অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : বহুল প্রতীক্ষিত অষ্টম বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কতটা আনন্দিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকার মনে করছে, এর মাধ্যমে বাড়বে তাদের ক্রয়ক্ষমতা। গতিশীল হবে অর্থনীতির চাকা। তবে এর ফলে বাড়িভাড়া, পণ্যমূল বৃদ্ধির পাশাপাশি আশঙ্কা করা হচ্ছে সরকারি চাকরির নিয়োগে ঘুষবাণিজ্য বৃদ্ধিরও। নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অর্থনীতিবিদরা এমন কথাই বলেছেন।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আমাদের দেশে কোনো একটি উপলক্ষ এলেই স্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যায় বিভিন্ন জিনিসপত্রের। তার ওপর যদি বেতন বৃদ্ধির মতো ঘটনা ঘটে তাহলে তো কথাই নেই, পেয়ে বসবেন ব্যবসায়ীরা। রাতারাতি বাড়িয়ে দিতে চাইবেন পণ্যের দাম। তবে শুধু ব্যবসায়ীরাই নয়, আরও একটি শ্রেণী রয়েছে যারা বেতন বৃদ্ধির ফলে ব্যবসায়ীদের চেয়েও বেশি খুশি হবেন। এরা হচ্ছেন যারা নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা বেশি টাকার সরকারি চাকরি দেয়ার জন্য মোটা অংকের ফায়দা লুটবে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ বিষয়ে জাহঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের দেশে নিয়োগ বাণিজ্য ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। যে কারণে সরকারের কর্মীবাহিনীর মধ্যে অযোগ্য লোকজনে ভরা। এ ধরনের লোক যারা টাকা দিয়ে চাকরি নেয় তারা সবসময় চেষ্টায় থাকে ঘুষ খেয়ে তাদের টাকা পুষিয়ে আনার। এর ফলে কমছে না ঘুষের লেনদেন। দিন দিন এটা বেড়েই চলছে।’
তবে এখন সরকারি চাকরির বেতন বৃদ্ধির ফলে যারা নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত তারাও বড় বড় ফায়দা লোটার চেষ্টায় থাকবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘এতে করে যারা বেশি টাকা দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করবে তারা তো সবসময় অবৈধভাবে বেশি টাকা কামানোয় তৎপর থাকবে- মানে ঘুষের লেনদেনের মাত্রা বেড়ে যাবে। এজন্য সরকার যদি খুব বেশি সাবধানি না হয় তবে নিয়োগে ঘুষ এবং ঘুষ দিয়ে যারা চাকরিতে আসবে তাদেরও ঘুষ খাওয়ার পরিমাণ মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।’
এছাড়া অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নতুন বেতন স্কেল বৃদ্ধির ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। বাড়বে অর্থনীতির গতি। একই সঙ্গে বাজারে এর একটা প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেখানে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। আবার খাদ্য বহির্ভূত কিছু বিষয় যেমন বাড়ি ভাড়া বেড়ে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
সোমবার মন্ত্রিপরিষদে অষ্টম বেতন কাঠামো অনুমোদন হয়। এতে সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার এবং সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা মূল ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারন করা হযেছে। যোগ করা হয়েছে নতুন একটি উৎসব ভাতা। যার ফলে কর্মকর্তারা বৈশাখী ভাতা হিসেবে পাবেন মূল বেতনের ২০ শতাংশ।
এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দেশে ব্যবসায়িরা সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। সরকারের চাকরিজীবীদের বেতন বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে এটাকে পুঁজি করেই তারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। তাতে সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়বে। এখানে শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়েছে, বাড়েনি বেসরকারি চাকরিজীবীদের। সবার বেতন বাড়েনি : এই বিষয়টা আমাদের ব্যবসায়ি ও বাড়িওলারা মাথায় নেবে না। তারা সবসময় নিজেদের মতো সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দেয়ার চিন্তা করে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে।’
তবে ব্যবসায়িরা যাতে পণ্যের দাম অনৈতিকভাবে না বাড়াতে পারে সেদিকে সরকারের সংশ্লিষ্টদের তদারকি বৃদ্ধির পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের জুন থেকে বাস্তবায়ন হবে। সরকার এটা অনুমোদন করেছে তা ভালো। তবে তাতে সরকারের ব্যয় বাড়বে। কিন্তু সরকারের আয় বাড়াতে রজস্ব আহরণে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। তাই আয় বাড়াতে সরকারকে দক্ষলোক ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর কাজ করতে হবে।’
সালেহ উদ্দিন আরও বলেন, ‘দক্ষ জনবল তৈরির চেয়ে বেতন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে সরকার। এতে বুঝা যাচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের খুশি করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো দরকার থাকলেও তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল জনবলকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, দেশের জনগনের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে, অপর দিকে সরকারের উন্নয়নও হয়েছে। সেই হিসেবে বেতন বাড়ানো যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ। তবে বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সমান্তরালভাবে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া উচিৎ বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি পাবলিক সার্ভিসেস অ্যাক্ট অনুমোদনের পরামর্শ দেন। কারণ জনসেবা বাড়াতে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়ানো, তাদের জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা ও সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ বলে তার মত।
বেতন বাড়ানোর প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বেতন বাড়ার ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটা প্রভাব পড়বে এটা স্বাভাবিক। তবে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে মনে করি না।’
তবে বেতন বাড়লেই ব্যবসায়িদের মধ্যে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়ার যে প্রবণতা আছে সে ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া দরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলেও তিনি মনে করেন।
অর্থনীতিবিদ ড. ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ‘আমাদের মূল্যস্ফীতির যে নিম্নমুখি ধারা ছিল, বেতন বৃদ্ধির ফলে তা আর নিম্নমুখি থাকবে না। তবে মূল্যস্ফীতি খুব বেশি বেড়ে যাবে সেটাও না।’
তবে বেতন কাঠামো বৃদ্ধির ফলে সরকারি বেতন কাঠামোর সঙ্গে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতনের যে বৈষম্য ছিল তা কমে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমাদের জাতীয় বাজেট অনেক বড়, সেহেতু এটি বাস্তবায়নে খুব একটা অসুবিধা হবে না।’

