ঢাকাSunday , 3 November 2024
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

প্রসঙ্গ বিদ্যুৎ সংকট : সরকারকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে

Link Copied!

তীব্র লোডশেডিংয়ে নাকাল দেশের মানুষ। ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন কমেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। একইসাথে জ্বালানির আমদানি নির্ভর এ খাতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়াও বাড়ছে। ফলে চাহিদা মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না।দেশে বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কম। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার গত পনের বছরে দেশে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করে অপরিকল্পিতভাবে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রে চাহিদাও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনার সরকার অর্থনৈতিক যে বিপর্যয় রেখে গেছে তারই ফলশ্রুতিতে এই পুরো খাত মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই খাতে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। সম্পূর্ণ টাকা দেয়া সম্ভব না হলেও যতটুকু টাকা দিয়ে সরবরাহ বজায় রাখা যায় ততটুকু দিতে হবে। এদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, সাময়িক সংকট সমাধানে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ডলার পেমেন্ট করা হচ্ছে। এ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকটের মূল সমস্যা ডলার সংকট। একে কেন্দ্র করেই অন্য সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করেছে এই মুহূর্তে। একইসাথে বিগত সরকারের অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নের খেসারত দিতে হচ্ছে জনগণকে। গ্যাস বিল, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল, ভারতীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল সব কিছু মিলিয়ে পিডিবির বকেয়া টাকার পরিমাণ ৩৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। দেশে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ আসে গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে প্রায় বারো হাজার মেগাওয়াট। আগে সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। অথচ এখন ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাত দিনে ১২০ থেকে ১৩০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পেয়েছে। এখন ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিডিবি। কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দিনে গ্যাস আসে ১১০ কোটি ঘনফুট। সামিটের এলএনজি টার্মিনাল গত ২৭ শে মে থেকে বন্ধ। ফলে এখন সরবরাহ হচ্ছে ৬০ কোটি ঘনফুট। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব ইউনিট। ফলে এখন ৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি লোডশেডিং করতে হয়। অন্যদিকে গ্যাস সঙ্কটের কারণে মাতার বাড়ি তাপবিদুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ। এটি কবে চালু হবে তারও নিশ্চয়তা নেই। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ খাতে পলিসিগত যে ভুল সবচেয়ে ভয়াবহ হয়েছে সেটা হলো পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শক্তিশালী অর্থনীতির বিবেচনায় আমদানি নির্ভর করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার সরকার অর্থনীতির একটি ভ্রান্ত ধারণার উপর ভিত্তি করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে। এসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গ্যাসের পাশাপাশি তেল ও কয়লার ব্যবহার বেড়েছে। এই জ্বালানির বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানির এই আমদানি নির্ভরতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। যা সরাসরি ডলারের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ গৌতম আদানির মালিকানাধীন কোম্পানির সাথে শেখ হাসিনার অসম বিদ্যুৎচুক্তির খেসারত এখন জনগণকে দিতে হচ্ছে। বিল বকেয়ার কারণে আদানি গ্রুপ বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেক বন্ধ করে দিয়েছে। আদানির বকেয়া বিল ৮৮৬ মিলিয়ন ডলার। বাংদেশি টাকায় প্রায় ১০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। এ বকেয়া পরিশোধ না করলে যে কোন সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। তাতে সঙ্কট আরও ঘনিভূত হবে। ডলার সংকটের কারণে হাসিনা রেজিমের শেষ দিকে দেশে বিদ্যুৎ সংকট শুরু হয়েছিল। আর আদানির সাথে দেশের স্বার্থ বিরোধী অসম চুক্তি নিয়ে শুরু থেকেই মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা যাচ্ছিল। এ চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ খাতে বছরে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিতে হবে বাংলাদেশকে। আদানি ইউনিট প্রতি অতিরিক্ত কয়লা ব্যবহার, বিল পরিশোধে বিলম্বের জন্য উচ্চহারের সুদসহ ক্যাপাসিটি চার্জ ধরে অতিরিক্ত হাজার হাজার কোটি টাকা পাওনা দাবি করছে। দেশের মানুষ যখন আদানির সাথে চুক্তি বাতিলের দাবি তুলছে, তখন বকেয়া বিলের অজুহাতে আদানি হঠাৎ করেই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে সারাদেশে বিদ্যুতের লোড শেডিংও বেড়ে গেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই পতিত স্বৈরাচারের সুবিধাভোগিরা যে যেভাবে পারছে দেশে সংকট ও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে। একতরফা ও অসম চুক্তির সুযোগ নিয়ে বছরে অতিরিক্ত হাজার হাজার কোটি টাকা বিল আদায় করার মওকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই আদানি গ্রুপ ঝাড়খন্ডের গাড্ডায় অবস্থিত ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে ১০০০ মেগাওয়াট সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ায় দেশে বিদ্যুৎ সংকট আরো তীব্রতর আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন কয়েক ঘন্টা লোড শেডিং দিয়েও বিদ্যুৎ সরবরাহে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিগত সরকারের সৃষ্ট অর্থ সংকটের কারণে বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধ করতে না পারলেও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ইতিবাচক তৎপরতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের টেকসই উন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকার এখনো তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। মাফিয়া সরকারের মেগা দুর্নীতি ও অর্থপাচারের প্রভাব দেশের সবগুলো সেক্টরেই পড়ছে। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রভাব সব সেক্টরে সরাসরি পড়ে থাকে। ক্রমবর্ধমান লোড শেডিংয়ের কারণে একদিকে শিল্পোৎপাদনে যেমন বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে অন্যদিকে ঘরে ঘরে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা থেকে শুরু করে মূল্যস্ফীতিতে বাড়তি প্রভাব সৃষ্টি করে। এক কথায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ঘাটতি দেশে সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবক হয়ে দাঁড়াতে পারে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা যখন দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা শুনছি, তখন বিদ্যুৎ সংকট বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব আশঙ্কা ও দুর্ভাবনা সামনে রেখে আদানি গ্রুপের সাথে সাথে ভারতের সাথে যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এস আলম গ্রপের বাঁশখালি পাওয়ার প্লান্ট এবং পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়। গত দেড় দশক ধরে দেশের বিদ্যুৎ খাত পরিকল্পিতভাবে মাফিয়াতান্ত্রিক লুটপাটের শিকার হয়েছিল। দেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল অর্থের বড় অংশই এ খাতের মাধ্যমে পাচার হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে মাফিয়া সরকারের পতন ঘটলেও তাদের সুবিধাভোগী কর্পোরেট দুর্নীতিবাজরা এখনো নানাভাবে জনজীবনে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে চলেছে। সরকারকে অস্থিতিশীল করতে নানা ষঢ়যন্ত্র করে চলেছে। এ ব্যাপারে সরকারকে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, এখন অন্যতম প্রধান সমস্যাই অর্থ সংকট। তাই অন্য খাতে কমিয়ে এখানে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হবে। তেল-চালিত কেন্দ্রগুলো বেশি চালাতে হবে। ডলার জোগাড় করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। ১৫ শতাংশ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য গ্যাস রেশনিং করতে হবে। তবেই লোডশেডিং এর সংকট সমাধান হতে পারে। বিদ্যুৎ খাতে এ ধরণের সংকট আকষ্মিক বা অভাবনীয় নয়। পতিত সরকারের সহযোগীরা সরকারের দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টার কাছ থেকে যে ধরণের জরুরি পদক্ষেপ ও কার্যকরব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার ছিল তার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একজন দক্ষ সাবেক আমলা হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছে মানুষ আরো বেশি কিছু আশা করে। যদিও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমস্যা নিরসন কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের মত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব একজনের উপর ন্যস্ত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে যথাযথ উদ্যোগ ও গুরুত্ব আরোপ করার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকা অস্বাভাবিক নয়। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রনালয়ে উপদেষ্টার উপর চাপ কমাতে অন্য একজন চৌকষ ও তারুণ্যদীপ্ত উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। গতানুগতিক পন্থায় বিদ্যুৎ খাতে খুব শীঘ্রই দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রত্যাশা করা যাচ্ছে না। বিদ্যুতের ঘাটতি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান তথা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করবে, যা একটি সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে সরকারের বিরূপ সমালোচনা ও আস্থার সংকট সৃষ্টির অপতৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তদোপরি বিদ্যুতের লোড শেডিং আরো বেড়ে গেলে তা সরকারের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বিদ্যুৎ খাতের লোকসান কমিয়ে আনতে অতীতের অসম চুক্তিগুলো বাতিল করার আগেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ইমেজের কারণে উন্নয়ন সহায়তা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রথমেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের টেকসই উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে।