গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বাজে ফুলছড়ি চরের বাসিন্দা মজিবর রহমান। তার ১৩ বছরের মেয়ে মোসাঃ সুমাইয়া হঠাৎ অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা অনুভব করে। এমন রোগের কোনো চিকিৎসক নেই চরে। দু-একজন থাকলেও তাদের দৌড় জ্বর-সর্দি পর্যন্ত। নদীতে পানি নেই। তাই নৌকা চলাচলের ব্যবস্থাও নেই। শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় চারদিকে শুধু বালু আর বালু। মেয়েকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান মোঃ মজিবর রহমান। শেষমেশ কোনো উপায় না পেয়ে মেয়েকে চেয়ারে বসিয়ে দুই পাশে রশি দিয়ে ভায়রাসহ দুজন কাঁধে করে গাইবান্ধা জেলা শহরে নিয়ে যান। সঙ্গে ছিলেন মা জোসনা বেগম। ফুলছড়ি উপজেলার বাজে ফুলছড়ি চরে এমনই ঘটনা ঘটে। পরে গাইবান্ধা শহরের একটি ক্লিনিকে সুমাইয়ার অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অপারেশন করা হয়। হাসপাতাল থেকে তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। শহর থেকে পুরাতন ফুলছড়ি পর্যন্ত অটোতে করে নিয়ে যান বাবা মজিবর রহমান। কিন্তু চরের রোগীকে নিয়ে যাওয়া কোনো গাড়ি না পেয়ে একইভাবে বাবা আর খালুর কাঁধে করে বাড়িতে যেতে হয় সুমাইয়াকে। সুমাইয়ার মা জোসনা বেগম বলেন, কোনো উপায় না পায়ে (পেয়ে) গ্যাদিরে (মেয়ে) বাঁশের কান্দোত করে হাসপাতালোত নিয়ে গেছি। হামারে কষ্ট হোক, গ্যাদিটা হামার অনেক কষ্ট থেকে বাঁচলো। বাবা মজিবর রহমান বলেন, হামার গ্যাদিই না, হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে চরের সকলাই (সবাই) এভাবে রোগী নিয়ে যাতায়াত করি। হামার জীবন না আরেকজনের কান্দোত ভাই। শুধু মায়ায় পড়ে এখানে সকলাই থাকি ভাই। শুধু কিশোরী সুমাইয়া নয়, অসুস্থ হলে এমন করেই দুর্ভোগ পোহাতে হয় বাজে ফুলছড়ি চরের বাসিন্দাদের। আধুনিক সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। এখানে অ্যাম্বুলেন্সতো দূরের কথা, একটি ভ্যানও পৌঁছায় না। ফলে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে ভরসা একটি প্লাস্টিকের চেয়ার বা জলচৌকি, কিছু রশি আর একটি বাঁশ। দুই মানুষের কাঁধে ভর করে চেয়ারে বসে পারি দিতে হয় চরাঞ্চল।
ফুলছড়ি ইউনিয়নের বাজে ফুলছড়ি চর থেকে জেলা শহরের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। কিন্তু এ দূরত্ব কেবল সংখ্যার হিসেব নয়, এটি এক যন্ত্রণার পথচিত্র। মাঝখানে বিস্তীর্ণ ব্রহ্মপুত্র নদ, শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালুচর, আর বর্ষায় প্রলয়ঙ্করী স্রোত। কোনো স্থায়ী সড়ক নেই, নেই সেতু। স্থানীয় গ্রামবাসিরা বলেন, বর্ষাকালে নৌকা থাকলেও তা সবসময় নিরাপদ নয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পায়ে হেঁটে বালুর চরে চলতে হয়। এ দীর্ঘ যাত্রাপথে রোগীর অবস্থা আরও অবনতির দিকে যায়। অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় জীবনের প্রদীপ। ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা, অনিশ্চিত জীবন চরাঞ্চলের মানুষের জন্য চিকিৎসা মানেই এক ধরনের যুদ্ধ। গর্ভবতী নারী, শিশু কিংবা মুমূর্ষু রোগী—কারও জন্যই নেই দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা। ফুলছড়ি ইউনিয়নের বাজে ফুলছড়ি চরের বাসিন্দা মোঃ আনসার আলী বলেন, আমাদের চরে অন্তত একটি ভালো হাসপাতাল বা স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র দরকার। রোগী নিয়ে এভাবে কাঁধে করে নদী পার হওয়া আর কতদিন? স্থানীয় এরেন্ডা বাড়ি চরে চর চৌমোহন গ্রামের বাসিন্দার মোঃ নুর হেসেন বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জরুরি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস কিংবা সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রাণ বেঁচে যেতেপারে। এ বিষয়ে ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চরের রোগীদের ভোগান্তি কমাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনসহ সকল পক্ষকে নিয়ে বসে একটি আশু পদক্ষেপ নেওয়া হবে। গাইবান্ধা জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ রফিকুজ্জামান বলেন, এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। আর চরগুলো ছড়ানো-ছিটানো। তাই এ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। সামনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে চরবাসীর স্ব্যাস্থ্যা সেবার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আশা করি তখন রোগীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো কমানো যাবে।

