ঢাকাSunday , 31 May 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে খালাস রাজউক

Link Copied!

Sundarban-01নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর পান্থপথে ধসের ঘটনায় নির্মিয়মাণ ভবনের মালিক ও ভবন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
ধসের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাজউক এক বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক বা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপিয়েছে।
অথচ ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন দেয়ার পর প্রতিটি স্তরে একজন ইন্সপেক্টর দ্বারা নির্মাণ কাজ তদারকির করার কথা রয়েছে রাজউকের।
এদিকে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল সুন্দরবন সংলগ্ন ন্যাশনাল ব্যাংকের নির্মাণাধীন এনবিএল টাওয়ারের পাইলিংয়ের গর্তে রাস্তা ধসের ঘটনায় ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে পান্থপথ ও সিআর দত্ত রোডসহ আশপাশের পুরো এলাকা। একে ঝুঁকিমুক্ত করতে ভবনের জন্য খোঁড়া গর্ত বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। পুরো গর্তটি ভরাট করতে আরো দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে। তবে এর মধ্যে যে কোনো সময় বৃষ্টি হলে পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে মনে করছেন ইমারত বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার সকালে ধসের পর বালু ভরাট করে সুন্দরবন হোটেলের একাংশ ঝুঁকিমুক্ত করা হয়। এর পরপরই ন্যাশনাল ব্যাংক ভবনের উত্তর-পূর্ব কোণার কিছু অংশ ধসে পড়ে। এ অবস্থায় স্থানটিকে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত করতে ভবনের জন্য খোঁড়া গর্তের দুই তৃতীয়াংশই ভরাট করতে হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ জন্য প্রয়োজন প্রায় ১০ লাখ ঘণফুট বালু যা ১৫ শ ট্রাকের সমান।
বুধবার ধসের পর থেকেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, তিতাস ও ডেস্কোসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তার গর্ত ভরাট শুরু হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩ লাখ ঘণফুটের মতো বালু গর্তে ফেলা হয়েছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তরের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘শুরুতে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক মনে করছিলাম। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে দেখি সে ধারণা ভুল। তারা জানিয়েছেন খুব দ্রুত পুরো এলাকাকে ভরাট করতে হবে। না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকে চলে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে সুন্দরবন হোটেল কিছুটা ঝুঁকিমুক্ত করা হয়েছে। বুয়েটের বিষেশজ্ঞটিম আমাদেরকে জানিয়েছে- যদি বৃষ্টি হয় তাহলে বিপদ আরো বাড়বে। তখন ভবনটির সামনের সড়ক পান্থপথ সুন্দরবন হোটের পাশের সড়ক সিআর দত্ত রোড ও উত্তর-পূর্ব কোণ পুরোটাই ধসে পড়তে পারে। তবে এ অবস্থায় নির্মাণাধীন ভবনের অবশিষ্ট অর্ধেক অংশ তেমন ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।’
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন নির্মাণ বিশেষজ্ঞ বলেন, মাটির গুণাগুণ পর্যালোচনা করে নিরাপত্তা দেয়াল করার নিয়ম থাকলেও এ ভবনটিতে তা অনুসরণ করা হয়নি। মাটির গুণাগুণের বিষয়টি কেউ আমলেই নেয় না। রাজউকও এটা কখনও দেখে না।’
জানা গেছে, নির্মাণাধিন ন্যাশনাল ব্যাংকের এ ভবনটি যেখানে নির্মিত হচ্ছে তা এক সময় ডোবা ছিলো। ময়লা আবর্জনা আর বিভিন্ন দ্রব্যের সমষ্টিতেই এটি ভরাট করা হয়। কাজেই ওই এলাকার মাটির মান ভালো হওয়ার কথা নয়। তাই এর ওপর নিরাপত্তা দেয়াল টিকে থাকার কথা নয়। ফলে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর উপর ভবন নির্মাণ করা হলে সেটিও পুরোটাই ঝুঁকিতে থাকতো।
এদিকে বুধবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে ভবনটির আশপাশের পুরো এলাকা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সিদ্দিকুর রহমান।
দায় কার: পান্থপথের ঘটনাটির জান্য দায়ী কারা জানতে চাইলে উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা এখন এর জন্য দায়ী কে বা কারা তা বলতে পারবো না। আগে একে ঝুঁকিমুক্ত করাটাই আমাদের মূল কাজ। তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি তারাই নির্ণয় করবে দোষ কার।’
অনুমোদন দিয়েই দায় শেষ: ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন দেয়ার পর প্রতিটি স্তরে একজন ইন্সপেক্টর দ্বারা নির্মাণ কাজ তদারকির করার কথা রয়েছে রাজউকের। কিন্তু এর কিছুই পালন করছে না সংস্থাটি। তাই একের পর এক ভবন ধসের ঘটনা ঘটছে। উপরন্তু সংস্থাটি এর দায় দায়িত্ব চাপাচ্ছে খোদ ভবন মালিক ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ওপর।
পান্থপথের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাজউক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, রাজউকের আওতাধীন এলাকায় ইমারত নির্মাণস্থলে যেকোন দুর্ঘটনা ও অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়ানো, ভূমিধস রোধ, কর্মরত নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তাবিধান, আশেপাশের ভবন, অবকাঠামো ও পথচারিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক বা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের।
আইনে যা বলা আছে: ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ (সংশোধিত) এ বলা হয়েছে- একটি ভবনের নকশা অনুমোদনের পর থেকে প্রতিটি ধাপে মনিটরিং করতে হবে। এর ৩০৫ ও ৩০৭ ধারায় বলা হয়েছে, বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরুর সময় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রাজউককে অবহিত করবে। রাজউকের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে কাজ শুরু হবে।
৩১১ ধারায় বলা হয়েছে, বেজমেন্ট নির্মাণের পর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে রাজউকের কাছ থেকে একটি সনদপত্র নিতে হবে। ৩১৩ ধারায় বলা হয়েছে, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তদারকির দায়িত্ব পালন করলেও রাজউকের পক্ষ থেকে সেটার তদারকির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বিধিমালার ৪০২ ধারায় বলা হয়েছে, ভবনের নকশা প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত স্থপতি ও প্রকৌশলীরা তদারকি করবেন এবং প্রত্যেকটি স্তরের কাজ শেষে রাজউককে অবহিত করতে হবে এবং পরবর্তী স্তরের কাজের অনুমোদন নিতে হবে। পুরো ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর রাজউক থেকে ভবনের ব্যবহার সনদপত্র নেয়ার কথা বলা হয়েছে বিধিমালার ৪০৭ ধারায়।
ভবন মালিকের জমা দেয়া ওই সনদপত্রের ওপর ভিত্তি করেই সেবাদানকারী সংস্থাগুলো ওই ভবনে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ দেবে। এভাবে ভবন নির্মাণের প্রতিটি স্তরে নির্মাণকাজ তদারকি করবে রাজউক। অথচ এর কিছুই করেনা রাজউক।
ধসের আরো কয়েকটি ঘটনা: ভবন ধসের একের পর ঘটনা ঘটে চলেছে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এর আগে নির্মাণকাজের ত্রুটির কারণে ২০১২ সালে ৫/বি, সার্কিট হাউস রোডে একই ধরনের রাস্তা ধসের ঘটনা ঘটে। তার কিছু দিন পর গুলশান ২ নম্বরের ৯৫ নম্বর রোডে আরেকটি দুর্বল পাইলিংয়ের কারণে পার্শ্ববর্তী ভবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ১০ মে সকাল ৮টায় পুরানা পল্টনে লাইনে ডেভেলপার কোম্পানি ট্রপিক্যাল হোমসের একটি বহুতল ভবনের পাইলিংয়ের কাজ করার সময় ধসে পড়ে দেয়ালসহ পাশের ২০ ফুট চওড়া রাস্তা। এতে পাশের ৫৩ ও ৭২ নং পুরানাপল্টন লাইনের দুটি বহুতল ভবন এবং ১ নং বিজয় নগরের আরেকটি বহুতল ভবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এমনকি এনবিএল টাওয়ারের পাশেই গড়ে ওঠা মোনেম বিজনেস সেন্টার (মোনেম টাওয়ার) নির্মাণের সময়েও ধসের কারণে চারজন শ্রমিককে প্রাণ দিতে হয়।
এ ছাড়া ভবন নির্মাণের সময় ইট পড়ে পথচারীর ও ভবন থেকে পড়ে নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যুসহ নানা দুর্ঘটনা ঘটছেই। এসবের জন্য তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত কমিটি: এদিকে পান্থপথের ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে বুয়েটের অধ্যাপক ফখরুল আমিনকে আহ্বায়ক করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী, ফায়ার ব্রিগেডের ডেপুটি ডিরেক্টর, ঢাকা মেট্রোপলিটনের উচ্চ পর্যায়ের একজন প্রতিনিধি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট জোনের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার। আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে গঠিত কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অসহযোগিতার অভিযোগ: ধসের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড কর্তৃপক্ষের কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন খোদ মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন।
শুক্রবার সাঈদ খোকন বলেন, ‘ন্যাশনাল ব্যাংকের কেউ নেই কেন? উনাদের অ্যাকাউন্ট থেকে বালু আসছে না কেন?’
আনিসুল হক বলেন, ‘আমি মেয়র হয়ে যদি রাত দিন সারাক্ষণ থাকতে পারি তাহলে উনারা থাকতে পারবেন না কেন? তাদেরকে তো সব সহযোগিতা করা হচ্ছে।’