নিজস্ব প্রতিবেদক : ৯ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি খাদ্য অধিদপ্তরের উপজেলা পর্যায়ের পদোন্নতির সংশোধিত নিয়োগবিধি। বিশেষ করে অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন ৬৪০ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও সমমানের পদ থেকে উচ্চতর পদে পদোন্নতি আটকে আছে বছরের পর বছর।
২৪ থেকে ২৮ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করার পরও পদোন্নতি না পেয়ে এসব খাদ্য কর্মকর্তার মধ্যে অন্তোষ, ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। ফলে মাঠ পর্যায়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকরা কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এদের নিয়ন্ত্রণে থাকা খাদ্য গুদামগুলোও হয়ে ওঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। এতে সকারের কাবিখা, টিআর ও নানা উন্নয়ন মুখী কর্মসূচীসহ খাদ্য ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এছাড়া পদোন্নতি সংক্রান্ত সংশোধদিত নিয়োগ বিধিমালার দোহাই দিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের চিহ্নিত কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত উপজেলা কর্মকর্তাদের জিম্মি করে রাখায় সরকারে উন্নয়ন কাজে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন অনেকে।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই দিন খাদ্য অধিদপ্তরে অনুসন্ধানকালে ও সংশ্লিস্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ( প্রশাসন) ইলাহী দাদ খান এর স্বাক্ষরিত খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব বরাবরে পাঠানো এক পত্রে বলা হয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরাধীন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও সমমানের ৬৪০টি পদকে প্রথম শ্রেণি ( নন-ক্যাডার) পদ থেকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও সমমান পদে পদোন্নতির বিষয়ে নিয়োগ বিধি সংশোধন করে একটি সংশোধিত নিয়োগ বিধির প্রস্তাব খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুমোদনক্রমে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়।
এর দুই বছর আগে ২০০৬ সালে এবং গত ৫ মাস আগেও সংশোধিত নিয়োগ বিধির খসড়ার অপর দুইটি প্রস্তাবনা সচিব বরাবরে পাঠানো হয় খাদ্য অধিদপ্তর থেকে। ওই প্রস্তাবে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও সমমানের কর্মকর্তাদের ২০০৬ সালে প্রথম শ্রেণিতে উন্নতি করার কথা বলা হয়।
উল্লেখ্য, সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং উপজেলা খাদ্য খাদ্য নিয়ন্ত্রক সমমানের পদটি ৯ম গ্রেডভুক্ত। উভয় পদই একই গ্রেডভুক্ত হওয়ায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সমমান পদ থেকে সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সমমানের ৯৭টি পদ থাকায় সরকারের কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে সহকারী নিয়ন্ত্রক থেকে ৯৭টি পদ পূরণ করার সুযোগ না থাকায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সমমানের ৬৪০টি পদে কর্মকর্তার মধ্য থেকে শতকরা ৩৫ ভাগ এবং সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক ৬৭টি পদ থেকে শতকরা ৬৫ ভাগ হিসেবে পদোন্নতির প্রস্তাব সম্বলিত সংশোধিত নিয়োগবিধি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ওই প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও সমমানের পদ শূন্য থাকায় যথাসময়ে সরকার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সমমানের পদ থেকে শতকরা ৩৫ ভাগ হিসেবে বেশ কিছু সংখ্যক কর্মকর্তাকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সমমানের পদে পদায়ন করা হয়েছে। এছাড়া খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে সচল রাখাতে অতি সম্প্রতি খাদ্য অধিদপ্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদে মো. বদরুল হাসানকে পদায়ন করা হয়।
জানা গেছে, খাদ্য অধিদপ্তরের ২৪টি বিসিএস ক্যাডার ভুক্ত সমমানের পদ খালি থাকার পরেও ১৫জন বিসিএস ক্যাডারভুক্ত সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রককে স্ববেতনে অনভিজ্ঞ ও অতি নবীন হওয়া সত্বেও নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন করে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে।
নিয়োগ বিধিতে বলা আছে, বিসিএস ক্যাডারভুক্ত সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক সমমানের পদে নিয়োগ পাওয়া পর অন্তত ২ বছর কাজ করতে হবে শিক্ষানবীশ হিসেবে। পরে পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতা অর্জন করার পর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে তাদের পদায়ন হওয়ার কথা।
অথচ সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজে যোগদানের ৬ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে স্ববেতনে পদায়ন করা হয়েছে অনেককে। অথচ মাঠ পর্যায়ে ২৪ থেকে ২৮ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকার পরেও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের জেষ্ট্যতা ও যোগ্যতা বিবেচনা না করে প্রস্তাবিত নিয়োগবিধি ও প্রচলিত ধারাবাহিকতাকে অমান্য করে স্ববেতনে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে দোহায় দেয়া হচ্ছে নিয়োগবিধির। এর ফলে মাঠ পর্যায়ে এখন বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে পদোন্নতিবঞ্চিত খাদ্য কর্মকর্তারা প্রস্তাবিত নিয়োগবিধি সংশোধন করার দাবিতে সম্প্রতি খাদ্য অধিদপ্তরে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে এবং আগামীতে বৃহত্তর কর্মসূচী দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে বিসিএস ক্যাডারভুক্ত অনডভিজ্ঞ ও নবীন কর্মকর্তাদের বরিশাল, পটুয়াখালী, নীলফামারি, যশোর, বাগেরহাট, পঞ্চগড়, মাদারিপুর, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার ও নোয়াখালীতে জেলা খাদ্য কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। যাদের চাকরীর বয়স এক বছরও পূর্ণ হয়নি।
জানা গেছে, সারাদেশে ১৩টি সিএসডি (সেন্টারাল সাপ্লাইল ডিপো) রয়েছে। সেখানে কেউ পদোন্নতি নিতে চান না। সবাই লোভনীয় জায়গা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে পদোন্নতি নিতে চাচ্ছেন। এবং তাদের চাহিদামত নিয়ম তোয়াক্কা না করে বিসিএস ক্যাডারভুক্তদের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও সমমানের পদে পদায়ন করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে খাদ্য কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) সিরাজুল ইসলাম ও মহাসচিব মো: মোছলেম উদ্দিন বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো: বদরুল হাসান বিসিএস সাধারণ ( ক্যাডার) সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দায়িত্বে থেকে তার সমিতির পক্ষে কিভাবে কাজ করছেন এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে অসত্য বক্তব্য প্রদান করছেন তা মাঠ পর্যায়ের খাদ্য কর্মকর্তা ও সমমানের কর্মকর্তাদের বোধগম্য নয়।
তারা আরো বলেন, বর্তমানে মাঠ পর্যায়ের খাদ্য ব্যবস্থাপনা সুষ্টুভাবে সম্পন্ন করার জন্য দ্রুত যে সকল জেলাতে খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদসহ সহকারী আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং খাদ্য ভবনে উপ-পরিচালক পদ শূন্য রয়েছে, সে সব পদে স্ববেতনে পদায়নের জন্য খাদ্য কর্মকর্তা সমিতি জোর দাবি জানাচ্ছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী, খাদ্য মন্ত্রী ও খাদ্য সচিবের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো: বদরুল হাসান এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সংশোধিত নিয়োগ বিধি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও সমমানের কর্মকর্তাদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে এ কথা তিনি স্বীকার করেন। তবে বিসিএস ক্যাডারভুক্ত সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও সমমানের কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে পদায়নের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

