বিশেষ প্রতিবেদক : পানি কূটনীতিতে ব্যর্থতার কারণে অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ। এর বিরূপ প্রভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে দেশের কৃষিব্যবস্থা, জনজীবন, জীববৈচিত্র এবং অর্থনীতি। পানিশূন্য হয়ে উত্তরবঙ্গের ৫০টি নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে নদীনির্ভর জনগোষ্ঠী। মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে আবাদী জমি।
আন্তঃসীমান্ত নদী সমস্যা ও সমাধান বিষয়ে তথ্যানুসন্ধান এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনায় এসব বিষয় জানা গেছে।
সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞরা মোটাদাগে সরকারের উদ্দেশে চারটি আশু করণীয় সম্পর্কে বলেছেন। এগুলো হচ্ছে- পানি কূটনীতি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরো পরিষ্কার করা, আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি ব্যবহারের জন্য সরকারের জোরালো ভূমিকা রাখা, অবিলম্বে জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ সনদে অনুস্বাক্ষর ও আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ ভারতকেও তাতে অনুস্বাক্ষর করাতে রাজি করানো এবং একটি আঞ্চলিক সমন্বিত নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
তারা বলছেন, পানি ভাগাভাগির চুক্তি নয়, ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতার ভিত্তিতে পানি ব্যবহার করতে হবে। তিস্তা চুক্তি হলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, পানি ভাগাভাগির চুক্তি হয় না, পানি ব্যবহারের চুক্তি হতে পারে। বাংলাদেশের উচিত এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে নিজেদের দাবি তুলে ধরা। তাহলে সমুদ্র বিজয়ের মতো আমরা সব নদীর পানির ওপর অধিকার নিশ্চিত করতে পারব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী পানিশূন্য হওয়া বা এগুলোতে পানির প্রবাহ কমার মূল কারণ- ভারত, চীন ও মিয়ানমারে নির্মিত ও নির্মাণাধীন বিভিন্ন ড্যাম, ব্যারেজ এবং সেচ প্রকল্প। দীর্ঘদিনের জনদাবির পরও উজানের দেশগুলো গঙ্গার ওপর ফারাক্কা, তিস্তার উপর গজলডোবাসহ অসংখ্য অবরোধমূলক অবকাঠামো অপসারণ বা নির্মাণ প্রক্রিয়া বাতিল করেনি। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের নদীগুলোর ওপর।
ধারণা করা হচ্ছে, ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বাংলাদেশ। কারণ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৫৭টি ছোট-বড় আন্তর্জাতিক নদী রয়েছে। ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি নদীর মুখ ঘিরে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে ভারত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে এসব নদীর পানি প্রত্যাহার করে নেবে তারা। পাশাপাশি শুকনো মৌসুমে বন্ধ করে দেবে ব্রহ্মপুত্রের পানির প্রবাহ। বাংলাদেশের ৭০ ভাগ পানির উৎসই এই ব্রহ্মপুত্র। তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বিপদে পড়বে বাংলাদেশ।
জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদকে ঘিরে ১২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে ভারত। ৩৩টি রিজার্ভারে পানি ধরে রাখবে তারা।ফলে প্রায় ৫০ লাখ কিউসেক পানিপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্রের মুখে একাধিক ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মাণেরও পরিকল্পণা করছে ভারত। যদিও এজন্য বাংলাদেশকে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে দেশটি।এ দিকে ভারত তিস্তা নদীর পানি সরিয়ে নেওয়ায় এক ভয়ানক পরিণতি হচ্ছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে। যেখানে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ জলের যোগান দেয় তিস্তা নদী। তিস্তা নদীর পানি ব্যবহারের বেলায় জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের কনভেনশনটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এই কনভেনশন বা সনদে ‘অববাহিকা’, ‘পানির অধিকার’, ‘ন্যায্যতার সঙ্গে পানি ব্যবহার’, ‘অববাহিকার অন্তর্ভুক্ত দেশের ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ’, ‘পানি ব্যবহার নিয়ে বিরোধ’, ‘আন্তর্জাতিক আদালত’, ‘পরিবেশ রক্ষা’, ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সনদটি আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানিপ্রবাহ ব্যবহারের একটি মানদণ্ড। এতে অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন বা ব্যবহারের সার্বিক নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো এই সনদে অনুস্বাক্ষর করেনি।
বাংলাদেশ পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ইনামুল হক বলেন, সনদটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়েছে। আইনটিতে ভাটি ও উজানের সব দেশের নদীর ওপর অধিকার, পানির ন্যায্য হিস্যা, নদীর দখল-দূষণ-কাঠামো নির্মান নিয়ন্ত্রণ, নদী উন্নয়ন, নদী নিয়ে অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যকার বিবাদ মীমাংসাসহ সব নদী সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেছে। এ কারণে ভারত-চীন-মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত সব নদীকেন্দ্রিক বিবাদ বা মতভেদ নিরসনে আইনটি বাংলাদেশের নদীর সংকট সমাধানে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, এখনো বাংলাদেশ এই কনভেনশনে সাক্ষর করেনি। অবিলম্বে এই কনভেনশনের স্বাক্ষর করা উচিত। একই সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভারতকেও তাতে অনুস্বাক্ষর করাতে রাজী করানো প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, ভারত একটি আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার মধ্যে তারা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীগুলোর পানি ভারতের পশ্চিমে রাজস্থান ও গুজরাট এবং দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে নিতে চায়। ব্রহ্মপুত্র নদের তিস্তা অববাহিকায় ভারত কয়েক ডজন ড্যাম নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গসহ অনেক অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর প্রভাব পড়বে আমাদের কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার ওপর।
এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিভিন্নভাবে আমাদের নদীগুলো ধ্বংস হচ্ছে। একদিকে ভারত আমাদের নদীগুলোর অস্তিত্ব অস্বীকার করছে। তাদের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে নদীগুলোর উজানে বাঁধ দিয়ে নদীকে ধ্বংস করছে। অপরদিকে আমাদের সরকারও নদীগুলোর উন্নয়নের নামে নদীকে ধ্বংস করছে।
তিনি বলেন, ভৌগলিক কারণে আমাদের একটা সুবিধাজনক অবস্থান রয়েছে। এটা আমাদের কাজে লাগাতে হবে। নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারলে আগামীতে এ দেশের মানুষ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
এ জন্য সরকারের সুচিন্তিত পরিকল্পনার পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের পরামর্শ দেন তিনি।

