ঢাকাThursday , 13 August 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাঘ হত্যার নেপথ্যে কতিপয় রাজনীতিক

Link Copied!

tigarখুলনা প্রতিনিধি : সুন্দরবনের বাঘ শিকারে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর দস্যু ইলিয়াস-জাহাঙ্গীর বাহিনী। তাদের এখন প্রধান টার্গেট বাঘ শিকার। বাঘের চামড়া ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার লাভজনক হওয়ায় তারা ‘দস্যুতা’ পেশা পরিবর্তন করে বাঘ শিকারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। মূলত দস্যুরা হরিণ বা অন্য কোনো বন্য প্রাণী শিকার করে তার পেটে একধরনের ভারতীয় চেতনানাশক ওষুধ রেখে কৌশলে তা বাঘকে খাইয়ে অচেতন করে থাকে। টার্গেট অনুযায়ী পরে সুবিধাজনক সময়ে অচেতন হওয়া বাঘ হত্যা করে তা পাচার করা হয়। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়া বনদস্যুদের স্বীকারোক্তিতে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, বর্তমানে বনদস্যুদের প্রধান টার্গেট বাঘ। একটি বাঘ মারতে পারলেই কোটি টাকা। এর নেপথ্যে রয়েছে কতিপয় প্রভাবশালী রাজনীতিক। তারা বিভিন্নভাবে বনদস্যুদের সহযোগিতা করে থাকে। বনদস্যুরা আলাদা সদস্য সংগ্রহ করে তাদের মাধ্যমে বাঘ শিকার করে। পরবর্তী সময়ে এরা গোপনে লোকালয়ের পার্শ্ববর্তী বনের মধ্যে শিকার করা বাঘের চামড়া ছাড়িয়ে মৃত বাঘের শরীরে পচনশীল রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কয়েক দিন মাটিতে পুঁতে রাখে। কয়েকদিন পর পুঁতে রাখা স্থান থেকে বাঘের হাড়, দাঁত ও নখসহ বিভিন্ন অঙ্গ তুলে গডফাদারদের হাতে তুলে দেয়। বর্তমানে সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণ শিকারের নিরাপদ ঘাঁটি কয়রা উপজেলা। গত কয়েক মাস আগে সাতক্ষীরা জেলা শহরে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে তিনটি বাঘের চামড়া, বন্দুকের গুলিসহ ৬ চোরা শিকারিকে আটক করেছিল। গত কয়েক দিন আগে খুলনা থানা-পুলিশ ৬৯ টুকরো বাঘের হাড়সহ ২ শিকারিকে আটক করে। আটককৃত এ শিকারিদের বাড়ি কয়রা উপজেলায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বনদস্যু সহযোগী কতিপয় গডফাদার ভারত থেকে বনদস্যুদের জন্য অস্ত্র ও গুলির চালানের সঙ্গে বাঘ অচেতন করার একধরনের ট্যাবলেট (ওষুধ) এনে শিকারিদের দেয়। পরবর্তী সময়ে শিকারিরা ফাঁদ পেতে অথবা বন্দুক দিয়ে শিকার করা হরিণের পেটে চেতনানাশক ট্যাবলেট ঢুকিয়ে বনের মধ্যে ঝোপের আড়ালে ফেলে রাখে। খাবারের লোভে বাঘ এসে তা খেয়ে মুহূর্তের মধ্যে অচেতন হয়ে পড়ে। পরে ওত পেতে থাকা শিকারিরা অচেতন বাঘের গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। এভাবে অভিনব কায়দায় বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘ শিকার অব্যাহত রয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি বাঘের চামড়া, দাঁত, নখ, মাথার খুলি, হাড়, চর্বি, শুকানো মাংস মিলে মূল্য কোটি টাকা। যে কারণে বনদস্যু ইলিয়াস-জাহাঙ্গীর বাহিনীর শতাধিক সদস্যের অন্যতম টার্গেট ছিল বাঘ শিকার। অবশ্য র‌্যাব ও জেলা পুলিশের অভিযানে ইতিমধ্যে সুন্দরবনের বেশ কিছু বনদস্যু বাহিনীর প্রধান নিহত হয়েছে। টিকতে না পেরে দলটির প্রধান রাজু ভারতে পাড়ি জমিয়েছে। কিছুদিন আগে জেলা পুলিশের অভিযানে আহত অবস্থায় বাহিনী প্রধান ইলিয়াসও ভারতে পালিয়েছে। তা ছাড়া গত কয়েক দিন আগে দস্যু দলটির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ফরহাদ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় দলটি ছত্রভঙ্গ হলেও জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে পুনরায় সুন্দরবন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এ ছাড়া সুন্দরবনে আরো সাত-আটটি বনদস্যু বাহিনী দস্যুতার সঙ্গে সঙ্গে বাঘ ও হরিণ শিকার অব্যাহত রেখেছে। পাচারকারী চক্র অবাধে সুন্দরবনের প্রাণীদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার করলেও বনদস্যুদের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।
সুন্দরবনের জেলে-বাওয়ালিরা জানান, বাঘের আবাসস্থল আজ বনদস্যুদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। যে কারণে হুমকির মুখে পড়েছে বাঘ। বনদস্যু ইলিয়াস-জাহাঙ্গীর বাহিনীর আয়ের অন্যতম উৎস্য বাঘ শিকার। একদিকে জেলে-বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণের টাকা আদায়, অন্যদিকে বাঘ শিকার করে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার করা।
বাওয়ালি নজরুল মোল্লা জানান, ‘তিন বছর আগে বাদায় (সুন্দরবনে) জোড়ায় জোড়ায় বাঘ দেখিছি, এখন বাদায় এট্টাও বাঘ দেখা যায় না।’
সুন্দরবনসংলগ্ন দক্ষিণ বেদকাশি এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বনদস্যু বাহিনীর অন্যতম সহযোগী বরিশাল অঞ্চলের বাসিন্দা মিজানুর রহমান মজনু ও আছাদুজ্জামান বুলবুলের মাধ্যমে গত দু-তিন বছরে এ বাহিনী একাধিক বাঘের চামড়া ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার করেছে। বনদস্যু ইলিয়াস বাহিনীর বাঘ পাচারের এ মিশনটির দায়িত্বে ছিল মজনু, বুলবুল ও ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া সদস্যদের ওপর। বাঘের চামড়া, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারে এ বাহিনীটি ছিল এযাবৎকালের সবচেয়ে ভয়ংকর। এ ছাড়া আরো কয়েকটি বনদস্যু বাহিনী সুন্দরবন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বর্তমানে তাদের প্রধান টার্গেট বাঘ শিকার।
তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সুন্দরবনসংলগ্ন এ উপজেলার লোকালয়ে তিনটি ফরেস্ট স্টেশন থাকা সত্ত্বেও বাঘ ও হরিণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একের পর এক র‌্যাব-পুলিশ উদ্ধার করলেও বন বিভাগ নিশ্চুপ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তারা প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের কাঠ ও হরিণের মাংস বিক্রিসহ প্রতিটি কাজে বনদস্যু শিকারি ও পাচারকারীদের সহযোগিতা করছে। যে কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন আজ বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
বন বিভাগের দুর্বলতার কথা স্বীকার করে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় বন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বনরক্ষীদের সক্ষমতা নেই। এমনকি বনের মধ্যে অনেক বিট অফিসের রক্ষীদের অস্ত্রের পরিবর্তে শুধুমাত্র লাঠি দিয়ে বন পাহারা দিতে হয়। ফলে বনের বৈধ সম্পদ আহরণকারীদের অনেকেই এখন বাঘ শিকারে মেতে উঠেছে। এ ছাড়া বনদস্যুরাও পেশা পরিবর্তন করে বাঘ ও হরিণ শিকার করছে। ফলে বাঘের সংখ্যা ৪৪০ থেকে কমে এখন ১০৬-এ নেমে এসেছে।
খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মনির-উজ-জামান বলেন, সুন্দরবনে প্রতিনিয়তই বনদস্যু ও বাঘ শিকারির সংখ্যা বাড়ছে। বিভিন্ন সময় পরিচালিত অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে অনেক দস্যু বাহিনীর প্রধান ও তাদের সহযোগীরা নিহত হয়েছে। কিন্তু তাদের আরো অসংখ্য সদস্য রয়ে গেছে। অনেককেই এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। ফলে তারা এখন পেশা পরিবর্তন করে বাঘ শিকারে লিপ্ত হয়েছে।
উল্লেখ্য, বনদস্যুদের আস্তানা উচ্ছেদে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে গত ১১ আগস্ট পশ্চিম সুন্দরবনের খাসিটানা এলাকায় বন বিভাগের খাসিটানা ক্যাম্পের দুজন বনরক্ষী ও তিনজন বোটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ছাড়া এই ক্যাম্পের ফরেস্টার নুরুল হককে বরখাস্ত করার জন্য প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে সুপারিশ করা হয়। গত ৯ আগস্ট সুন্দরবনে বাঘের চামড়া উদ্ধার ও ৬ বনদস্যু ক্রসফায়ারে নিহতের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৯ আগস্ট পুলিশ বাঘের তিনটি চামড়াসহ ৬ বনদস্যুকে গ্রেফতার করে। এরপর বনের মান্দারবাড়িয়া এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তারা নিহত হয়। এ ছাড়া খাসিটানা এলাকায় বনদস্যুদের আস্তানা উচ্ছেদ করে পুলিশ। এ ঘটনায় সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শোয়েব আহমেদকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বন বিভাগ।