পর্যটন একটি বহুমুখী শিল্প খাত। এই শিল্পটিরও শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে যেমন-ঐতিহাসিক নিদর্শন, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি, ধর্ম, স্বাস্থ্য, খেলাধুলা, বাণিজ্য। পৃথিবীর অনেক দেশের অর্থনীতির নাড়ির স্পন্দনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে পর্যটনকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশেও এ শিল্পের সম্ভাবনা অফুরন্ত। বাংলাদেশ অপার সৌন্দর্যের এক লীলা ভূমি। এ দেশের এক দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত রূপময় ভূখ- তিন পার্বত্য জেলা-রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি। বিস্তৃত সংরক্ষিত বনাঞ্চল, উপত্যকা, নদী, পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ঢেউ খেলানো সৌন্দর্য, পাহাড়ি ঝরনা ঝিরি দেশ বিদেশের অনেক আকর্ষণীয় স্থানকেও হার মানাতে পারে। পার্বত্য জেলার চারদিক ঢেউতোলা সবুজের উঁচু পাহাড়ের দেওয়াল। মাঝেমধ্যে ব্যস্ত ছোট ছোট শহর ও শহরের প্রবেশ পথের দুই পাশে সবুজের বাঁকে-বাঁকে উঁচু-নিচু সর্পিল রাস্তা। অনেক পর্যটকই পার্বত্য শহরকে ছবিতে দেখা নেপালের কাঠমান্ডু শহরের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। অনেকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিও বলে থাকেন। এ ছাড়া রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, সুর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই যেখানে উপভোগ করা যায় সেই সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা। এর বাইরে বিস্তৃত হাওর বিল, সোয়াম ফরেস্ট রাতারগুলসহ /আরও অনেক নয়নাভিরাম প্রকৃতিক সৌন্দর্য যা পর্যটকদের সহজেই আকৃষ্ট করে। পর্যটন শিল্পের এই অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। পর্যটন শিল্পকে ঘিরে আমাদের দেশের অর্থনীতিকে অবশ্যই সমৃদ্ধ করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। বিশ্ব অর্থনীতি প্রতিনিয়ত তার রূপ বদল করছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের হাতছানি আর প্রযুক্তির কল্যাণে বদলে যাচ্ছে প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য থাকলেও পর্যটন শিল্প এখন সে জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ট্রিলিয়ন ডলারের পর্যটন বাজার বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একটি বিকাশমান শিল্প, যা প্রতিনিয়ত নিজের আকার ও আয়তন বৃদ্ধি করে চলেছে। বর্তমানে পর্যটন শিল্প পৃথিবীর একক বৃহত্তম শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে পর্যটন এখন অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার খাত। কৌশলগত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে পর্যটনের গুরুত্ব এখন সার্বজনীন। ট্রিলিয়ন ডলারের বিশ্ব পর্যটন বাজারে বাংলাদেশও নিজের হিস্যা বুঝে নেওয়ার জন্য নিজেকে আরও পরিপাটি করে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করতে পারে। দিন যত বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দেশের বিভিন্ন পর্যটন হাব। বর্হিবিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও পর্যটন অর্থনীতিতে নিজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তৈরি করতে পারে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্র। করোনাকালে সংঘ নিরোধের ভয়াবহ সময় ও যুদ্ধময় বিশ্ব পরিস্থিতি ছিল পর্যটনের জন্য বিশেষ অন্তরায়, যা তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতি তো বটেই, প্রায় সব দেশের অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে কানেকটিভিটির এ যুগে প্রতিটি দেশই কোনো না কোনোভাবে মহাদেশীয় বা আন্তঃমহাদেশীয় বাণিজ্যিক বেল্টের সঙ্গে যুক্ত। অর্থনৈতিক কার্যক্রমের জন্য যেমন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার, তেমনি পর্যটন অর্থনীতির জন্যও পরিবেশ, প্রতিবেশ আর প্রকৃতির শান্ত স্নিগ্ধ উপযোগিতা প্রয়োজন। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত বলতে আমরা উৎপাদন, বণ্টন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে বিবেচনা করি। এর বাইরেও পর্যটন শিল্পের মতো একটি বিশেষ খাতের প্রসার লাভের মধ্য দিয়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালীকরণ এখন সময়ের চ্যালেঞ্জ। যার উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি নেপাল, জাপান, থাইল্যান্ড কিংবা দুবাইয়ের মতো পর্যটন অর্থনীতির দেশগুলোর নাম। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজমের (ডব্লিউটিটিসি) বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স প্রকাশিত তথ্য বলছে, বিশ্ব পর্যটন শিল্প এখন ১১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজার। চলতি বছর বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে পর্যটনের অবদান এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক পর্যটনে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানির অবদান বাড়ছে, চলতি বছর পর্যটন খাতে বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থান হয়েছে ৩৪৮ মিলিয়ন মানুষের।
সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ভ্রমণ ও পর্যটনে ২০২৪ সালে বিশ্বের সেরা ১০ দেশের তালিকা করে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন প্রকাশ করে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের নাম তালিকার প্রথমে উঠে আসে। তালিকার সেরা ১০টি দেশের মধ্যে ৬টিই ইউরোপের। তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে স্পেন, জাপানের অবস্থান তৃতীয়, ফ্রান্স চতুর্থ, অস্ট্রেলিয়া আছে পঞ্চম স্থানে। এ ছাড়া জার্মানির অবস্থান ষষ্ঠ, যুক্তরাজ্য আছে সপ্তম অবস্থানে, অষ্টম স্থানে রয়েছে চীনের নাম। ইতালির অবস্থান নবম। আর দশম স্থানে আছে সুইজারল্যান্ড। বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, তালিকায় স্থান পাওয়া প্রতিটি দেশই পর্যটন খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেছে। যদিও তাদের অর্থনৈতিক আরও অনেক খাত আছে, তারপরও পর্যটন খাতকে অবহেলা করেনি। এ থেকে বাংলাদেশের অনুধাবন করার মতো বিষয় আছে। বাংলাদেশ শুধু প্রকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়ে পর্যটক আকর্ষণ করতে পারে। কেননা কৃত্রিম পর্যটক স্পটের চেয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের বেশি আকর্ষণ করে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থান, সমুদ্রসৈকত, ম্যানগ্রোভ বন, হাওর-বাঁওড়, পাহাড়, অরণ্য, চা বাগান, পার্ক, জলপ্রপাত, ছোট-বড় দ্বীপ, নদ-নদী, খাল-বিল, বিস্তীর্ণ জলাশয় ও নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের রূপময় ভূখণ্ড তিন পার্বত্য জেলা-রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে। এটি পর্যটন শিল্পের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পর্যটন স্থান বললেই কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা, সুন্দরবন আর পার্বত্য চট্টগ্রামসহ হাতে গোনা কয়েকটি স্থানের কথাই শোনা যায়। অথচ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া খ্যাত বাংলাদেশের ৬৪ জেলা, ৪৯১ উপজেলার মধ্যে প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলায়ই ঘুরে দেখার মতো অনেক স্থান রয়েছে। এগুলো পর্যটন স্থানে পরিণত করতে প্রয়োজন প্রচার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তালিকাটি করার ক্ষেত্রে অবকাঠামো, প্রাকৃতিক সম্পদ, টেকসই, সাশ্রয়ী, শ্রমিকের প্রাপ্যতাসহ কয়েকটি মানদণ্ডকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ ছাড়া হোটেলগুলোর ব্যবসা, বিমানবন্দর, আকর্ষণীয় জায়গা, উড়োজাহাজ সংস্থা এসব বিষয়ও বিবেচিত হয়। মূল কথা হচ্ছে, পর্যটনের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তির সহযোগিতায় পর্যটন আকর্ষণ স্থানগুলোর যথাযথ তথ্য ইন্টারনেটে সরবরাহ, ওয়েবসাইটে হালনাগাদ তথ্য প্রদান, ব্লগ সাইট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ট্যুরিস্ট ও ট্রাভেলকে বুস্ট করা। অপার সম্ভাবনা থাকার পরও বিশ্ব পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। মুন্ডি ইনডেক্সের তথ্য বলছে, পর্যটন শিল্পে বিশ্বের ১৮৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪১তম আর এশিয়ার ৪৬টি দেশের মধ্যে ৪২তম। যদিও বাংলাদেশে ইউনেসকো স্বীকৃত তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্য (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) পর্যটন কেন্দ্র ছাড়াও রয়েছে হাজারো পর্যটন স্পট। আছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট (শ্বাসমূলসমৃদ্ধ বৃক্ষরাজি) সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঝরনা, নদী আর প্রকৃতির অপরূপ সৃজন পাহাড় ও অরণ্যের মেলবন্ধন, আছে বিসতৃত জলরাশির হাওর। তারপরও দক্ষিণ এশিয়ায় পর্যটন অর্থনীতিতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে যেখানে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, ভারত পর্যটন অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। জাপান, সিঙ্গাপুর, বিশ্বের সেরা দশ পর্যটন আকর্ষণ স্থানে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ কোন কোন পদক্ষেপের কারণে পিছিয়ে, তা বিশ্লেষণ করতেই হবে। পরিসংখ্যান বলছে, মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটন শিল্পের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ এবং রাজস্ব আয় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের পর্যটন খাতে সরাসরি কর্মরত ১৫ লাখ মানুষ। আর পরোক্ষভাবে আরও ২৩ লাখ লোক এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এ খাত, যা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করা সম্ভব। আর্থিক মূল্যে দেশীয় পর্যটন খাতের আকার দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৪ হাজার কোটি টাকার। এ খাত আরও প্রসারিত করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বিশ্ব পর্যটন অর্থনীতিকে মাথায় রেখে নতুন নতুন পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে হবে। এ ছাড়া পর্যটনসমৃদ্ধ অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শতভাগ নিশ্চিত করা, পর্যটন স্পটে পর্যটকদের জন্য আন্তর্জাতিকমানের বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা, পর্যটন এলাকায় পুলিশ কেন্দ্র স্থাপন, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক গাইডের ব্যবস্থা করা, বিদেশে বাংলাদেশের ট্যুরিজম প্রমোশনে রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারের উদ্যোগী ভূমিকা পালন, পাঠ্যপুস্তকে পর্যটন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া, পর্যটন বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ, পর্যটন এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবস্থা, পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন অফার প্যাকেজ চালু রাখা প্রভৃতি। পর্যটন এলাকা বা এর আশপাশে সরকারি উদ্যোগে প্রয়োজনীয়সংখ্যক থ্রি স্টার বা ফাইভ স্টার হোটেল নির্মাণসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থায় পর্যটন শিল্প হতে পারে অর্থনীতিকে শক্তিশালীকরণের একটি বিশেষ খাত। পর্যটন শিল্পের বিকাশে সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং বিশ্ব পর্যটন শিল্পের পাইওনিয়ার দেশগুলোর ভূমিকা ও কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ করে বাংলাদেশ পর্যটন কর্তৃপক্ষ পর্যটন শিল্পের সঠিক পরিচর্যা ও যত্ন নেওয়া হবে এমনটাই প্রত্যাশা।

