এএইচএম নোমান,
‘১৯৭০ এর ১২ নভেম্বর, রামগতি, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, মনপুরা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলাসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ১০ লাখ মানবসন্তানের সলীল সমাধি হয়। অসংখ্য জীবজন্তু, গাছ-গাছালি ক্ষেত খামার ফসলের ধ্বংসযজ্ঞের উপর দাঁড়িয়ে, সমবায় শক্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পাশে এসে, ত্রাণ পুনর্বাসন উন্নয়ন ও মানবাধিকার নিয়ে, ‘ধ্বংস থেকে সৃষ্টির’ প্রেরণা দিয়ে উন্নয়ন রাজনীতি দিয়ে আমার কাজ শুরু। এর ফসলই হলো স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রচনায় হোচট খেয়ে গরীবদের ‘জন্য’ না হয়ে গরীবদের ‘সঙ্গে’ থেকে গরিবী হটানোর লক্ষ্যে এনজিও ডরপ্’র সামাজিক বিনিয়োগ স্বপ্ন’র প্রয়োজনীয়তার অনুধাবন করি। যার গোড়াপত্তন হয় গরীব ‘মা’কে নিয়ে। ২০০৫ সালের বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে বেসরকারি ডরপ্ সংস্থা দেশে প্রথমবারের মত মাতৃত্বকালীন ভাতা বিনিয়োগের উদ্যোগ নেয়। শুধু উদ্যোগই নয়, নিজেরা অনুশীলন করে দেখে এর কার্যকারিতা। দরিদ্র্য মা’দের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতার প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদার কথা উপলব্ধি করে র্ডপ পরবর্তীতে সরকারকে এ ভাতা প্রদান কার্যক্রম চালু করার প্রস্তাব দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২০০৭-০৮ অর্থ বছর থেকে সারা দেশে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ যাবত সকল ইউনিয়নে বছরে গড়ে ২১ জন মা নিয়ে মোট ৩ লক্ষাধিক মায়ের মধ্যে এ ভাতা বিতরণ করা হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্যক্রমটি প্রতিবছর সম্প্রসারিত ও বিস্তৃতি লাভ করছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ও ধীরে। এই মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত মা’দের নিয়েই দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে ২০ বছর এক প্রজন্ম মেয়াদী ১ কোটি গরীব মা ও শিশুদের মৌলিক চাহিদা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গৃহায়ন, জীবিকায়ন, সঞ্চয় ও প্রয়োজনে উন্নয়ন ঋণ নিয়ে ‘Social Assistance Program for Non-Assenters (SAPNA) ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ কার্যক্রম দারিদ্র বিমোচনের একটি দর্শন। এটি একটি তথ্য ও প্রমাণ ভিত্তিক সফল বাস্তব কর্মসূচি। মোট প্রস্তাবিত চাহিদা অনুযায়ী, ১ জন মা-শিশুসহ বিনিয়োগ হবে ১ লাখ টাকা, তাহলে ২০ বছরে ১ কোটি মা’র জন্য বিনিয়োগ হবে মোট দশ হাজার কোটি টাকা (১০ লাখ মিলিয়ন)। যা ৬ বছর সময়সীমায় পদ্মা সেতু নির্মানে ব্যয় বরাদ্দের মাত্র ১৪ গুণ, তাও আবার ২০ বছর মেয়াদে। প্রয়োজন রাজনীতিক ও সরকারকে এগিয়ে আসা। ন্যায্যতা ও সাম্যতার বাংলাদেশের ভীত প্রতিষ্ঠা করা।
গরীব দেশে মানবাধিকার বাস্তবায়নে কোন অন্তরায় নাই। অন্তরায় হলো, গরিবী ও মানবাধিকারকে বিভক্তি দৃষ্টিতে, নীতিতে, আঙ্গিকে, বাস্তবায়নে, পশ্চিমা বা দেশীয় লেজুড়-শোষক ও বণিকের দৃষ্টিতে দেখা। অথচ দারিদ্র ও মানবাধিকার উভয় বিষয়টি অন্তত আমাদের দেশে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দারিদ্র বিমোচনের সঠিক পথ তৈরি করলেই মানবাধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্র তৈরি হবে ও শান্তির পথ বিনির্মান হবে। স্বাধীনতার ঘোষণা, মৌলিক চাহিদা পূরণ করে সামাজিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করে জনগণের ‘আস্থা’ কুড়াতে পারলেই মানবাধিকার রক্ষার অন্তরায়ের গিঁট খুলবে। আর না হয় জটলা থেকেই যাবে। পরগাছারা মানবাধিকার রক্ষার নামে মায়াকান্নার মাধ্যমে সমাজে বিভক্তি রেখে ফায়দা লুটতেই থাকবে। শিয়ালের মুরগি ভাগ চলতেই থাকবে।
বেসরকারি সংস্থা কীভাবে মানবাধিকার রক্ষা করবে? অবশ্য সরকারই এ কাজটি বাস্তবায়ন করতে সচেষ্ট হবে। বেসরকারি সংস্থা শুধু সরকারের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করতে পারে এবং মানবাধিকার রক্ষা ও বাস্তবায়নে পথ, পন্থা ও দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে পারে, পরিপূরকের ভূমিকায় থাকতে পারে। আমরা ন্যায্যতার, সাম্যতার, শোষণহীন, বৈষম্যমুখী ও সমৃদ্ধ স্বনির্ভর বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। প্রকারান্তরে শোষণ, দুর্নীতি ক্ষমতা, সন্ত্রাস, লুটপাট, নীতিহীন, অনাদর্শিক, বঞ্চনা ও ব্যবসায়িক রাজনীতিকতার দিকে গা ভাসিয়ে দেয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত মিছিল বাড়তেই আছে। যা সাধারণেরও কাম্য নয়। বিশ বছর এক প্রজন্ম মেয়াদী একটি উন্নয়ন ও রাজনীতিক যৌথ পথক্রম রচনা করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে শোষণমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে এর বেশি সময় অপেক্ষা করা লাগবে না। দেশ স্বাধীনতার পর বিভিন্ন চড়াই উতরাই পার হয়ে সরকারের ও অসরকারের দৃষ্টান্তমূলক অভিজ্ঞতায় ইতোমধ্যে আমরা সে পথ পেয়ে গেছি, প্রয়োজন শুধু বাস্তবায়নে হাত দেয়া। শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে ‘মাতৃত্বকালীন ভাতাকেন্দ্রিক ২০ বছর মেয়াদী ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ বাস্তবায়ন করতে হবে।
কোন উপজেলা, জেলা বা অঞ্চল নিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন আসে না, তবে ছোট ছোট আঞ্চলিক ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উন্নয়ন ও জনগ্রহণযোগ্য অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি। সামগ্রিকভাবে আমি মানবসম্পদকে ক্ষমতায়ন সচেতনতা ও গণতান্ত্রিক গরীবহীন সমাজ বিকাশে, কাজে-রত ও সমাজ ও দেশ উন্নয়ন পরিকল্পনায় সহযোগিতার কথা বলছি।
দুর্নীতি রোধ শুধু আইন বা ইচ্ছা করলেই হবে না। আমি সর্ব ব্যাপারেই রোগ প্রতিষেধক, প্রতিহত, প্রতিরোধ যা-ই বলি দারিদ্র্যকে কেন্দ্র করেই এর সমাধানের পথ পাওয়ায় বিশ্বাসী। কেননা জাতিকে বা বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠিকে চরিত্রে, সাংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে অর্থবিত্তে শোষণের যাতাকলে রেখে, পরনির্ভরশীলতার দরজা তৈরি করে, রাজা প্রজার ভিন্ন নামে, গোষ্ঠি জাত ক্যাডার সৃষ্টি হয়। দুর্নীতিবাজও ধনী বণিকের হস্তগত অনুগতও লেজুড় হয়ে কাজ করে। এ অবস্থায় গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না, গরিবী হটানো যায় না, ভাল ও ত্যাগি রাজনীতিক নির্বাচনে আসতে পারে না ও নির্বাচিত হয় না। তাই ধনী লুটেরাই বেশিরভাগ ক্ষমতায় আসে। সুতরাং মৌলিকভাবে দারিদ্র্য বিমোচনের এজেন্ডা নিয়ে কাজ করলেই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে, দুর্নীতি রোধ হবে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা হলে; সৎ, ভাল ও ত্যাগী লোকের সরকার গঠন হবে। দেশপ্রেম থাকবে, দেশ ভাল চলবে। দুর্নীতি হানাহানি লুটপাট থাকবে না। সুশাসন নিশ্চিত না হলে এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের বিকল্প উন্নয়ন পথ না দিলে দেশের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের অপর নামই গণতন্ত্র। এর বিকল্প নেই। তত্ত্বাবধায়ক একটি অভিনব ও এডহক পদ্ধতি। যা চিরকাল চলতে পারে না। রাজনৈতিক দলের পরস্পর আস্থাহীনতা এবং রাজনৈতিক উন্নয়ন উপলব্ধির অভাবের কারণেই এ ধরণের একটি এডহক পদ্ধতির জন্ম। যা আপাত স্বস্তির নিয়ামক, দীর্ঘস্থায়ী কলহের ভিত্তি। রাজনৈতিক দলসমূহ তাদের দায়ভার সাধারণ জনগণের উপর চাপিয়ে হানাহানি, সংঘাত ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে, জনগণতন্ত্র চর্চার বদলে সহিংস ক্ষমতার রাজনীতিতে দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। এর দায়ভার রাজনৈতিক দলের, সমাধানের পথ তারাই গ্রহণ বা দিতে বা নিতে হবে। কেননা রাজনীতিকরাই দেশ চালান ও চালাবেন। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বামাসপ প্রস্তাবিত ‘নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক পরিষদ’ এর মধ্যে রয়েছে সকল নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত এবং গ্রহণীয় ফ্রেম। সকলকে তা মানতে হবে। যেমন-নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা ও আইন অনুযায়ী কালো টাকার মালিক, ঋণ খেলাপী, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ এ ধরণের কোন ব্যক্তিকেই মনোনয়ন তালিকায় আনা হবে না। এ পরিষদ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ, স্বাধীন, স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও গতিশীলতায় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। এটি রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন, সুশীল সমাজ, এনজিও ও নেটওয়ার্কসহ সুশাসন বিনির্মাণে গণতন্ত্র চর্চা ও ব্যবহারিকতা আনয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। নীতিগতভাবে এ পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হলে, সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা ও আইনগত দিক বিবেচনান্তে এতে আরো সংযোজন বিয়োজন হতে পারে। এ পরিষদের ব্যয় নির্বাহের প্রয়োজনীয় তহবিল (ফান্ড) নির্বাচন কমিশন প্রদান করবে। অথবা সরকারের অনুমোদনক্রমে দাতাসংস্থা যেমন দি এশিয়া ফাউন্ডেশন, ইউএনডিপি, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য আগ্রহী ফান্ড প্রদানকারী আন্তর্জাতিক বা দেশীয় প্রতিষ্ঠান শর্তহীন তহবিল প্রদান করতে পারে। এ প্রক্রিয়া অবলম্ববন করলেই Togetherness of Development & Politics তৈরি হবে এবং প্রকৃত গণতন্ত্র রচনা হবে। তবেই শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠক

