ঢাকাSunday , 2 August 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

৬৮ বছর পর আরেক বিচ্ছেদ

Link Copied!

sitmohalরংপুর প্রতিনিধি : আটষট্টি বছর পর ছোট করে হলেও আরেকটি ডায়াস্পোরা দেখবে ভারতবর্ষ। ১৯৪৭ সালের বিচ্ছেদে হাজার হাজার মানুষ পাঞ্জাব ও বাংলা সীমান্ত পার হয়েছিল। অনেকে নিজের পছন্দে, কেউ বাধ্য হয়ে বাপ দাদার ভিটেমাটি ছেড়েছিলেন। এতোদিন পর বাংলার সীমান্তে আবার সেই বিচ্ছেদ ঘটতে যাচ্ছে। অবশ্য নিজ পছন্দেই ভিটে ছাড়ছেন তারা। কিন্তু এতোদিন থেকে যে আত্মার বন্ধন তৈরি হয়েছিল সেটি ছিঁড়তে তাদের কষ্ট হচ্ছে না এটা বলা যাবে না।
আজ শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে আর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ছিটমহলের অস্তিত্ব থাকবে না। ভারতীয় ছিটমহলের ৯৭৯ জন মানুষ বাংলাদেশের ভেতরে তাদের নিবাসকে চিরদিনের মতো বিদায় জানাবে। যদিও ভারত থেকে বাংলাদেশি ছিটমহলের কেউ এপারে আসছেন না। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই দ্বিতীয়বারের মতো মানুষকে তাদের আবাসভূমি বেছে নেয়ার সুযো্গ দেয়া হলো।
এতোদিন ভারত-বাংলাদেশের ছিটমহলের মানুষরা নামমাত্র কাঁটাতারের বেড়ায় বন্দি থাকলেও থেমে থাকেনি এপারের সাথে ওপারের আনাগোনা। কোনো কোনো ছিটে একপথেই দুইপারের মানুষের যাতায়াত। বাংলার স্কুলে ভারতীয় শিশুরা। আর ভারতের স্কুলে বাংলার শিশুরা। শুধু তাই নয়, পড়ালেখা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিয়েসাদি সবকিছুতেই বাংলার মানুষের সাথে ভারতীয় ছিটমহলের বন্ধন যেন অবিচ্ছেদ্য। নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত ছিটমহলের মানুষদের বাস্তবতা দেখলে বোঝা যায় কাঁটাতার এখানে কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।
বাংলার অভ্যন্তরে ছড়িয়ে থাকা ওপারের দাসিয়ার ছড়া, চন্দ্রকোণা, বাঁশকাটা, উত্তর গোতামারি, বাত্রিগাছ, ভোটবাড়ি ও কামাত চ্যাংড়াবান্ধাসহ বেশ কয়েকটি ছিটমহল ঘুরে দেখা গেছে কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে দুইপারের মানুষের গাঢ় সম্পর্কের প্রাণবন্ত প্রতিচ্ছবি।
বাঁশকাটা ছিটমহলের মানুষদের কাছে মমিনপুর গ্রাম যেন তাদেরই গ্রাম। এ গ্রামের মানুষ হিসেবে পরিচয়ে পরিচিত তারা। বাংলার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা তাদের ছোট্ট সোনামনিরা বাংলার বইখাতা হাতে ছুটে যায় মমিনপুরের স্কুলে। শুধু তাই নয়, প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে বড়রাও ছুটেছে পাটগ্রামের স্থানীয় সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন স্কুল কলেজে। আবার কেউ কেউ চাওয়া-পাওয়া আর ভালোলাগা-ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় করতে ওপারের মানুষ হয়েও এপারের মানুষে মানুষে বিয়েসাদির সম্পর্কে জড়িয়েছে। এখানে বিদ্যুৎতের একই খুঁটি থেকে ভারত ও বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে আলো।
বাঁশকাটা ছিটমহলের কোল ঘেঁষে থাকা জোংড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিয়ন সাজু মিয়া। তার সাথে দেখা মেলে ছিটমহলের ভেতরে। দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। আলাপচারিতায় সাজু বলেন, ‘এখানকার ছিটমহলের মানুষরা বাংলাদেশের মানুষের মতোই সব সুযোগ সুবিধা পায়। তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বিয়েসাদি, পড়ালেখা সব কিছুই বাংলাদেশকে ঘিরে।’
সাজু মিয়া জানান, স্থানীয় ১নং জোংড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৬৮জন শিশুর মধ্যে ৩০ জনই বাঁশকাটা ছিটমহলের। এরা ছিটমহলের হলেও বাংলাদেশী শিশুদের মতো সকল সুযোগ সুবিধা পায়।
অন্যদিকে ওই ছিটমহলের বিএ পড়ুয়া পাটগ্রাম সরকারি কলেজের ছাত্র রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নামমাত্র ছিটমহলের মানুষ। এখানে বাংলাদেশি আর ছিটমহলের মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। এপারে-ওপারে আমাদের সবার সম্পর্কই গভীর। একারণে এখানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎতের খুঁটি থেকে আমাদের ঘরে ঘরে আলো এসেছে।’
এদিকে বুড়িমারী স্থলবন্দরের কাছে ভোটবাড়ি ছিটমহলেও একই চিত্র দেখা গেছে। এখানে বাংলাদেশি ছেলেমেয়ের সাথে ছিটমহলের অনেকেই বিয়েসাদির সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এ ছিটমহলের ইউনাইটেড কাউন্সিলের সভাপতি মোজাহারুল ইসলাম তার প্রথম কন্যা রুপু বেগমকে লালমনিরহাটে অ্যাডভোকেট নুর আলমের সাথে বিয়ে দেন। দ্বিতীয় কন্যা শিমু আকতারকে বিয়ে দেন একই জেলার রাজিব চৌধুরীর সাথে। একইভাবে বাবুল মিয়া ওপারের হয়েও পাটগ্রামের কালিরহাটে বাংলাদেশি ছেলে জাহাঙ্গীরের সাথে তার মেয়ে লাভলীর বিয়ে দেন।
এরকম বিয়েসাদির ঘটনা রয়েছে দাসিয়ার ছড়া, চন্দ্রকোণা, উত্তর গোতামারি, বাত্রিগাছসহ ভারতীয় বিভিন্ন ছিটে।
এসব ছিটে বিয়েসাদির অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন সবই উৎসবের আমেজে হয়। এতে বাংলার এপারের মানুষ ও ভারতীয় ছিটমহলের ওপারের মানুষরা এক হয়ে যায়।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়িতে দাসিয়ার ছড়া ছিটমহলে গত দুই বছরে প্রেমের টানে বাংলাদেশিকে মেয়েকে বিয়ে করেছে এরকম বেশ কয়েকজন তরুণ রয়েছে। এদের মধ্যে মোহাম্মদ আলী ও জুয়েলের সাথে কথা হয়। তারা বলেন, আমাদের কারো মধ্যে ছিট নিয়ে কোনো বাধা ছিল না। আমরা ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দা হলেও ভালোবাসার কাছে হৃদয়ের বোঝাপড়া ছিল খুব নিবিড়। যে কারণে এপার ওপার এখানে কোনো বাধা হয়নি।
বাঁশকাটা ছিটমহলের ভিতরে এপারের জোংড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের অর্থায়নে নির্মিত মসজিদ ও মুক্তবে ছিটবাসীদের সাথে বাংলার মানুষরা এক সাথে নামাজ আদায় করেন। শুধু তাই নয়, এখানে ধর্মীয় শিক্ষাও নেন বাংলার শিশুরা। একই চিত্র রয়েছে দাসিয়ার ছড়া ও ভোটবাড়ি ছিটে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে ভারতীয় ছিটমহলের মানুষরা তাদের যাতায়াতে বাংলাদেশের রাস্তাঘাট ব্যবহার করে আসছে। শুধু তাই নয়, বাংলার পথ ধরেই প্রতিদিন এপার-ওপারের মানুষের কর্মময় সময় থেকে জীবন সংগ্রামের সবকিছুই ঘটছে অনাসয়ে। এখানে ঘর থেকে বের হলেই দুইপারের মানুষ এক সূতোয় গেথে যায়। জন্ম, মৃত্যু, বিয়েসাদি, পড়ালেখা, ব্যবসা-বাণিজ্য, গাল-গল্প, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে ওপার-এপারের পরিচয় যেন কোনো বাধাই নয়। যার বাস্তবতা বাঁশকাটা ছিটমহলে বিদ্যুতেই একই খুঁটি থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোয় আলোকিত হয়েছে জীবনযাপন।