সেখানে গিয়ে তারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি-ধমকি দিয়ে দুর্নীতির তথ্য পত্রিকায় প্রকাশ করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা নিয়ে সটকে পড়তো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে এরকম বেশকিছু ভুয়া সাংবাদিক আছে। এদের মধ্য কয়েকজনের পরিচয়ও পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে ভুয়া সাংবাদিকদের একটি প্রেসক্লাবের সন্ধানও।
ফরিদপুরে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে আটককৃত রিয়াদুল ইসলাম কখনো কোনো পত্রিকায় কাজ করেননি। তবে তিনি নিজেকে দৈনিক স্বাধীন সংবাদের রিপোর্টার হিসেবে পরিচয় দেন। একই ঘটনায় আটক সোহেল সালাউদ্দিন বাংলাদেশ টু-ডে পত্রিকার বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি হিসেবে ফ্রিল্যান্সার কাজ করলেও তিনি সব জায়গায় নিজেকে সাংবাদিক হিসেবেই পরিচয় দেন। এছাড়া তিনি জুরাইন প্রেস ক্লাবের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবেও পুলিশের কাছে পরিচয় দেন। ওই ঘটনায় আটক মাহমুদ হোসেন একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা পারসনের সহযোগী হিসেবে কিছুদিন কাজ করলেও তিনিও নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি করছেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, দনিয়া, ডেমরা, সানারপাড়, মাতুয়াইল, জুরাইন ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ভুয়া সাংবাদিকদের রয়েছে বেশ কয়েকটি গ্রুপ। এসব প্রতিটি গ্রুপই একই কায়দায় প্রাইভেটকার কিংবা মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ঘুরে সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি করছে।
নারায়ণগঞ্জ সানারপাড়ে জামাল নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছেন বলে অভিযোগ আছে। এই জামাল মূলত যৌনকর্মীদের দালাল হিসেবেই এলাকায় পরিচিত। মাতুয়াইল এলাকায় তানভীর নামে আরেকজন ভুয়া সাংবাদিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ফার্মগেট এলাকায় মাহমুদ নামে এক ভুয়া সাংবাদিককে র্যাব-২ এর একটি দল চলতি বছরের মার্চে আটক করে। গতবছর যাত্রাবাড়ী এলাকায় জীবন খান নামে এরকম এক ভুয়া সাংবাদিককে যাত্রাবাড়ী থানাধীন একটি হোটেল থেকে আটক করে পুলিশ।
এসব ভুয়া সাংবাদিকদের রয়েছে প্রেসক্লাবও। এই ‘প্রেসক্লাব’ সাইনবোর্ডও তাদের চাঁদাবাজির একটি হাতিয়ার। এরকমই একটি ‘প্রেসক্লাবের’ সন্ধান পাওয়া গেছে জুরাইনে। ‘জুরাইন প্রেসক্লাব’ নাম দিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রেসক্লাবের সভাপতি সাহেল আহমেদ সোহেল মূলত মোবিল ও কেরোসিন বিক্রেতা। পোস্তগোলায় বিভিন্ন রি-রোলিং মিলের কাচড়া (লোহার বর্জ্য)’র ব্যবসা করেন তিনি। ওই এলাকায় পুলিশের মালিকানাধীন বিভিন্ন পাবলিক পরিবহনের (বাস, টেম্পু) তত্ত্বাবধানও করেন তিনি। কোনো সংবাদ মাধ্যমের সাথে কখনোই এই ব্যক্তির সম্পর্ক ছিল না। এই প্রেসক্লাবের সেক্রেটারি রাসেল একজন কার্টন ব্যবসায়ী। তিনিও কখনো সাংবাদিকতা পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন না। এই প্রেসক্লাবের সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি সদস্যই মূলত ভুয়া সাংবাদিক। এদেরই এক সদস্য চাঁদাবাজি করতে গিয়ে অটক হন ফরিদপুরে।
ভুয়া সাংবাদিকদের প্রসঙ্গে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন, ‘সাংবাদিক ইউনিয়নের পক্ষে এসব ভুয়া সাংবাদিকদের এককভাবে রোধ করার কোনো উপায় বা অধিকার নেই। এজন্য সামাজিক সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এছাড়া সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকেও এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এসব ভুয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আমাদের সহযোগিতা চায় সেক্ষেত্রে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।’

