নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০ দলের শরিক, জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান।
হৃদযন্ত্র ও কিডনির সমস্যা ছাড়াও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন এই রাজনীতিবিদ। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
কাজী জাফরের একান্ত সহকারী গোলাম মোস্তফা বলেন, হঠাৎ করে স্যার সকাল ৭টার দিকে গুলশানের বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন। দ্রুত ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হলে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শুক্রবার দুপুর ১২টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় জানাজা হবে বাদ জুমা বায়তুল মোকাররমে। জাতীয় পার্টির একাংশের মহাসচিব মোস্তফা জামান হায়দার এ তথ্য দিয়েছেন।
গত শতকের ষাটের দশকের ছাত্রনেতা এবং পরে চীনপন্থী বাম নেতা হিসাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি পাওয়া কাজী জাফর বিএনপি হয়ে পরে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের হাত ধরে তার সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। দীর্ঘ তিন দশক জাতীয় পার্টির সঙ্গে থাকার পর ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর কাজী জাফরকে দল থেকে বহিষ্কার করেন এইচ এম এরশাদ।
এরপর দলের একাংশকে নিয়ে জাতীয় পার্টি নামেই নতুন দল গঠন করে গতবছর ২৫ জানুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন তিনি।
কাজী জাফর ১৯৩৯ সালের ১ জুলাই কুমিল্লার প্রখ্যাত চিওড়া কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মেধাবী ছাত্র হিসাবে তিনি খুলনা জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স ও এম এ (ইতিহাস) পাস করেন।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এমএ এবং এলএলবি কোর্স সম্পন্ন করা সত্ত্বেও কারাগারে চলে যাওয়ায় পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে পারেননি। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বেগম খালেদা জিয়া।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
প্রবীণ রাজনীতিবিদ কাজী জাফর আহমদ ৬০ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের শুরুটা তার ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে হলেও জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান হিসাবে তিনি বৃহস্পতিবার মৃত্যুবরণ করলেন।
ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে তিনি রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করেছিলেন। ১৯৫৫ সাল থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতি শুরু করেন। রাজশাহী জেলা ছাত্র ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক এবং রাজশাহী কলেজ সাহিত্য মজলিশের মুখপাত্র সাহিত্যিকের সম্পাদক হিসাবে তার কর্মময় রাজনীতির পদচারণা শুরু।
কাজী জাফর আহমদ ১৯৫৯-১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
বিভিন্ন সময়ে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেন। কাজী জাফর ১৯৬২-১৯৬৩ সালে অবিভক্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (এপসু) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন ও শরীফ শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনে কাজী জাফর আহমদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রজীবন শেষে তিনি শ্রমিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন।
১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। ১৯৭২-১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তখন ছিলেন ন্যাপের চেয়ারম্যান। এরপর ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনাইটেড পিপলস পার্টির (ইউপিপি) প্রথমে সাধারণ সম্পাদক ও পরে চেয়ারম্যান হিসাবে সক্রিয়ভাবে পার্টির সাংগঠনিক দায়িত্ব ও জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিপরিষদের শিক্ষামন্ত্রী হন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির জন্মলগ্ন থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়ার প্রশ্নে এরশাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে নিজেই ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করেন।
১৯৮৬-১৯৯০ সালে তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির সরকারে পর্যায়ক্রমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বন্দর-জাহাজ ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক উপদেষ্টা, ১৯৮৯-১৯৯০ সালে বাংলাদেশের অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬-১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের উপনেতা ও ১৯৮৯-১৯৯০ সালে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন। ১৯৮৬-১৯৯৬ পর্যন্ত পরপর তিনবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

