গণ অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার তিন মাস পূর্ণ হলো। এই ৩ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়ে মানুষ এখন হিসাব নিকাশ করতে শুরু করেছে। তাদের চাওয়া পাওয়া কতটা পূরণ হয়েছে কিংবা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে, নাকি শুধু কথার ফলঝুড়ি বয়ে যাচ্ছে এ সবই মানুষ এখন বিচার করছে। দেড় হাজারেরও বেশি ছাত্র-জনতার প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া নতুন স্বাধীনতার স্বাদ পেতে যে সবাই এখন উন্মুখ। তাই মানুষ এখন আর শুধু কথা শুনতে চায় চায় না। তারা শান্তি চায়,স্বস্তি চায়। মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ধরনের বিশৃঙ্খলা সাধারণত হয়, বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম কিছু হচ্ছে না। সমস্যা হচ্ছে, এই পরিস্থিতি বেশি দিন ধরে চললে জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়তে থাকবে। যেকোনো সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো মানুষকে স্বস্তি দেওয়া। মানুষ যেন মনে করে, এই সরকার আমাদের সরকার। প্রথমেই বলা যাক অসহনীয় দ্রব্যমূল্যের কথা। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে স্বস্তি দেয়া। এ কাজটি করতে সরকার এখনও সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেনি।সাম্প্রতিক অতীতে পৃথিবীতে যত গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, তার পেছনে অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সেই সঙ্গে সুশাসনের অভাব। আরব বসন্তের সূত্রপাত তিউনিসিয়ার সবজি বিক্রেতা মুহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে। মূলত পুলিশের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। তাঁর সেই জ্বলন্ত শরীরের ছবি বিশ্বগণমাধ্যমে ঠাঁই পায়। মুহূর্তেই জ্বলে ওঠে আগুন। বারুদ প্রস্তুতই ছিল, তাতে আগুনটা ছুঁইয়ে দেয় তাঁর আত্মহনন। আমাদের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পাটাতন তৈরি করেছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব, অপশাসন ও দুর্নীতি। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের ক্ষোভ ছিল চরম। জনপ্রশাসন থেকে শুরু করে সরকার-সংশ্লিষ্ট সবার প্রতিই তা ছিল। ফলে আগুন দাবানলে হয়ে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। সেটা এখনো তুষের আগুনের মতো জ্বলছে। তাই এ বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পণ্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়েছে। তবে আগাম শীতকালীন শাক-সবজি বাজারে আসায় দাম কমতে শুরু করেছে। যেসব সবজির মূল্য কয়েকদিন আগেও কেজি প্রতি একশ’ বা তার কাছাকাছি ছিল, তা এখন গড়ে ২০-৩০ টাকা কমে ৫০-৬০ টাকায় এসেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সমস্যা হচ্ছে, অন্যান্য পণ্যের মূল্য নিয়ে। বিশেষ করে চাল, ডাল, তেল, ডিম, পেঁয়াজ ইত্যাদির মূল্য বাড়ছেই। এসব পণ্যের বেশিরভাগের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার টিসিবি’র মাধ্যমে ট্রাকে ন্যায্যমূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা অব্যাহত রাখলেও তার প্রভাব সাধারণ বাজারে পড়ছে না। বলা বাহুল্য, শহরভিত্তিক টিসিবির এ ব্যবস্থা গ্রামীণ বাজারে কাজ করছে না। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই অত্যন্ত কষ্টে জীবনযাপন করছে। এতে সরকারের প্রতি তাদের অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে। বলা বাহুল্য, যেকোনো সরকারের প্রতি জনসমর্থনের মিটারের পারদ উঠানামা করে পণ্যমূল্য নাগালের মধ্যে রাখা-নারাখার ওপর। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারসাজিতে সিন্ডিকেট জড়িত এটা জনগণ এখন আর শুনতে চায় না। এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম থামাতে এ সরকার আন্তরিক কি না সেটা নিয়ে এখন অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম নিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে স্বস্তি দেয়া। এ কাজটি করতে সরকার এখনও সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেনি। এতে সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের যে আকাশচুম্বি প্রত্যাশা তা কিছুটা হলেও ¤্রয়িমান হয়েছে। যদিও সরকার পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং, বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক ছাড়, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণসহ নানা ব্যবস্থা নিয়েছে, তারপরও এসব পদক্ষেপের সুফল খুব কমই মিলছে। যেমন ডিম ও পেঁয়াজের দাম কমাতে গত মাসে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহর করলেও তার কোনো প্রভাব বাজারে পড়েনি। বরং গত এক সপ্তাহে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৫০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ডিমের ডজন প্রতি মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও তা ছাড়িয়ে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এ সমস্যার ক্ষেত্রে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, ডিমের চাহিদা ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান নিয়ে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন দৈনিক ডিমের চাহিদা ৫ কোটি পিসের মতো। পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) হিসাব মতে, দেশে দৈনিক ডিমের উৎপাদন ৪ কোটি ৫০ লাখ পিস। অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ডিমের দৈনিক উৎপাদন ৬ কোটি ৩০ লাখ পিস। এ হিসেবে, ডিমের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকার কথা। হিসাবের এই গড়মিল হওয়ার কারণ হচ্ছে, বিপিআইসিসি হাঁস ও কোয়েল ডিমের হিসাব ধরছে না। অথচ এই দুই উৎস থেকে ডিম উৎপাদিত হয়, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি পিসের বেশি। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, হয় উদ্যোক্তাদের হিসাবে, নতুবা অধিদফতরের হিসাবে গোলমাল রয়েছে। আমরা দেখেছি, বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সময় সব খাতে পরিসংখ্যানের মিথ্যা তথ্য দিয়ে উন্নয়ন দেখাতে। ফলে মানুষের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি কোনো ধরনের বিশ্বাস ছিল না। তার বিদায়ের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অন্তর্বর্তী সরকার মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তারা এখনও তা সরকারের মধ্যে দেখতে পাচ্ছে না। তাদের বিশ্বাস ও আস্থা ধরে রাখতে হলে কৃষিপণ্যসহ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঠিক পরিসংখ্যান দিয়ে উৎপাদন ও চাহিদার সমন্বয় ঘটাতে হবে। এখানে ভোজভাজির হিসাব গ্রহণযোগ্য হবে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, এখন কৃষিপণ্যসহ পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। তবে সাধারণ মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রে মুল্য তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে তাদের স্বস্তিতে রাখার দায়িত্ব সরকারের। এক্ষেত্রে ভর্তুকি, বেশি বরাদ্দ দিয়ে কিংবা অন্য যে উপায়ে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিত্যপণ্যের চেইনশপ রয়েছে। উন্নত বিশ্বের চেইনশপগুলো পণ্যের উপর মূল্যছাড় দিয়ে থাকে। আমাদের দেশের এ ধরনের শপগুলোও এ পন্থা অবলম্বন করতে পারে। এজন্য কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে খাদ্য, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়গুলো যোগাযোগ করে পণ্যমূল্য মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য তাদের সহযোগিতা চাইতে পারে। এতে কিছুটা হলেও পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। অন্যদিকে, সিন্ডিকেট সবসময়ই ছিল এবং এখনও আছে। সিন্ডিকেটকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে উপায়ও মন্ত্রণালয়গুলোকে বের করতে হবে।সবশেষ কথা হলো, মানুষ স্বস্তি চায়। এটি থাকলে সরকারে কে থাকল বা তাদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় কী, সেসব অতটা ধর্তব্যে আসে না। বাজারে কখন কোন পণ্যের সরবরাহসংকট হতে পারে, তা আগেভাগে নিরূপণ করে কি আমদানি আরও উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? এমনকি দেশীয় পোলট্রি ব্যবসায়ীরা সরকারকে ডিম আমদানি করতে দিতে চায় না। তাঁদের মুখে সেই একই খোঁড়া যুক্তি, আমদানি করলে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে; মানুষের দুরবস্থা তাঁদের হৃদয় বিগলিত করতে পারে না।
এ তো গেল বাজারের অবস্থা। এর বাইরে প্রতিদিনই কোনো না কোনো পক্ষ বা গোষ্ঠী রাজধানীতে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। এমনকি সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। মূল সমস্যা হলো, এসব আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। রাস্তাঘাটের শৃঙ্খলা বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই। যানজট চরম আকার ধারণ করেছে। এ পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে বিরক্তি বোধ তৈরি হচ্ছে। সড়কের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। আগেও দুর্ভোগ ছিল, কিন্তু অনিয়মের মধ্যে একধরনের নিয়ম ছিল, যা ৫ আগস্টের পর ভেঙে পড়েছে। সেখানে শৃঙ্খলা আনার কাজটি যত দ্রুত করা উচিত ছিল তা হচ্ছে না।পরিবহনে চাঁদাবাজি চলছে আগের মতোই। এসব থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক প্রভাব মানুষ অনুভব করতে পারবে না। তিউনিসিয়ার গণ-অভ্যুত্থানে ২৭ দিনের মাথায় প্রেসিডেন্ট জয়নুল আবেদিন বেন আলীর ২৩ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান হয়। এরপর মিসরের কায়রোর তাহরির স্কয়ারে মাত্র ১৮ দিনের আন্দোলনে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন তিন দশকের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক। আমাদের ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসককে বিদায় করতে সময় লেগেছে ৩৬ দিন। কিন্তু তিউনিসিয়া ও মিসরের জনগণ গণ-অভ্যুত্থানের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। সে জন্য অভ্যুত্থান-পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি।
বাস্তবতা হলো, মানুষের জীবনে স্বস্তি ও স্থিতিশীলতা আসতে পারে তেমন কোনো উদ্যোগ এখন দেখা যাচ্ছে না। আরব বসন্ত ব্যর্থ হওয়ার পেছনে অস্থিতিশীলতা ছিল মূল কারণ। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সুশাসন না এলে গণবিরোধী প্রশাসনিক কাঠামো অক্ষুণ থাকবে। এতে যেমন মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়বে, এর সুযোগ নিয়ে পতিত শাসকগোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করতে পারে।

