ড. মো. শাফায়েত হোসেন
তাবলীগ জামাত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে বিশ্বব্যাপী দাওয়াতের কাজ করে যাচ্ছে। এ সংগঠনটির কোনো সংবিধান নেই! লিখিত আইন, বিধি-উপবিধি কিছুই নেই! নেই কোন প্রেস রিলিজ, প্রকাশনা বা প্রচারণা। তারপরও এ আন্দোলন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সুশৃঙ্খল সংগঠন। বিশ্ব ইজতিমা কোন তারিখে অনুষ্ঠিত হবে তাও উল্লেখ করে কোন প্রেস রিলিজ ইস্যু করা হয় না। কোন লিফলেট বা পোস্টার ছাপানো বা মাইকিং করা হয় না। মিছিল-মিটিংয়ের তো প্রশ্নই আসে না। তবুও লাখ লাখ মানুষ নির্ধারিত সময়ে বিশ্ব ইজতিমায় সমবেত হন। এখানে কে বয়ান করছেন, তাঁর নাম পর্যন্ত ঘোষণা দেয়া হয় না। অথচ সবকিছুই চলে সুন্দর-সুশৃঙ্খলভাবে। নিরাপত্তার জন্য কোন বাহিনীরও প্রয়োজন হয় না। তাবলীগ আন্দোলনে ক্ষমতা বা পদমর্যাদার কোন প্রতিযোগিতা নেই, প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নেই; নেতৃত্বের কোন্দল নেই। সকলেই কাজ করেন দ্বীন প্রচার তথা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
কিন্তু সাম্প্রতিকালে তাবলীগ জামাতের বিশ্ব আমির হজরত মাওলানা সা’দ কান্ধলভীকে নিয়ে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে-তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তাবলীগে নেতৃত্ব নিয়ে কখনোই কোন্দল ছিল না বরং মাশোয়ারা বা পরামর্শের ভিত্তিতেই এ কাজ পরিচালিত হয়ে আসছে। ভিন্নমত থাকতেই পারে, যা ইসলামের ইতিহাসেও লক্ষ্য করা যায়। ইসলামে অনেক বিষয়ের উপর একাধিক মতামত বা ব্যাখ্যা রয়েছে, যা নিয়ে কোন তর্ক-বিতর্ক নেই; বরং আলেমদের মতবিরোধ ইসলাম অনুমোদিত। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে প্রশংসিতও। যার কারণে ইসলামে একাধিক মাজহাবের সৃষ্টি হয়েছে। ফলশ্রুতিতে রাসূল (সা.)-এর সকল সুন্নত বিভিন্ন মাজহাবের মাধ্যমে অনুসৃত হচ্ছে এবং ইসলামের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হজরত মাওলানা সা’দ-এর সব মতামত বা ব্যাখ্যা সকলের কাছেই পছন্দ বা গ্রহণযোগ্য হবে-এমন নাও হতে পারে। তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন উঁচুমানের আলেম। তাঁর পান্ডিত্য, বিদ্যা-বুদ্ধির কারণে তার অনুসারীরা তাঁকে অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক অনুসরণ করে আসছেন। সর্বোপরি তিনি তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা মো. ইলিয়াস (রহ.)-এর বংশধর। তিনি গত ২২ বছর ধরে বিশ্ব ইজতিমার মূল আলোচক এবং গত দুই বছর ধরে বিশ্ব ইজতিমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসছেন। জানা গেছে, তাঁর কিছু বক্তব্য নিয়ে আলেম সমাজে মতবিরোধ দেখা দেয়। এ মতবিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজে যাতে কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য তিনি বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। তাঁর বক্তব্যে আস্থাশীল হয়ে ইতোমধ্যে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসার মোহতামিম (অধ্যক্ষ) আল্লামা আবুল কাসেম নোমানী হজরত মাওলানা সা’দকে চিঠি দেন, যা ইতোমধ্যে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। হজরত মাওলানা সা’দ তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করে উদার মানসিকতারই পরিচয় দিয়েছেন। এতে তিনি ছোট হননি, বরং আশা করা যায় তাঁর মর্যাদা আল্লাহর দরবারে আরো বৃদ্ধি পাবে ইনশা-আল্লাহ।
এরপরও হজরত মাওলানা সা’দের বক্তব্যে আপত্তি থাকলে বাংলাদেশের হজরত উলামায়ে কেরামগণের জন্য উত্তম ছিল তাঁর সাথে আলোচনাপূর্বক তাঁর থেকে রুজুনামা নেওয়া। কিন্তু ঘটল বিপরীত! জানা গেছে, কিছুদিন পূর্বে হজরত মাওলানা সা’দের নেতৃত্ব ঠেকাতে বিকল্প হিসেবে পাকিস্তানভিত্তিক একটি ‘আলমি (বিশ্ব) শুরা’ গঠন করা হয়, যা বাস্তবায়ন করার জন্য বাংলাদেশ তাবলীগ জামাতের কয়েকজন শুরাকে পক্ষে নেয়া হয়। এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে, হেফাজতপন্থী আলেমদের একাংশ দীর্ঘদিনের মেহনতের দ্বারা গঠিত তাবলীগ জামাতের মতো এমন একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাচ্ছে এবং তাদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে।
যা হোক, তিনি সরকারের অনুমতি ও ভিসা নিয়ে বিশ্ব ইজতিমায় অংশ নিতে বাংলাদেশে আসলে তাঁকে বিমানবন্দরে বাধা দেয়া হয়। তাঁর আগমন ঠেকাতে ঐদিন হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের দ্বারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে রাস্তা প্রায় সাত ঘন্টা অবরোধ করে রাখা হয়। ফলে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। ১৩০টিরও অধিক বিমানের শিডিউল বিপর্যয় ঘটে- যা নজিরবিহীন! এসবের নেতৃত্বে ছিল হেফাজতপন্থী কওমি মাদ্রাসার কিছু আলেম এবং নেপথ্যে কাজ করেছে বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের মেহনতকারী কিছু সংখ্যক উলামায়ে কেরাম যারা মতবিরোধকে কেন্দ্র করে মাওলানা সা’দ-এর বিরোধিতা করে আসছেন এবং তাঁর বাংলাদেশে আগমন প্রতিহত করার জন্য হেফাজতে ইসলামপন্থী উলামায়ে কেরামের সহযোগিতা গ্রহণ করেন, যা তাদের সারাজীবনের মেহনত, কোরবানি এবং আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে! হজরত মাওলানা সা’দের টঙ্গী ইজতিমায় অংশগ্রহণে বাধা প্রদান করতে কওমি মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদেরকে ব্যবহার করা হয়-যা অত্যন্ত দুঃখজনক! ছাত্রদের কাজ হচ্ছে, পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা এবং শিক্ষকদের সান্নিধ্যে থেকে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলাম এবং সুন্দর আখলাকের দীক্ষা নেয়া।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় যে, এ ছাত্রদেরকে হজরত মাওলানা সা’দ-এর বিরুদ্ধে লাঠি নিয়ে রাস্তায় নামানো হয়েছে; উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে। পত্রিকা মারফত জানা গেছে, ঐদিন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় বিমানবন্দর থেকে বহির্গমন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গাড়ি থামিয়ে দেখা হয়েছে হজরত মাওলানা সা’দ ঐ গাড়িতে ছিলেন কী না। এর দ্বারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে হয়।
ইতঃপূর্বেও দেখা গেছে, হেফাজতে ইসলামের সরকারবিরোধী তথাকথিত আন্দোলনে কওমি মাদ্রাসার ছোট-বড় বিভিন্ন পর্যায়ের কোমলমতি ছাত্রদের রাস্তায় নামানো হয়েছিল। বিপর্যয়ের মুখে ছাত্রদেরকে রাস্তায় ফেলে রেখে নেতৃবৃন্দ সটকে পড়েন। ফলাফল সকলেই অবগত আছেন।
কিছুসংখ্যক পত্রিকায় ‘তাবলীগ জামাতের একটি অংশ’ বিমানবন্দরে তাঁকে বাধা প্রদান করেছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে-তা সঠিক নয়। তাবলীগ অনুসারীগণ রাস্তা অবরোধ, পথচারীদের বাধা প্রদান, যানজট সৃষ্টি-এহেন কাজ কখনো করতে পারেন না। হজরত মাওলানা সা’দ কান্ধলভীকে ইজতিমা ময়দানে প্রবেশে বাধাদানকারীগণ কী জিতেছে, না হেরেছে; তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। এহেন কাজের দ্বারা সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কি ক্ষুণ্ন হলো না? হেফাজতপন্থী উলামায়ে কেরামগণের একাংশ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তাবলীগের কাজকে বিপরীতমুখী এবং সাংঘর্ষিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করছেন-যা মোটেও কাম্য নয়। এহেন পরিস্থিতিতে উলামায়ে কেরামগণের প্রতি তাবলীগ জামাতের অনুসারিদের শ্রদ্ধাবোধ কতটুকু বাকি থাকবে-তা বিবেচনার বিষয়।
হজরত মাওলানা সা’দ তথা তাবলীগ জামাতের প্রকৃত অনুসারীগণ রাস্তায় না নেমে বরং তাবলীগ জামাতের মূল বৈশিষ্ট্যকেই ধারণ করেছেন, সরকারের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। হজরত মাওলানা সা’দকে ইজতিমাস্থলের পরিবর্তে কাকরাইল মাসজিদে নিয়ে আসা হলে সেখানে তিনি উর্দুতে বয়ান করেন। বয়ানে তিনি বলেন, ‘উলামায়ে কেরামগণ যদি কোন কারণে ভুল ধরেন, আমরা মনে করব ওনারা আমাদের উপর প্রতি এহসান (অনুগ্রহ) করছেন। তাঁরা যে কথা বলবেন তাতে আমাদের সংশোধন হবে ইনশা-আল্লাহ’। তাবলীগী আন্দোলন সবসময় অরাজনৈতিক ইসলামি দাওয়াতি আন্দোলন যা দলমত নির্বিশেষে সকলকে আকৃষ্ট করে থাকে। হেফাজতি আন্দোলন বা অন্য কোন সহযোগী আন্দোলনের সাথে তাবলীগ জামাতের কাজ সম্পৃক্ত হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না ইনশা-আল্লাহ।
হজরত মাওলানা সা’দ বিশ্ব আমীর। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশ (যেখানে তাবলীগের কাজ বিদ্যমান) তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করছে। বিশ্বব্যাপী সমস্ত পরামর্শ তাঁর নেতৃত্বে দিল্লির নিজামুদ্দীন মারকাজ মাসজিদেই হয়ে থাকে। তাঁর ফয়সালা সবাই মেনে নেন। কাজেই বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামগণ যদি তাঁর নেতৃত্বকে মেনে নেন; তাহলে দেশ তথা সারা বিশ্বেই দাওয়াতে তাবলীগের কাজ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং সারাবিশ্বে বাংলাদেশি জামাত সমাদৃত হবে। আশা করি, তাবলীগে মেহনতকারী উলামায়ে কেরামগণ সব ধরণের মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে ভারতের নিজামুদ্দীনের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে এ কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন এবং উলামায়ে কেরামগণ ছাত্রদের আন্দোলনের নামে রাস্তায় না নামিয়ে কোরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন গড়ার দীক্ষায় মনোনিবেশ করাবেন এবং তাদের মেধা বিকাশের জন্য শিক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিবেন।
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট

