ঢাকাThursday , 8 October 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নাকি শালীনতার সীমালঙ্ঘন?

Link Copied!

গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করা সাংবাদিকতার দায়িত্ব। সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরা, মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা, প্রধানমন্ত্রীর নীতির বিরোধিতা করা—এসবের কোনো কোনোটিই শুধু বৈধ নয়, বরং একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অপরিহার্য।

কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। সমালোচনা কি অসম্মানের সমার্থক? আর সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কি ব্যক্তিগত তাচ্ছিল্যের লাইসেন্স? সম্প্রতি সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দিনের কিছু বক্তব্যকে ঘিরে এই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি বলেছেন—‘যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন, উনি একটা গেনি ভাব নিয়ে… উনি আমাদের একটা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা হইছেন।’

তিনি আরও বলেছেন—‘তুই এইগুলা পুলিশ দিয়া ভাংলিনা কেন?’ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বলেছেন—‘জীবনে এইটার কোনো একটা কিছুই করবে না তারেক রহমান।’
বক্তব্যগুলো যে প্রেক্ষাপটে এসেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা বারনেন (Rädda Barnen) শাখা এবং ইসিবি চত্বরের নিকটবর্তী দক্ষিণ মানিকদীর নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে অবস্থিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’তে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

এ ধরনের ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সরকারের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করাও স্বাভাবিক। বরং একজন সাংবাদিক যদি এসব ঘটনায় প্রশ্ন না তোলেন, তখনই প্রশ্ন উঠতে পারে—তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন কি না।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রশ্ন তোলার ভাষা কেমন হবে? ‘যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন’—এতটুকুতেই কি সমস্যা? একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর পদে আছেন—এটি একটি বাস্তবতা। তাঁর সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে, তাঁর প্রশাসন ব্যর্থ হতে পারে, তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা নীতিগত আপত্তি থাকতে পারে। সবকিছু নিয়েই কঠোর সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু ‘যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন’—এই বাক্যাংশটি এমনভাবে উচ্চারণ করা হলো কেন, যেন পদটিই কোনো ব্যঙ্গের বিষয়?

তারপর এল ‘গেনি’ শব্দটি। একজন সাংবাদিকের বক্তব্যে উচ্চারণগত ভুল হওয়া অপরাধ নয়। কিন্তু একই বক্তব্যে শব্দটির পুনরাবৃত্তি যখন ঘটে, তখন শ্রোতার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—এটি কি নিছক উচ্চারণের ভুল, নাকি ইচ্ছাকৃত শব্দচয়ন? আর ‘নাসিরুদ্দিন হোজ্জা’? হোজ্জা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার লোককথায় বহুল পরিচিত এক হাস্যরসাত্মক চরিত্র। ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাঁর সঙ্গে তুলনা করার মাধ্যমে ঠিক কোন বৈশিষ্ট্য বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে ব্যঙ্গের উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট বলেই মনে হয়।
ব্যঙ্গ করা যাবে না—এমন কথা কেউ বলছে না। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ তো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু ব্যঙ্গ যখন যুক্তির জায়গা দখল করে নেয়, তখন তা আর রাজনৈতিক সমালোচনা থাকে না; তা হয়ে উঠতে পারে ব্যক্তিগত অবমূল্যায়নের কৌশল।

সাংবাদিকতা কি ‘তুই’ সম্বোধনের স্বাধীনতাও দেয়? ‘তুই এইগুলা পুলিশ দিয়া ভাংলিনা কেন?’ এখানে আপত্তির জায়গাটি আরও স্পষ্ট। একজন মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা এক বিষয়। তাঁকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা আরেক বিষয়। কিন্তু একজন রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীকে ‘তুই’ সম্বোধন করে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

অবশ্য কেউ বলতে পারেন—ভাষা তো ব্যক্তির স্বাধীনতা। কথ্য ভাষায় ‘তুই’ অনেক সময় ঘনিষ্ঠতারও প্রকাশ। ঠিক আছে। কিন্তু জনপরিসরে ভাষার অর্থ শুধু অভিধান দিয়ে নির্ধারিত হয় না; প্রেক্ষাপটও অর্থ তৈরি করে। যখন একজন সাংবাদিক একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছেন এবং একই সঙ্গে ‘তুই’ সম্বোধন করছেন, তখন সেটিকে নিছক বন্ধুত্বপূর্ণ কথ্যভাষা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ খুবই সীমিত।

খালেদ মুহিউদ্দিন সম্পর্কে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সপ্তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনারসহ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—কেউ সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট হলেই তাঁর সমালোচনা করা যাবে না, এমন কোনো নিয়ম নেই। আবার কেউ মন্ত্রী হলেই তিনি সাংবাদিকের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে—এমন কথাও নয়। বরং বিষয়টি উল্টো। যে সাংবাদিক রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের ভাষা ও কাঠামো সম্পর্কে জানেন, তাঁর কাছ থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা ও দায়িত্বশীলতার প্রত্যাশা আরও বেশি।

ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করতে সাহস লাগে। কিন্তু ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করার সময় নিজের ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে যে আত্মসংযম লাগে, সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে দেওয়া তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য হলো—‘জীবনে এইটার কোনো একটা কিছুই করবে না তারেক রহমান।’ এটি নিছক মন্তব্য নয়; বক্তব্যটির মধ্যে এক ধরনের নিশ্চিত রাজনৈতিক পূর্বাভাস রয়েছে—প্রধানমন্ত্রী কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন না। এখানে সাংবাদিকের অধিকার আছে তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন প্রকাশ করার। তিনি চাইলে বলতে পারেন, সরকারের ওপর তাঁর আস্থা নেই। তিনি বলতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী ব্যর্থ হবেন। এমনকি তিনি চাইলে প্রকাশ্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিতে পারেন। কিন্তু সাংবাদিকতার শক্তি তো ভবিষ্যদ্বাণীতে নয়; তথ্য, বিশ্লেষণ ও প্রমাণে। তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল—সরকার কী করেছে বা করেনি, কেন করেনি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে, কোন পদক্ষেপ প্রয়োজন। ‘কিছুই করবে না’ বলে আগাম রায় দিয়ে দেওয়া সহজ। কঠিন হলো অপেক্ষা করা এবং তারপর তথ্য দিয়ে সেই রায়ের সত্যতা যাচাই করা।

কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে?
খালেদ মুহিউদ্দিনের বক্তব্যের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ অন্তত তাঁর সেই নিশ্চিত দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় প্রশাসনিক ও দলীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে দল ও সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তিনি পদত্যাগ করেন। দলের ভেতরে অপরাধ ও বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির কথাও বলা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘প্রধানমন্ত্রী কী করবেন’ নয়। প্রশ্নটি হলো—যিনি বলেছিলেন ‘কিছুই করবে না’, তিনি এখন কী বলবেন? কারণ সাংবাদিকতার সৌন্দর্য এখানেই—নিজের বক্তব্যকেও বাস্তবতার কাছে পরীক্ষার জন্য ছেড়ে দিতে হয়।

রাড্ডা বারনেনের ঘটনাও শুধু একটি ‘আজকের’ ঘটনা নয়; এই সংস্থাকে ঘিরে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে এর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব একটি স্থানীয় ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যা বর্তমানে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ট্রাস্ট নামে পরিচিত। রাড্ডা বারনেন ১৯৭৪ সাল থেকে বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকার মিরপুরে, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, পুষ্টি ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করে আসছে। অর্থাৎ একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলা নিছক একটি ভবনে ভাঙচুরের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সেবার বিষয়টিও জড়িত। তাই এ ঘটনার কঠোর তদন্ত ও ব্যবস্থা দাবি করা শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়; এটি নাগরিক দায়িত্বও।

নিউগিনি প্রপার্টিজ: রাজনীতি, নাকি জমির বিরোধ?
দ্বিতীয় এই ঘটনাটির ক্ষেত্রেও ছবিটি আরও জটিল। ‘নিউগিনি প্রোপার্টিজ’-এর পক্ষ থেকে করা মামলার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে হামলার প্রধান হোতা হিসেবে অভিযুক্ত শাহরিয়ারসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তদন্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানা গেছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মিজানুর রহমান নামে আরেক অভিযুক্ত আটক হয়েছেন, যিনি কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আবদুল গফুরের জামাতা। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামও ঘটনায় এসেছে। তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও নানা দাবি উঠেছে। কিন্তু তদন্তসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে ঘটনাটিকে সরাসরি রাজনৈতিক হামলা হিসেবে দেখার আগে আরও কিছু বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। জমি নিয়ে বিরোধ, আবাসন প্রকল্প, চাঁদা দাবি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব—সবকিছুই তদন্তের অংশ।

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ওই ভবনে থাকায় তিনি এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হয়েছেন—এটি একটি বাস্তব ক্ষতি। কিন্তু সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তদন্তের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সাংবাদিকতার কাজ সন্দেহকে সত্য বানানো নয়; সন্দেহকে প্রশ্নে পরিণত করা এবং সত্যকে অনুসরণ করা।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা সরকারের সমালোচনায় নয়। সমস্যা প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করায় নয়। সমস্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতা তুলে ধরায়ও নয়। সমস্যা হলো—আমরা কি সমালোচনার শক্তিকে ভাষার আগ্রাসন দিয়ে মাপতে শুরু করেছি?

একজন সাংবাদিক যদি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ’, সেটি একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মূল্যায়ন। তিনি যদি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত ভুল’, সেটি যুক্তিতর্কের বিষয়। তিনি যদি বলেন, ‘সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ’, সেটি তথ্য দিয়ে যাচাই করা যায়।

কিন্তু ‘তুই’, ‘গেনি’, ‘হোজ্জা’—এই শব্দগুলো কী যুক্তির ওজন বাড়ায়? বরং অনেক সময় এগুলো যুক্তির দুর্বলতাকেই আড়াল করে। শব্দ যত জোরে চিৎকার করে, যুক্তি তত শক্তিশালী হয় না।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বনাম সাংবাদিকের দায়িত্ব
সাংবাদিকের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা দরকার—বিশেষ করে যখন ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে। একজন সাংবাদিকের কলম বা কণ্ঠ সাধারণ নাগরিকের কণ্ঠের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী। তাঁর একটি শব্দ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে তাঁর ভাষার দায়িত্বও স্বাভাবিকভাবেই বেশি।তিনি সরকারের ভুল ধরিয়ে দেবেন—এটাই প্রত্যাশিত। তিনি মন্ত্রীকে কঠিন প্রশ্ন করবেন—এটাই প্রয়োজনীয়। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করবেন—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু তাঁকে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে—রাষ্ট্রের পদকে প্রশ্ন করা যায়; রাষ্ট্রের পদধারীকে অপমান করা সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ নয়। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করা যায়, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করা সমালোচনার শর্ত নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতা তুলে ধরা যায়, কিন্তু তাঁকে ‘তুই’ বললেই বক্তব্যটি বেশি গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না।

শেষ প্রশ্নটি আমাদের সবার
খালেদ মুহিউদ্দিনের বক্তব্যের সঙ্গে কেউ একমত হতে পারেন, কেউ তীব্রভাবে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। সেটিই গণতন্ত্র। কিন্তু তাঁর বক্তব্যকে ঘিরে যে প্রশ্নটি উঠেছে, সেটি শুধু একজন সাংবাদিককে নিয়ে নয়। এটি আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতা সংস্কৃতির প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি গণতন্ত্র চাই, যেখানে

ক্ষমতাসীনকে প্রশ্ন করা যাবে না?
অবশ্যই না। আবার এমন একটি গণতন্ত্রও কি চাই, যেখানে প্রশ্ন করার স্বাধীনতার সঙ্গে অপমান করার স্বাধীনতাকেও এক করে দেখা হবে? সেটিও নিশ্চয়ই নয়। কারণ গণতন্ত্রে ক্ষমতাকে ভয় না পাওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভাষাকেও লাগামহীন না করা প্রয়োজন। সাংবাদিকতার শক্তি গালিতে নয়, যুক্তিতে। প্রতিবাদের শক্তি তাচ্ছিল্যে নয়, তথ্যে। আর গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কণ্ঠের উচ্চতায় নয়—ভিন্নমত প্রকাশের শালীনতায়।

তাই শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খালেদ মুহিউদ্দিনকে নিয়েই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি হলো—আমরা কেমন সাংবাদিকতা চাই, কেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই এবং কেমন গণতন্ত্রের জন্য কথা বলছি? কারণ সমালোচনার স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অধিকার; কিন্তু অসম্মান কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নয়।

মোহাম্মদ খালিদুজ্জামান
উন্নয়ন, যোগাযোগ ও জনসম্পর্ক পেশাজীবী
(জাতিসংঘ মিশন ও ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর সাবেক স্টাফ সদস্য)