নিজস্ব প্রতিবেদক : সিটি করপোরেশনের কর্মপরিধির বাইরে গিয়ে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছুটাচ্ছেন ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীরা। ৬ দফা, ১২ দফাসহ বিভিন্ন দফায় প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য সেটাই এখন বড় বিষয়। প্রায় অভিন্ন কথামালায় সাজানো ইশতেহারগুলোতে যেসব কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রার্থীরা, তার অধিকাংশই সিটি মেয়রের কর্মপরিধির মধ্যেই পড়ে না। সেই সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়ার ফলশ্রুতিতে তার চাইলেও প্রতিশ্রুতি মোতাবেক নিজেদের কাজ করতে পারবেন না।
মেয়রপ্রার্থীদের দাবি- সদিচ্ছা থাকলেই কর্মপরিধির বাইরে হওয়া সত্ত্বেও সিটি করপোরেশনের কাজ করা সম্ভব। তবে স্থানীয় সরকার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনোভাবেই মেয়র প্রার্থীদের আকাশকুসুম কল্পনাকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে তাদের এসব প্রতিশ্রুতির কারণে ‘নগর সরকার’ প্রতিষ্ঠার দাবিটা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, আসছে ২৮ এপ্রিলের নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০ জন এবং উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬ মেয়র প্রার্থী ‘নগর পিতা’ হওয়ার লড়াইয়ে নামবেন। দক্ষিণের মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে ইতোমধ্যেই ইশতেহার ঘোষণা করেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকন, জাতীয় পার্টির সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, সিপিবি-বাসদ সমর্থিত বজলুর রশীদ ফিরোজ, জাসদ সমর্থিত শহীদুল ইসলাম প্রমুখ। বিএনপি সমর্থিত ও অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাস এখনো পর্যন্ত ইশতেহার ঘোষণা না করলেও, আগামী দুই-একদিনের মধ্যে ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে। আর উত্তরের মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আনিসুল হক, বিএনপি সমর্থিত তাবিথ আউয়াল, বিকল্পধারা সমর্থিত মাহী বি চৌধুরী, গণসংহতি সমর্থিত জোনায়েদ সাকি, সিপিবি-বাসদ সমর্থিত আবদুল্লাল আল ক্বাফী, জাতীয় পার্টি সমর্থিত বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবুল প্রমুখ নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করেছেন।
ইশতেহারে প্রতিশ্রুতির সীমা নেই
রাজধানীর দুই অংশের হবু নগর পিতারা মনখুলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভোটারদের। সিটি করপোরেশনের কর্মপরিধির বাইরে গিয়ে সবাই প্রায় একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দফার সংখ্যা পরিবর্তন করে ঢালাওভাবে প্রার্থীরা নাগরিকসেবাকে গুরত্ব দিয়ে নিজেদের ইশতেহার সাজিয়েছেন। সেখানেই বিপাকে পড়েছেন তারা। কারণ তাদের তালিকায় থাকা অনেক সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা নেই সিটি করপোরেশনের। সিটি করপোরেশনের ২৮ ধরনের কাজের সঙ্গে ৫৬টি সংস্থা জড়িত। তাদের প্রত্যেকটিই স্বায়ত্তশাষিত হওয়ায় এদের উপর সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে একমাত্র আনিসুল হক বলেছেন, বেসরকারি উদ্যোগেই এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
প্রার্থীদের দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে- যানজট, জলবাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সমস্যা, সন্ত্রাস, মাদক, বুড়িগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদী ও খাল দখলমুক্ত করা, পরিবেশদূষণ রোধ বিভিন্ন সমস্যা। কিন্তু এগুলো করার এখতিয়ার নেই সিটি করপোরেশনের। কারণ যানজট নিরসন করার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের, পানি সমস্যা ও জলবাবদ্ধতা দূর করার দায়িত্ব ওয়াসার। বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করবে পিডিবির মাধ্যমে ডেসেকো ও ডিপিডিসি। গ্যাস সমস্যার সমাধান করবে তিতাস। এছাড়া সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজি বন্ধ করার দায়িত্ব পুলিশের। এ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই স্বায়ত্তশাসিত হওয়ায় এদের উপর সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণ নেই। সেই সঙ্গে এ খাতগুলোর সঙ্গে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের সমন্বয় ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের বক্তব্য
হবু মেয়ররা ক্ষমতার বাইরে গিয়েও উপরোক্ত প্রতিশ্রুতি দেয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সরকার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের বক্তব্য, সমস্যাগুলোর সমাধানের ক্ষমতা না থাকলেও, প্রতিশ্রুতিগুলো নাগরিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এসব প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেই এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। সেই সঙ্গে এসব কারণেই নগর সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের হবু মেয়ররা যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সেখানে করপোরেশনের নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের বক্তব্য স্পষ্ট না। করপোরেশনের প্রধান কাজগুলো যেমন- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গণশৌচাগার, পার্ক উদ্ধারের মধ্যে কাজে মন দেবেন বলে আমি মনে করি। তারা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবেন না বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমি আশা করবো তারা সেটা বাস্তবায়ন করবেন। সেই সঙ্গে মেয়র প্রার্থীদের এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো নগর সরকার নিয়ে আলোচনায় বসতে পারেন। তাহলে আর সমন্বয়হীনতা থাকবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রচলিত আইনে কি ধরনের ক্ষমতা আছে, সেটা কিন্তু বড় বিষয় না। তারা যে জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছেন- এজন্য তাদের সাধুবাদ।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম খন্দকার বলেন, ‘বেশিরভাগ সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার ক্ষমতা নেই করপোরেশনের। ফলে মেয়ররা চাইলেও নাগরিকদের মৌলিক সুবিধা দিতে ব্যর্থ হন। তবে তাদের এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য তারা নগর সরকার গড়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপ প্রয়োগ করবেন বলে আমি মনে করি।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবীব বলেন, ‘বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে নগর সরকারের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা প্রদান করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তেমনটি না থাকায়, স্থানীয় সরকারগুলো কোনো ক্ষমতা আমরা দেখি না। তবে তারা যদি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারেন, তাহলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব।’
প্রার্থীদের বক্তব্য
বিশ্লেষকরা না মানলেও, সদিচ্ছা থাকলেও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে করেন মেয়র প্রার্থীরা। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় সরকারে সঙ্গে সমন্বয় করলেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। প্রয়োজনে নগর সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
উত্তরের মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক বলেন, ‘বাস্তবায়নযোগ্য জেনেই আমি উন্নয়ন প্রস্তাব দিয়েছি। আইনের মধ্যে থেকে মেয়র এসব কাজ তার ক্ষমতা, দক্ষতা ও নেতৃত্ব দিয়ে খুব ভালোভাবেই বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি না। ফলে নাগরিকদের অবাস্তব কোনো স্বপ্নও দেখাচ্ছি না।’ তিনি সিটি করপোরেশনের ক্ষমতার বাইরে বেসরকারি উদ্যাগেও এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন।
নগর সরকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন পড়লে এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবো। তবে আগে নিজের ক্ষমতাতেই উন্নয়নের চেষ্টা চালাবো।’
তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘ব্যবসায়ী হিসেবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তেকে আমি জানি, এ শহরের আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। আমি সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়েই নিজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবো।’
সাঈদ খোকন বলেছেন, ‘আমি নির্বাচিত হতে পারলে, শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে ইশতেহারের উল্লেখিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবো।’

