রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির জেরে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। আর নিজের এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকারের ইমেজ রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন বলে জানান তিনি। ইশরাক হোসেন বলেন, আমার কারণে যেন প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের কর্মকাণ্ড ম্লান না হয়, সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করেছি। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘোষণার সময় এ কথা বলেন তিনি। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের মুখে পড়েন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ওঠে সমালোচনার ঝড়। ব্যাপক বিতর্কের মুখে রোববার (১৮ অক্টোবর) ইশরাক হোসেনকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা মেনেই বিএনপি সরকারের মাত্র ৮ মাসের মাথায় সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, যে এলাকায় তিনি অভিযানে গিয়েছিলেন। এলাকাটি সব রকম মাদকের ডিস্ট্রিবিউশন হাবে পরিণত হয়েছে। তাদের কাছে অর্থ-অস্ত্র সবই রয়েছে। তিনি জানান, যে অস্ত্রটি নিয়ে আলোচনা; তা বৈধ এবং আত্মরক্ষার্থে কিছু সময়ের জন্য হাতে নিয়েছিলেন। পুলিশ সেখানে যেতে চায় না। বিতর্ক সৃষ্টির জন্য এ সময় মিডিয়াকে দায়ী করে ইশরাক বলেন, সেখানে আমি জমি দখল বা চাঁদাবাজি করতে যাইনি। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলাম। মিডিয়া সেই অবজেক্টিভ ধ্বংস করেছে। তিনি বলেন, আমি মাদককে নির্মূল করতে চাই— এই জায়গা থেকে পুরো দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজের নিরাপত্তার জন্য বৈধ অস্ত্রটি হাতে রেখেছিলাম। কিন্তু নানা মহলে এই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে প্রচার করা হয়েছে।
ইশরাক হোসেন বলেন, যেদিন অভিযানে যাই সেদিন সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে জানিয়েছিলাম। কোন সময় তারা আসবে, সেটিও তাদের জানিয়ে দিয়েছিলাম। আমার সেখানে প্রবেশ করার পর প্রায় ২৫-৩০ জন লোক ছুটাছুটি শুরু করে। আর একদল আমাদের দিকে আসতে থাকে। ওই সময় আমার নিরাপত্তার জন্য যে অস্ত্র সেটি আমার সঙ্গে ছিল, সেটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে হাতে রাখি, যাতে কোনোকিছু ঘটলে নিজেকে রক্ষা করতে পারি। কিন্তু কিছু গণমাধ্যমে ন্যারিটিভ তৈরি করে মূল ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে আমার ব্যক্তিগত ও দলের ইমেজ ক্ষুণ্ন করা হয়েছে, তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে নিজেই পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানিয়েছি। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ইশরাক হোসেন বলেন, আজকের দিন হতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। তিনি সেই সুযোগ দিয়েছেন। আজকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করি। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে বলি, ‘আমার মাদকবিরোধী অভিযান কেবল শুরু হলো, এটা চলবে। আমার কারণে যেন আপনার এবং সরকারের কর্মকাণ্ড ম্লান না হয়, সেজন্য আমি পদত্যাগ করতে চাই।’
গেন্ডারিয়ার ঘণ্টিঘর এলাকায় অভিযানের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বলেন, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাদক নির্মূল করা। কিন্তু, গণমাধ্যমের একটি অংশ অস্ত্র হাতে আমার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সংবাদ প্রকাশ করায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে গেছে।
ইশরাক বলেন, যুদ্ধটা তো মাদকের বিরুদ্ধে। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নেই, দলীয় কোনো স্বার্থ নেই, রাজনৈতিক কোনো স্বার্থ নেই। তার দাবি, ঘণ্টিঘর এলাকায় শুধু মাদক সেবন নয়, মাদক সরবরাহের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফজলুল হক মহিলা কলেজ, গেন্ডারিয়া কলেজ ও মনিজা রহমান কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক সরবরাহের অভিযোগও স্থানীয় বাসিন্দারা আমাকে জানিয়েছেন। মাদকের মূল সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করা ছাড়া এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। শুধু রাস্তার পর্যায়ের বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে স্থায়ী সমাধান হবে না।
এজন্য মাদকের মূল সরবরাহকারী ও নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সবার সহযোগিতা চান ঢাকা-৬ আসনের এই সংসদ সদস্য।

