নিজস্ব প্রতিবেদক : চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র অন্তু। আধাঘণ্টা ধরে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে, স্কুলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু বাস পেয়েও উঠতে পারছে না, পিঠে বিশাল আকারের স্কুল ব্যাগ। একটু পরপর হাঁপিয়ে উঠছে সে।
তালতলা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে অন্তুকে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেলো- তার চাপা আর্তনাদ, ‘স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী, আমরা কি আর বইতে পারি, এও কি একটা শাস্তি, কষ্ট হয়, কষ্ট হয়, দোহাই পড়ার চাপ কমাও’। তার সঙ্গে ঠিক সময়ে স্কুলে না পৌঁছার আতঙ্ক।
ব্যাগে কী আছে জানতে চাইলে সে জানায়, আটটি বই, ১০টি খাতা, ডায়েরি, জ্যামিতি বক্স, টিফিন বক্স, পানির ফ্ল্যাস্ক ও স্কেল।
সে আরো জানায়, প্রতিদিন তাদের ৫টি বিষয়ের ক্লাস হয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবকিছু তাকে টানতে হয়।
এ আর্তনাদ শুধু অন্তুর নয়, রাজধানীসহ সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাপিয়ে দেয়া এ বোঝা টানতে হয় লাখো শিক্ষার্থীকে। এতে শিশুরা নিজের অজান্তে আক্রান্ত হচ্ছে মেরুদণ্ডের স্থায়ী ক্ষতিসহ নানা ধরনের রোগে।
এদিকে শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, অভিভাবকরা প্রায়ই শিশুদের পিঠে ব্যথা, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর কষ্ট, মেরুদণ্ডের সমস্যা নিয়ে তাদের কাছে আসে। এদের মধ্যে অধিকাংশরই সমস্যার কারণ স্কুলব্যাগের ওজন বেশি। বাংলা-ইংরেজি মাধ্যম, সরকারি-বেসরকারি স্কুলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ ধরনের সমস্যাই বেশি আসে।
এ বিষয়ে অভিভাবকদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানায়, শহরের স্কুলগুলোতে ব্যাগের ওজন বেশি থাকে। কিন্ডারগার্টেন ও নামকরা স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অনেক সময় প্রকাশনা সংস্থাগুলোর যোগসূত্র থাকে। দু’পক্ষ মিলে পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে বাড়তি বই জুড়ে দেয়। স্কুল কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী স্কুল থেকে একটি বিষয়ের জন্য দু-তিনটি খাতাও কিনতে হয়। এগুলো কেনা ও স্কুলে নেয়া দুটোই বাধ্যতামূলক। এর ফলে ব্যাগের ওজন বেড়ে যায়।
সমস্যা আক্রান্ত রোমানা ইসলামের ১০ বছর বয়সী শিশু তাহসিন। মা রোমানা জানান, তাহসিন মাঝে মাঝেই পিঠব্যথায় কাতরায়। কোনো কোনো দিন সেই ব্যথা ঘাড় বা পায়েও ছড়িয়ে পড়ে। পরে চিকিৎসকের কাছে গেলে স্কুলব্যাগের বোঝা কমানোর পরামর্শ দেয়া হয়। তাই বাধ্য হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শের কথা স্কুলের শিক্ষকদের জানানো হয়। এর সমাধান হিসেবে বলে- স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে (রোমানা) বা অন্য কোনো অভিভাবক পর্যন্ত স্কুল ব্যাগ আনতে পারে, স্কুল গেট থেকে নিরাপত্তা কর্মীরা শ্রেণীকক্ষে ব্যাগ পৌঁছে দেবে।
ভুক্তভোগী আরেক অভিভাবক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুল কৃর্তপক্ষ দিনে দিনে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নিজেদের ব্যবসার কারণে প্রতি বিষয়ের জন্য তিন থেকে চারটা বই। প্রতিটি বইয়ের তিনটা করে খাতা। বিশাল আকারের ডায়েরি। এ রকম আরো অনেক কিছু ধরিয়ে দেন। এতে শিশুদের যে ক্ষতি হচ্ছে এ বিষয়ে তারা কখনো চিন্তাও করেন না।’
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন কিন্ডারগার্ডেন ও সরকারি স্কুলের নার্সারি থেকে অষ্টম শ্রেণীতে পড়া শিক্ষার্থীদের ৪ থেকে ৮ কেজি ওজনের স্কুল ব্যাগ বহন করতে। তবে এ ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলো শিক্ষার্থীরা আরো বেশি ওজনের বই খাতা ভর্তি ব্যাগ বহন করে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে স্কুল শিশুদের ব্যাগ বহনে আইন, নীতিমালা প্রণয়নে কেন সরকারকে নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট রুলও জারি করেন। আইন সচিব, শিক্ষা সচিব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, মানবাধিকার কমিশনকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।
এ বিষয়ে রাজধানীর একাধিক স্কুলের শিক্ষকরা জানান, প্রতিদিন ভারী ব্যাগ বহন করা খুবই কষ্টকর। তাই অনেক শিক্ষার্থী মোটা বইগুলো স্কুলে আনতে চায় না। স্কুলের অবকাঠামো সমস্যার কারণে তারা ক্লাসে ঠিকমতো বসা ও খেলাধুলার সুযোগ পায় না। এছাড়া বই সংরক্ষণ করে রাখার কোনো সুযোগ নেই স্কুলগুলোতে।
সরকারিভাবে শুধু নির্দেশনা নয়, সার্বিক সহযোগিতা না করলে এর পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তারা।
মিরপুর ডারল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মোকচ্ছেদুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের একটা অভিযোগ ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর বিরুদ্ধে আছে। তবে আদালত থেকে স্কুল ব্যাগের ওজন কমানোর বিষয়ে রুল জারি হওয়ার পর আমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নিচ্ছি।’
‘আমাদের এখানে শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়ার জন্য নিজস্ব পরিবহন আছে। এছাড়া চালক ও দারোয়ানদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে করে তারা শিক্ষার্থীদের ব্যাগ বহন করে। এ ব্যাপারে অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’ বললেন ওই শিক্ষক।
প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের সহকারী পরিচালক ইন্দু ভূষণ দেব এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বইয়ের তালিকা অনুসরণ করলে এ সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বোর্ডের নির্ধারিত বইয়ের বাইরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অন্য বই ব্যবহার করলে আমরা শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছি।’
ধানমন্ডি গভমেন্ট বয়েজ স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নেওয়াজ রেদওয়ান জানায়, ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রতিদিন তাকে ‘সেফটি’ কিংবা ‘বিকল্প’ পরিবহনে স্কুলে যাতায়ত করতে হয়। ভারী ব্যাগ নিয়ে তার মায়ের সঙ্গে বাসে উঠতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়।
‘বাসে এতো ভীড় থাকে একাই ওঠা যায় না সেখানে বাচ্চা ও ৫-৬ কেজি ওজনের ব্যাগ নিয়ে উঠতে হয়। এতে সময় নষ্ট। বাচ্চাদেরও ব্যাগ বহন করতে কষ্ট হয়’- বললে জানান নেওয়াজের মা মাহবুবা রহমান।
শিশুদের স্কুল ব্যাগের ওজন কতটুকু হওয়া উচিৎ জানতে চাইলে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. বেলাল হোসেন জানান, শিশুকে কখনো তার নিজের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি বোঝা দেয়া যাবে না। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া ছাত্রদের ব্যাগের ওজন হবে এক থেকে সর্বোচ্চ দুই কেজি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর তিন কেজি। পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণীর শিশুদের চার কেজি। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ব্যাগের ওজন হতে পারে সর্বোচ্চ ছয় কেজি।
শিশু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিনের পর দিন ভারী ব্যাগ বহন করেলে শিরদাঁড়ার স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে যায়। চাপ পড়তে পড়তে দুই হাড়ের মাঝখানে নরম পদার্থ শুকিয়ে যায়। এতে দীর্ঘস্থায়ী পিঠে ব্যথা, পিঠ বেঁকে যাওয়া, হাড়ে ফাটল ধরা ও শিশুর বৃদ্ধি কমে যাওয়াসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ বলেন, ‘এ বিষয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকরা ভালো বলতে পারবেন, কেন তারা বাচ্চাদের শিক্ষার বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিষয়টি তারা আলোচনা করে ঠিক করে নিতে পারে। তাদের এ বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে- শিশুদের শিক্ষার বোঝা না বাড়িয়ে শিক্ষার মান বাড়ানোর।’

