গাইবান্ধায় জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে আমন চাষাবাদে অনিশ্চয়তায় পড়েছে দুই ইউনিয়নের অন্তত পাঁচ শতাধিক কৃষক। ১৫ জুলাই হতে ১৫ আগষ্ট আমনের চারা রোপানের উৎকৃষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও জমিতে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় ধান রোপন করতে পারছেনা কৃষকরা। এমন চিত্র সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়ন ও রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের রাধাকৃষ্ণপুর ভেলাকোপা এবং পাকড়িছিড়া ব্রিজের উত্তর-দক্ষিণ এলাকার বিস্তীর্ণ জমিগুলোতে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, প্রায় দুই কিলোমিটার খাল বা নালা অভাবে সাম্প্রতিককালে প্রায় বছরই এমন সংকটে পড়তে হচ্ছে তাদের। সম্প্রতি সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়ন ও রামচন্দ্রপুরের ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভেলাকোপার ব্রীজের পশ্চিম ও পূর্ব পাশের পাথারে আমন চাষাবাদে কোন ধরনের তৎপরতা নেই কৃষকদের। পুরো পাথার জুরে ছোট-বড় কচুরি পানাতে ভর্তি। এসব ফসলি জমিতে এখনো প্রায় কোমড় পরিমাণ পানি। একই চিত্র পাকরিছিড়ার ব্রীজের উত্তর-দক্ষিন ফসলের মাঠে। এ অংশের বেশিরভাগ জমিতে হাটুর উপরে পানি রয়েছে। অন্যদিকে, এসব এলাকার পাশের গরদিঘি, রহমতপুর, গোপালপুর, ত্রিমোহিনী, বাদিয়াখালী, পেয়ারাপুর ঘুরে দেখা গেছে বেশিরভাগ জমিতেই রোপণ করা শেষ আমন ধান। যতটুকু জমি বাকি আছে সেসব জমিতেও কাজ করছেন কৃষকরা। সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাদুল্লাপুর থেকে আসা একটি নালা তুলসীঘাট হয়ে বোয়ালী ইউনিয়নের শেষ অংশে রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের মৃত কাদের মিয়ার বাড়ির সামনে এসে শেষ হয়েছে। অন্যদিকে পূর্ব রাধাকৃষ্ণপুর-হরিপুর মৌজা থেকে শুরু হওয়া আরেকটি নালা গিয়ে মিশেছে আলাই নদীতে। কিন্তু কাদের মিয়ার বাড়ি থেকে ভেলাকোপা হয়ে পূর্ব হরিপুর পর্যন্ত মাঝখানের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় কোনো নালা নেই। ফলে এই অংশে জমে থাকা পানি বের হতে না পেরে সৃষ্টি করছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। স্থানীয় প্রবীণ কৃষকদের মতে, এই অংশেও নালা ছিলো। কিন্তু প্রায় তিন দশক আগে বড় বন্যার পর নালাটির তলদেশ ভরাট হয়ে যায়। পরে সংস্কারের অভাবে নালা ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে। এরপর জমির মালিকরা নিজেরাই অনেক জায়গায় নালার অংশ ভরাট করে ফেলেন। যার ফলে এখন পানি নিষ্কাশনের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া স্থানীয় কৃষকরা জানান, এই এলাকার পানি প্রবাহের পথে বেসরকারি সংস্থা এসকেএস ফাউন্ডেশন তাদের একাধিক বহুতল ভবন ও প্রাচীর নির্মাণের কারণে যতটুকু পানি নিষ্কাশন হয়েছিলো তাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা জানান, এসকেএস পানি নিষ্কাশনের জন্য পাঁচটি পাইপ স্থাপন করলেও পানি প্রবাহের জন্য তা যথেষ্ঠ নয়। ভেলাকোপার পাথারে জলাবদ্ধতার সেটিও একটি কারণ বলে জানান তারা। জলাবদ্ধতার কবলে পড়া এলাকার কৃষকরা জানান, এছর একদিকে তাদের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে জমিতে পানি বেশি থাকায় আমন চাষাবাদের এখনো কোনো উদ্যোগ নিতে পারছেননা তারা। তাদের দাবি, এই জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় বছরই তাদের বীজ তলা নষ্ট হয়। আবার সঠিক সময়ে চারা রোপন করতে না পাড়ায় কাঙ্খিত ফসল উৎপাদন করতে ব্যর্থ হন। শুধু আমন মৌসুমেই নয়, অনেক সময় ইরি মওসুমের জমির পাকা ধান কিংবা অপরিপক্ক ধান পানিতে পড়ে নষ্ট হয়। তারা আরো জানান, শুধু এই দুই ইউনিয়ন নয় ভরা বর্ষায় এর প্রভাবে উজানের বল্লমঝাড় সহ তিনটি ইউনিয়েন সহস্রধিক কৃষক এমন ভোগান্তিতে ক্ষতির মুখে পড়েন। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে সংশ্লিষ্টদের কাছে দফায় দফায় যোগাযোগ করা, এমনকি স্বারকলিপি দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে ক্ষতির বোঝা টানতে হচ্ছে এখানকার কৃষকদের। দ্রুত পানি নেমে না গেলে এবছরও অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকবে। এই এলাকার কৃষক আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম বলেন, “কেবল জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছরই বীজ তলা নষ্ট হয়। ফসল তলিয়ে যায়। অনেক সময় একাধিকবার চারা রোপন করার কারণে তাদের খরচের পরিমাণ অনেক বেশি হয়। নালা না থাকায় এই এলাকাসহ পার্শবর্তী তিনটি ইউনিয়নের অন্তত সহস্রাধিক বিঘা জমির কয়েকশ কৃষক বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ বর্গাচাষী আলম মিয়া বলেন, গত বছর আমন মওসুমেও চারা কিনে দুই দফা রোপণেও এক কেজি ধানও পাইনি-খর পাইনি পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। একই এলাকার অপর ক্ষতিগ্রস্ত গৃহস্থ শাহিন মিয়া বলেন, জমিতে অনেক পানি। বীজতলা নষ্ট হয়েছে। হাটে খোঁজ নিয়ে দেখেছি চারার অনেক দাম। জমি রোপন করবো কিভাবে জানা নেই। কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, প্রতিবছর দোগোচি (বলান) দিতে আমাদের অনেক বেশি খরচ হয়। অনেক সময় দুই দফা রোপন করেও ধান পাওয়া যায়না, পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়। আবার রোপনের সময়ের মধ্যে পানি না সড়ে গেলে অনেক জমি অনাবাদি থেকে যায়। এই এলাকার কৃষকদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে দ্রুত নালা খননের দাবি করেন তিনি। রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের মাবুদ সরকার বলেন, দুই পাশেই নালা আছেই। কেবল মাঝে প্রায় দুই কিলোমিটার নালা খনন হলেই এখানে আমন, ইরি ও বর্ষালীসহ তিন ফসলি চাষাবাদ করা সম্ভব হবে। পূর্ব রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক মধু মিয়া বলেন, এই অংশে খাল খননের জন্য গেল বছরও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে দরখাস্ত-স্বারকলিপি সব দিছি। কিন্তু কোনো কাজে আসেনা। এই ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম বলেন, ওই এলাকার কৃষকদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে খাল খনন অত্যন্ত জরুরি। কেবল জলাবদ্ধতার কারণেই সম্ভাবনাময় তিন ফসলী আউশ ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ওই এলাকার কৃষকরা। তিনি জানান, ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট আমন রোপনের উৎকৃষ্ট সময়। দেশি জাতগুলো আগামী আরো ১৫ দিন পর্যন্ত রোপন করা যেতে পারে। কিস্তু তারপর রোপনে ফলন ভালো হবেনা। এ বিষয়ে বোয়ালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম সাবু বলেন, “কৃষকদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে নালা খননে পরিষদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। একই সাথে সদর আসনের সাংসদ ও সরকার দলীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্শণ করেছেন তিনি”। এ ব্যাপারে সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি। কৃষকরাই এদেশের প্রাণ। খোঁজ-খবর নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে খাল খননে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রসঙ্গত: চলতি মওসুমে অতি বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় ও উজানের ঢলে জেলায় ৩৩.৫ হেক্টর আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে গাইবান্ধার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

